সারাদেশের মতো লক্ষ্মীপুরেও আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে হামে আক্রান্ত শিশুর সংখ্যা। দিন দিন রোগটি জেলায় ভয়াবহ আকার ধারণ করছে। তবে আক্রান্ত শিশুদের চিকিৎসার জন্য পর্যাপ্ত টিকার ব্যবস্থা থাকলেও হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসাসেবার সংকটে নাকাল হতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে। বিশেষ করে জেলা সদর ও উপজেলা হাসপাতালগুলোতে হাম ওয়ার্ডে শয্যা সংকটের কারণে এক বেডেই চিকিৎসা নিতে হচ্ছে দুই থেকে তিন শিশুকে। এতে অন্য রোগ নিয়ে হাসপাতালে আসা সুস্থ শিশুরাও হামে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিতে পড়ছে।
বুধবার বিকেলে ও বৃহস্পতিবার সকালে লক্ষ্মীপুর সদর হাসপাতাল ও রায়পুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের হাম ওয়ার্ড ঘুরে দেখা গেছে এক করুণ চিত্র। সদর হাসপাতালের মূল ভবনের দ্বিতীয় তলায় দুটি ইউনিট নিয়ে গঠিত এই ওয়ার্ডে তিল ধারণের জায়গা নেই। ওয়ার্ডগুলোতে দেখা গেছে, প্রতিটি বেডে ২-৩ জন করে শিশুকে রাখা হয়েছে। সিট না পেয়ে অনেক শিশু ও বয়স্ক রোগীকে মেঝেতে শুয়ে চিকিৎসা নিতে হচ্ছে। গাদাগাদি করে থাকার ফলে রোগটি আরও দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা করছেন অভিভাবক ও চিকিৎসকরা।
হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, গত কয়েক দিন ধরে জেলার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে হাম ও ঠান্ডাজনিত রোগে আক্রান্ত শিশুদের নিয়ে স্বজনরা হাসপাতালে ভিড় করছেন। ধারণক্ষমতার চেয়ে কয়েক গুণ বেশি রোগী ভর্তি হওয়ায় চিকিৎসা দিতে হিমশিম খাচ্ছেন নার্স ও চিকিৎসকরা। অনেক ক্ষেত্রে হাম আক্রান্ত শিশুর পাশেই সাধারণ ঠান্ডাজনিত রোগে আক্রান্ত শিশুকে রাখা হচ্ছে, যার ফলে সুস্থ শিশুদের মধ্যেও সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ছে।
সদর হাসপাতালের হাম ওয়ার্ডে ভর্তি এক শিশুর মা শারমিন বেগম ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “আমার সন্তান টাইফয়েড নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিল। কিন্তু হাসপাতালে জায়গা না থাকায় তাকে হাম আক্রান্ত এক শিশুর সঙ্গে একই বেডে রাখা হয়। এখন আমার ছেলেও হামে আক্রান্ত হয়েছে। এখানে ঠিকমতো সেবাও পাওয়া যাচ্ছে না। আমি এখন অন্য হাসপাতালে চলে যাওয়ার কথা ভাবছি।”
তথ্যানুসন্ধানে জানা গেছে, জেলার রায়পুরে ২টি, সদরে ১০টি এবং রামগঞ্জে ২টি—সব মিলিয়ে মাত্র ১৪টি বেড রয়েছে হামের চিকিৎসার জন্য। অথচ বৃহস্পতিবার পর্যন্ত এই তিন হাসপাতালে ভর্তি ছিল ৫৪ জন শিশু, যা ধারণক্ষমতার প্রায় চারগুণ। শয্যা না পেয়ে মেঝেতে গাদাগাদি করে চিকিৎসা নিচ্ছে অধিকাংশ শিশু।
লক্ষ্মীপুর সদর হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার (আরএমও) ডা. অরূপ পাল ও রায়পুর হাসপাতালের আরএমও ডা. মামুনুর রশীদ পলাশ জানান, বর্তমানে সদর হাসপাতালে ৩৩ জন এবং রায়পুর হাসপাতালে ১১ জন শিশু হামে আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসাধীন। এসব শিশুর জ্বর, সর্দি ও কাশির উপসর্গ রয়েছে।
চিকিৎসকরা আরও জানান, সাধারণত ৯ মাস বয়সে শিশুদের হামের টিকা দেওয়া হয়। তবে সাম্প্রতিক সময়ে ৭ মাস বয়সী শিশুরাও এই রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। ডা. অরূপ পাল বলেন, “সরকারিভাবে হামের টিকা পর্যাপ্ত রয়েছে। তবে বেড সংকটের কারণে চিকিৎসা দিতে কিছুটা হিমশিম খেতে হচ্ছে। আমরা সমস্যাটি সমাধানের চেষ্টা করছি। আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই, সঠিক সময়ে চিকিৎসা নিলে শিশুরা দ্রুত সুস্থ হয়ে ওঠে।”
বিদ্যমান পরিস্থিতিতে স্থানীয়রা হাম আক্রান্তদের জন্য আলাদা আইসোলেশন ওয়ার্ডের সংখ্যা বাড়ানোর দাবি জানিয়েছেন, যাতে সাধারণ রোগীদের মধ্যে এই রোগ ছড়িয়ে না পড়ে।


