দুর্ঘটনা যেনো পিছু ছাড়ছে না স্পিড ব্রেকারে। লক্ষ্মীপুরের রায়পুরের ওপর দিয়ে চলে গেছে চাঁদপুর-ঢাকা-চট্রগ্রাম বরিশাল-খুলনা আঞ্চলিক মহাসড়ক এবং বরিশালের আঞ্চলিক মহাসড়ক।
এ মহাসড়কের ৬৪ কিলোমিটারে অর্ধশতাধিক স্পিড ব্রেকার রয়েছে। ইচ্ছায়-অনিচ্ছায় এ স্পিড ব্রেকারগুলো টপকাতে হয় প্রতিটি যানবাহনকে।
মহাসড়ক ছাড়াও জেলার অভ্যন্তরে যাত্রীবাহী ও মালবাহী যান চলাচলের রাস্তায়ও রয়েছে অসংখ্য স্পিড ব্রেকার। শুক্রবার দুপুরে রায়পুর সরকারি হাসপাতালের সামনে স্পীডব্রেকারে ৩ জন ও বৃহস্পতিবার সকালে খাসেরহাট সড়কে ৪ জন মোটরসাইকেলআরোহী মারাত্মক আহত হয়েছেন।
জেলায় কতগুলো স্পিড ব্রেকার রয়েছে তার সঠিক পরিসংখ্যান নেই কোনো দপ্তরেই। নেই কোনো নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠানও। এভাবেই জেলার প্রায় সব সড়ক ও মহাসড়কে অপরিকল্পিত আর অবৈধ স্পিড ব্রেকারের দখলে চলে গেছে। অথচ ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় নেই কোন স্পিড ব্রেকার।
জানা গেছে, লক্ষ্মীপুর-চাঁদপুর-রামগন্জ-খুলনা-বরিশাল-ভোলায় রায়পুর উপজেলার সীমান্ত পর্যন্ত ৬৪ কিলোমিটার মহাসড়ক রয়েছে। আবার এ সড়কেরই রায়পুর সরকারি হাসপাতালের সামনে, ইটেরপুল, গরুর বাজার, মজুচৌধুরীহাট সড়কে প্রায় ১৫টি, খাসেরহাট সড়কে ৫টি, হায়দরগন্জ সড়কে ৫টি ও চাঁদপুর সড়কে ২০টির মতো স্পীড ব্রেকার মহাসড়ক রয়েছে। যা গড়ে প্রতি দুই কিলোমিটারে একটি করে স্পিড ব্রেকার রয়েছে।
সূত্র মতে, সড়ক ও মহাসড়কে বিপুল সংখ্যক স্পিড ব্রেকার কিভাবে বসল তার কোনো তথ্য নেই খোদ সড়ক বিভাগের কাছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের দাবি, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও রাজনৈতিক নেতাদের চাপে এগুলো বসানো হয়েছে। এক্ষেত্রে তারা প্রায় অসহায়। সড়ক-মহাসড়কে এভাবে স্পিড ব্রেকার দেওয়ার বিধান নেই। দিক নির্দেশক চিহ্ন এবং পথচারী পারাপারের জেব্রা ক্রসিংয়ের বাইরে এসব সড়কে থাকতে পারে শুধু র্যাম্বেল স্ট্রেট (আধা ইঞ্চি উঁচু বিট এক সঙ্গে ছয় থেকে আটটি)। অথচ বিপজ্জনক স্পিড বেকারগুলো বসিয়ে শুধু গাড়ির ক্ষতিই করা হচ্ছেনা, দুর্ঘটনার আশঙ্কাও বাড়িয়ে তোলা হচ্ছে কয়েকগুণ।
সরেজমিনে দেখা গেছে, সড়কের পাশে ৫-৭টি দোকান বা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থাকলেই তার দু’প্রান্তে বসিয়ে দেয়া হয়েছে দুটি স্পিড ব্রেকার। কোথাও কোথাও প্রভাবশালী কারো বাড়িতে প্রবেশের শাখা সড়ক কিংবা বিত্তশালী শিল্প মালিকের কারখানার সামনেও তৈরি করে রাখা হয়েছে জোড়ায় জোড়ায় গতিরোধক। যেমনটা দেখা গেছে, সরকারি হাসপাতালের সামনে মহাসড়কে, খাসেরহাট সড়কে ও হায়দরগন্জ সড়কের মোড় এলাকায়। অবস্থাটা এমন হয়েছে নিয়মনিতীর তোয়াক্কা না করে যার যেখানে ইচ্ছে হয়েছে সেখানেই স্পিড ব্রেকার বসিয়েছেন।।
