উন্নয়নের মহাসড়কে দেশ এগিয়ে যাওয়ার গল্প শোনা গেলেও লক্ষ্মীপুর সদর উপজেলার ১৬ নম্বর শাকচর ইউনিয়নে চিত্রটি ঠিক উল্টো। এখানকার ৬ ও ৭ নম্বর ওয়ার্ডের মধ্যবর্তী ‘এরশাদ উল্ল্যা ডিলার সড়ক’টি এখন স্থানীয় ৭ হাজার মানুষের কাছে এক জীবন্ত অভিশাপ। দীর্ঘ ২৬ বছর ধরে সংস্কারহীন পড়ে থাকা এই ২ কিলোমিটার সড়ক যেন জনভোগান্তির এক চরম উদাহরণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
মাতাব্বর বাড়ির সামনে থেকে তালতলা সুপার মার্কেট পর্যন্ত বিস্তৃত এই জনগুরুত্বপূর্ণ সড়কটি এখন স্থানীয়দের জন্য ‘গলার কাঁটা’। সরেজমিনে দেখা যায়, সড়কের পিচ-খোয়া বহু আগেই উঠে গিয়ে সৃষ্টি হয়েছে বড় বড় গর্ত। বর্ষা মৌসুমে এই সড়কটি ছোটখাটো খালে পরিণত হয়, আর শুষ্ক মৌসুমে ধুলার আস্তরণে ঢাকা পড়ে যায় চারপাশ।
সড়কটির আশপাশে রয়েছে ৪টি মসজিদ, ৩টি মাদ্রাসা এবং ৩টি প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়। প্রতিদিন এই পথ দিয়েই যাতায়াত করতে হয় কয়েকশ শিক্ষার্থীকে। কিন্তু সামান্য বৃষ্টি হলেই সড়কটি চলাচলের অযোগ্য হয়ে পড়ে। মাদ্রাসার ছাত্র ইমতিয়াজ আক্ষেপ করে বলে, “রাস্তার যে দশা, তাতে বৃষ্টি হলে বাড়ি থেকে বের হওয়াই যায় না। প্রায়ই কাদার মধ্যে আছাড় খেয়ে জামাকাপড় ও বইখাতা নষ্ট হয়ে যায়। আমাদের নিয়মিত মাদ্রাসায় যাওয়া এখন ভাগ্যের ব্যাপার।”
সড়কটি কেবল যাতায়াত নয়, প্রভাব ফেলছে স্থানীয়দের সামাজিক জীবনেও। এই ভাঙাচোরা রাস্তার কারণে এলাকায় আত্মীয়তা করতেও অনীহা দেখান অনেকে। স্থানীয় বাসিন্দা লাকি আক্তার বলেন, “রাস্তার করুণ অবস্থার কারণে অনেকেই এই এলাকায় মেয়েদের বিয়ে দিতে চান না। অসুস্থ রোগীদের হাসপাতালে নেওয়া এক দুঃসাধ্য ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই রাস্তা আমাদের সামাজিকভাবেও পিছিয়ে দিচ্ছে।”
সড়কের বেহাল দশায় লোকসানের মুখে পড়েছেন স্থানীয় ব্যবসায়ীরা। মুদি দোকানদার সেলিম জানান, ভালো যাতায়াত ব্যবস্থা না থাকায় ক্রেতারা দোকানে আসতে পারেন না। অন্যদিকে, মালপত্র পরিবহন করতে গুনতে হয় দ্বিগুণ ভাড়া।
স্থানীয়দের অভিযোগ, গত আড়াই দশকে বহুবার সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে ধরণা দিয়েও কোনো সুরাহা হয়নি। স্থানীয় বাসিন্দা মো. রাকিব হোসেন বলেন, “আমরা দীর্ঘদিন ধরে দাবি জানালেও কেউ আমাদের কথা শুনছে না। আমরা কি আধুনিক বাংলাদেশের অংশ নই?” অন্য এক বাসিন্দা মো. শাহিন বলেন, “প্রতিদিন মানুষ এখানে দুর্ঘটনার শিকার হচ্ছে। হাত-পা ভেঙে পঙ্গুত্ব বরণ করছে অনেকে, কিন্তু দেখার কেউ নেই।”
এ বিষয়ে স্থানীয় মসজিদের ইমাম কারী আকবর হোসেন জানান, মুসল্লিরা কাদা মাড়িয়ে নামাজে আসতে গিয়ে চরম ভোগান্তির শিকার হন। অনেক বৃদ্ধ মুসল্লি পিচ্ছিল পথে পড়ে গিয়ে গুরুতর আহত হয়েছেন।
শাকচর ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য মো. ফিরণ বলেন, “এই রাস্তার করুণ পরিস্থিতির কথা আমরা সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে বারবার জানিয়েছি। জনগণের ভোগান্তি লাঘবে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য আমরা আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি।”
৭ হাজার মানুষের এই দীর্ঘস্থায়ী দুর্ভোগ কি তবে চলতেই থাকবে? এমন প্রশ্নই এখন লক্ষ্মীপুরের শাকচরবাসীর মনে। আসন্ন বর্ষার আগেই সড়কটি সংস্কার করে চলাচলের উপযোগী করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করছেন ভুক্তভোগী এলাকাবাসী।


