১৮ মাসের কাজ গড়িয়েছে আট বছরে। ৩৫ কোটির বাজেট ফুলেফেঁপে হয়েছে ৪০ কোটি। কিন্তু আলোর মুখ দেখেনি লক্ষ্মীপুরবাসীর কাঙ্ক্ষিত ২৫০ শয্যার হাসপাতাল ভবন। উল্টো গণমানুষের ট্যাক্সের টাকা লুটপাটের মহোৎসব শেষে এখন লাপাত্তা ঠিকাদার। একদিকে জীর্ণ ভবনের বারান্দা ও মেঝেতে রোগীদের আর্তনাদ, অন্যদিকে ঝুলে থাকা নতুন ভবনের প্রতিটি ইট যেন সাক্ষী দিচ্ছে সীমাহীন দুর্নীতির আর প্রশাসনিক স্থবিরতার।
২০ লাখ মানুষের প্রধান ভরসাস্থল লক্ষ্মীপুর সদর হাসপাতাল এখন অব্যবস্থাপনার এক ‘মরণফাঁদে’ পরিণত হয়েছে। ১০০ শয্যার জীর্ণ অবকাঠামোতে প্রতিদিন চিকিৎসা নিতে হচ্ছে পাঁচ শতাধিক মানুষকে। ধারণক্ষমতার চেয়ে পাঁচ গুণ বেশি রোগীর ভারে ন্যুব্জ হাসপাতালটির প্রতিটি করিডোর এখন সাধারণ মানুষের দীর্ঘশ্বাসে ভারী।
অনুসন্ধানে জানা যায়, ২০১৮ সালের জুনে ৯ তলা বিশিষ্ট এই ভবনের নির্মাণকাজ শুরু হয়। প্রকল্পের মেয়াদ অনুযায়ী ২০২০ সালেই এটি হস্তান্তরের কথা ছিল। কিন্তু অভিযোগ উঠেছে, বিগত সরকারের প্রভাবশালী আশীর্বাদপুষ্ট ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ‘রুপালি জিএম অ্যান্ড সন্স’ বারবার সময় বাড়িয়েও কাজ শেষ করেনি। গত ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর প্রকল্পের কাজ অসমাপ্ত রেখেই লাপাত্তা হয়ে গেছেন ঠিকাদার ইস্কান্দার মির্জা শামীম। বর্তমানে প্রকল্পের কাজ পুরোপুরি বন্ধ, চারদিকে ঝোপঝাড় আর আগাছায় ঢেকে যাচ্ছে সরকারের কোটি কোটি টাকার বিনিয়োগ।
সরেজমিনে দেখা যায়, হাসপাতালের মেঝে আর নোংরা বারান্দাই এখন রোগীদের শেষ আশ্রয়। স্যানিটেশন ব্যবস্থার বেহাল দশায় উৎকট গন্ধে টেকা দায়। পুরুষ ও মহিলা ওয়ার্ড ছাপিয়ে রোগীদের ভিড় এখন সিঁড়ির গোড়া পর্যন্ত। এক রোগীর স্বজন ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “আমরা কি মানুষ না? আট বছর ধরে শুনছি নতুন ভবন হবে, কিন্তু হচ্ছে না। সরকার আসে, সরকার যায়—আমাদের দুর্ভোগ আর শেষ হয় না।”
নির্মাণকাজে এমন ভয়াবহ দীর্ঘসূত্রতার বিষয়ে লক্ষ্মীপুর গণপূর্ত বিভাগের যুক্তি বেশ অদ্ভুত। তাদের দাবি, করোনাকালে সরকার এই প্রকল্প থেকে ৮ কোটি টাকা ফেরত নেওয়ায় কাজ থমকে গিয়েছিল। তবে ভবনটির ৮০ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে বলে দাবি করছেন নির্বাহী প্রকৌশলী মো. শফিকুর রহমান চৌধুরী। তিনি আশ্বাস দিয়েছেন, নতুন করে টেন্ডার প্রক্রিয়ার মাধ্যমে আগামী এক বছরের মধ্যে বাকি ২০ শতাংশ কাজ শেষ করা হবে। প্রশ্ন উঠেছে, যে কাজ ১৮ মাসে শেষ হওয়ার কথা, তা কেন আট বছর ধরে ঝুলে থাকল এবং এর জন্য দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কেন ব্যবস্থা নেওয়া হলো না?
ভবন চালু হওয়া মানেই ভোগান্তি মুক্তি নয়—এমনটাই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। সিভিল সার্জন ডা. মোহাম্মদ আবু হাসান শাহীন জানিয়েছেন, ভবন প্রস্তুত হলেও জনবল সংকট একটি বড় কাঁটা। বর্তমানে অর্ধেকেরও কম জনবল নিয়ে হিমশিম খাচ্ছে কর্তৃপক্ষ। তিনি বলেন, “মন্ত্রণালয়ে চিঠি দেওয়া হয়েছে। ভবন পেলেই হবে না, পর্যাপ্ত ডাক্তার ও নার্স নিয়োগ না দিলে সেবা নিশ্চিত করা অসম্ভব।”
সচেতন নাগরিক সমাজ মনে করছে, এটি কেবল একটি ভবন নির্মাণের দেরি নয়, বরং সরকারি অর্থ অপচয় ও জনগণের মৌলিক অধিকারের সাথে তামাশা। গত সরকারের আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও রাজনৈতিক ঠিকাদারদের যোগসাজশেই প্রকল্পটি আজ মুখ থুবড়ে পড়েছে।
লক্ষ্মীপুরবাসীর ‘হাসপাতাল যন্ত্রণা’র অবসান কি আদৌ হবে? নাকি আবারও নতুন ঠিকাদারের টেন্ডার আর আমলাতান্ত্রিক লাল ফিতার দৌরাত্ম্যে বন্দি হয়ে থাকবে ২০ লাখ মানুষের স্বপ্ন? আশ্বাস আর মেয়াদের চক্র থেকে বেরিয়ে এই ভবনটি কবে মানুষের সেবায় উন্মুক্ত হবে—সেই প্রশ্নই এখন লক্ষ্মীপুরের বাতাসে ঘুরপাক খাচ্ছে।