সড়ক বিভাগের রায়পুর উপবিভাগীয় প্রকৌশলী আবদুর রহমান বলেন, সড়কে মসৃন গতিতে যানবাহন চলাচল করবে এটাই মূলত সড়ক ও সেতু বিভাগের নীতি। সড়ক বিধিতে স্পিড ব্রেকার বলতে কিছু নেই। উন্নত দেশগুলোতেও একই নিয়ম বিদ্যমান। তারপরেও আমাদের দেশের বাস্তবতায় এটা পুরোপুরি পালন করা সম্ভব হয় না। কিছু স্পিড ব্রেকার আমাদের দিতে হয়, কিন্তু যৌক্তিক প্রয়োজনীয়তার বাইরে চাপের মুখে বা আমাদের অজান্তে বেশিরভাগ স্পিড ব্রেকার বসানো হয়েছে। আন্তঃজেলা সড়ক কিংবা মহাসড়কগুলোতেও একেবারে জরুরি না হলে কোনো স্পিড ব্রেকার দেয়া যাবেনা। যদি দিতেই হয় সেক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসক সড়ক বিভাগকে চিঠি দিয়ে থাকেন। পরবর্তীকালে যাচাই করে সেখানে স্পিড ব্রেকার বসানো হয়। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্যি লক্ষ্মীপুরের ক্ষেত্রে এসব বিধিবিধানের কোনোটিই মানা হচ্ছে না। এখানে যে যার মতো করে স্পিড ব্রেকার বসাচ্ছে। সড়ক-মহাসড়কে যাতায়াতে এটা যে কতোটা ক্ষতিকর তা কেউ বিবেচনা করে দেখছেন না।
রায়পুর আন্তঃজেলা চট্রগ্রাম বাস ও মিনিবাস শ্রমিক ইউনিয়নের নেতা নজরুল ইসলাম লিটন বলেন, রায়পুর থেকে লক্ষ্মীপুর দূরত্ব মাত্র ১২ কিলোমিটার, রায়পুর থেকে চাঁদপুরের দূরত্ব ২৫ কিলোমিটার, রায়পুর থেকে বরিশাল ও ভোলা সড়কের মজুচৌধুরী হাট নৌটার্মিনাল পর্যন্ত ২৪ কিলোমিটার। এইটুকু সড়কে ৩৪টি স্পিড ব্রেকার থাকায় যানবাহনের চালকরা গাড়ি চালাতে মারাত্মক সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছেন। এমনতিই আমাদের দেশের স্পিড বেকারগুলো কোনো নিয়ম-কানুন মেনে তৈরি হয়না। কোথাও আবার উঁচু করে বানানো হয়েছে স্পিড ব্রেকার।
তিনি আরও বলেন, অপরিকল্পিত এসব স্পিড ব্রেকারের আগে ও পরে কোনো সতর্ক সংকেত কিংবা স্পিড ব্রেকারে কোনো রং না দেয়ায় প্রায়ই দুর্ঘটনা ঘটছে। বিশেষ করে রাতে কিংবা জেলার বাহির থেকে আসা যানবাহনগুলোকে প্রায় দুর্ঘটনার কবলে পড়তে হচ্ছে। এতে সবচেয়ে বেশি দুর্ঘটনার শিকার হচ্ছে মোটরসাইকেল চালকরা।
মানবাধিকার ব্যুরোর রায়পুরের সাধারণ সম্পাদক এম এ রহিম বলেন, যেখানেই সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণহানির ঘটনা ঘটে সেখানেই স্পিড ব্রেকার নির্মাণের দাবি ওঠে। আসলে স্পিড ব্রেকার সড়ক দুর্ঘটনা প্রতিরোধে কোনো সমাধান নয়। সবার আগে দরকার সচেতনতা। স্পিড ব্রেকার না থাকলে যেমন মানুষ দুর্ঘটনা কবলিত হয়, তেমনি স্পিড ব্রেকার দিলেও দুর্ঘটনা ঘটে। এমনকি যানবাহনেরও ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়। তাই সড়ক ও মহাসড়ক থেকে স্পিড ব্রেকারগুলো সরানো এখন জরুরি হয়ে পড়েছে।
লক্ষ্মীপুর সড়ক বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী জহিরুল ইসলাম জানান, মহাসড়কের বা অভ্যান্তরীণ রাস্তায় স্পিড ব্রেকারের যে বিধি রয়েছে তাতে খুব জরুরি কয়েকটা ছাড়া দেয়া যায় না। কিন্তু যেখানেই সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণহানির ঘটনা ঘটে সেখানেই স্পিড ব্রেকার নির্মাণের দাবি ওঠে। তাই ওই সময়ে জনরোষ সামলাতে স্পিড ব্রেকার দেয়া হয়। আবার অনেক স্থানে স্থানীয়ভাবে আমাদের না জানিয়ে স্পিড বেকার স্থাপন করা হয়। যে জন্য পরিসংখ্যান রাখা সম্ভব হচ্ছে না।


