লক্ষ্মীপুরের রায়পুর পৌরসভা এলাকা যেন এখন মশার শহর। দিন-রাত অবিরাম মশার যন্ত্রণায় অতিষ্ঠ নাগরিকরা। তাদের দাবি, প্রথম শ্রেণির পৌরসভা হওয়া সত্ত্বেও কার্যকর মশক নিধন কার্যক্রম না থাকায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে।
ছুটির দিনগুলোতে শহরের দোকানপাট ও মসজিদ এলাকায় একটু স্বস্তির খোঁজে ভিড় করেন পৌর এলাকার মানুষ। কিন্তু সন্ধ্যা নামলেই মশার অত্যাচারে সেখানে টিকে থাকা দায় হয়ে পড়ে। নতুনবাজার, উপজেলা পরিষদ ও হাসপাতাল এলাকাসহ বিভিন্ন স্থানে মশার উপদ্রব সবচেয়ে বেশি বলে অভিযোগ করেছেন বাসিন্দারা।
নতুনবাজার এলাকার বাসিন্দা শামসুল ইসলাম ও গৃহিণী খুশবু আক্তার বলেন, “মশার যন্ত্রণায় দিন-রাত একাকার হয়ে গেছে। সন্ধ্যার পর ঝাঁকে ঝাঁকে মশার আক্রমণে টিকে থাকাই কঠিন। একটু অসাবধান হলেই মশা কামড়ে শরীর ফুলিয়ে দিচ্ছে।”
বাসটার্মিনাল এলাকার বাসিন্দা ও সংবাদকর্মী মাহবুবুল আলম মিন্টু জানান, “আমাদের এলাকায় এবার পৌরসভা থেকে কোনো ওষুধ ছিটানো হয়নি। ফগার মেশিনের শব্দও শোনা যায়নি। কার্যকর কোনো উদ্যোগ চোখে পড়েনি। ফলে মশার উপদ্রব কোনোভাবেই কমছে না।”
পীরবাড়ী সংলগ্ন এলাকার একটি মেসে থাকা কয়েকজন কলেজছাত্র বলেন, প্রতিদিন ১৫ টাকার কয়েল জ্বালিয়েও পড়াশোনায় মন বসানো যায় না। তাদের ভাষায়, “মশা যেন অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠেছে।”
নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন শ্রমিক অভিযোগ করেন, বরাদ্দকৃত সব ওষুধ স্প্রে করা হয় না। একটি ওষুধের বোতল ৭১৫ টাকায় কেনা হলেও তা কম দামে বিক্রির অভিযোগ রয়েছে। তাদের দাবি, সঠিকভাবে ওষুধ ব্যবহার করা হলে মশার উপদ্রব এতটা বাড়ত না।
রায়পুর সরকারি কলেজের প্রাণিবিজ্ঞান বিভাগের একজন শিক্ষক বলেন, “মশা নিধনে ওষুধ সঠিক মাত্রায় প্রয়োগ না করলে মশা প্রতিরোধক্ষম হয়ে ওঠে। স্প্রের আগে ও পরে মশার ঘনত্ব পরিমাপ করা জরুরি, যা এখানে করা হচ্ছে না। শুধু ফগিং নয়, লার্ভা ধ্বংসে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে।”
এদিকে রায়পুর মধ্যবাজারে স্বজল বণিকের দোকানের পরিচালক সঞ্জয় বণিকসহ একাধিক মুদি দোকানি জানান, মশার উপদ্রব বাড়ায় এরোসল, ইলেকট্রিক ব্যাট ও লিকুইড ভ্যাপোরাইজারের বিক্রি বেড়েছে। তবে নাগরিকদের মতে, এসব সাময়িক স্বস্তি দিলেও স্থায়ী সমাধান নয়।
রায়পুর পৌরসভার মশক নিধন বিভাগের কনজারভেন্সি ইন্সপেক্টর রোমানুর রহমান বলেন, “বাজেট ব্যয়বহুল। এ বিষয়ে ইউএনওর সঙ্গে কথা বলুন।”
পৌর প্রশাসনিক কর্মকর্তা মাসুদ মোর্শেদ জানান, “কয়েক মাস আগে মশক নিধন অভিযান পরিচালিত হয়েছে। রমজান উপলক্ষে আপাতত স্প্রে করার পরিকল্পনা নেই। তবে অভিযোগের ভিত্তিতে নিয়মিত স্প্রে ও ড্রেন পরিষ্কারের কার্যক্রম চলমান রয়েছে।”
জেলা সিভিল সার্জন অফিসের তথ্যমতে, দেশে গত কয়েক বছরে ডেঙ্গুর প্রকোপ বেড়েছে। লক্ষ্মীপুরেও অতীতে প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে। বর্তমানে মৌসুমি জ্বর বাড়ায় মানুষ আতঙ্কিত—এটি সাধারণ জ্বর, নাকি ডেঙ্গু বা চিকুনগুনিয়া—তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মশার কামড় শুধু অস্বস্তিই নয়; ডেঙ্গু, চিকুনগুনিয়া, ম্যালেরিয়াসহ বিভিন্ন মশাবাহিত রোগের ঝুঁকি বহুগুণ বাড়ায়। শিশু ও বৃদ্ধরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছেন। তাই সমন্বিত ও টেকসই কর্মপরিকল্পনা ছাড়া এই সমস্যা নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয় বলে মনে করছেন সচেতন নাগরিকরা।


