যখন পড়ার টেবিলে শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতিতে মগ্ন থাকার কথা, তখন ৯ পরীক্ষার্থীর চোখে জল আর অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ। পকেটে প্রবেশপত্র থাকার কথা থাকলেও তাদের হাতে এখন কেবলই শূন্যতা। লক্ষ্মীপুর সদর উপজেলার কামানখোলা অলি উল্ল্যা মুসলিম পলিটেকনিক একাডেমির প্রধান শিক্ষক ছৈয়দ আহমেদ ভূঁইয়ার চরম উদাসীনতা আর ‘আর্থিক নয়ছয়ে’ ৯ শিক্ষার্থীর শিক্ষাজীবনে নেমে এসেছে ঘোর অন্ধকার।
অভিযোগ উঠেছে, গত বছর গণিতে অকৃতকার্য ১৪ জন শিক্ষার্থীর কাছ থেকে এবার পরীক্ষা দেওয়ার সুযোগ করে দেওয়ার নাম করে মোটা অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন প্রধান শিক্ষক। বোর্ড নির্ধারিত ফির বাইরে ‘যাতায়াত খরচ’ ও ‘বকেয়া’র অজুহাতে প্রত্যেকের কাছ থেকে অন্তত ১৫০০ টাকা করে আদায় করা হয়। কিন্তু শেষ রক্ষা হয়নি। ১৬ এপ্রিল স্কুলে প্রবেশপত্র এলে দেখা যায়, ৫ জন প্রবেশপত্র পেলেও বাকি ৯ জনের নামই নেই তালিকায়।
অনুসন্ধানে জানা যায়, ওই ৯ শিক্ষার্থীর ফরমই পূরণ করা হয়নি। অভিভাবকরা হন্যে হয়ে বোর্ডে যোগাযোগ করলে সেখান থেকে জানানো হয়, অনেক আগেই ফরম পূরণের সময় পার হয়ে গেছে। প্রধান শিক্ষক সময়মতো আবেদন না করায় এই ‘মহা-বিপর্যয়’ সৃষ্টি হয়েছে।
শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ যখন খাদের কিনারে, তখন প্রধান শিক্ষক ছৈয়দ আহমেদ ভূঁইয়ার বয়ান রীতিমতো বিস্ময়কর। নিজের গাফিলতি আড়াল করতে তিনি দাবি করছেন, বোর্ড সবাইকে অনুমতি দেয়নি। অথচ টাকা নেওয়ার সময় তিনি ছিলেন নিশ্চুপ। এমনকি শিক্ষার্থীদের দেওয়া টাকা কোথায় খরচ হয়েছে, তার কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি তিনি। উল্টো ‘আগামী বছর বিনা ফিতে পরীক্ষা’ দেওয়ার এক অসার প্রতিশ্রুতি দিয়ে দায় এড়াতে চাইছেন এই শিক্ষক। তবে ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীদের প্রশ্ন— ‘আমাদের একটি বছর যারা কেড়ে নিল, সেই ক্ষতির খেসারত দেবে কে?’
ভুক্তভোগী শিক্ষার্থী জাহেদুল ইসলাম শিহাবের ক্ষোভ যেন আকাশছোঁয়া। সে বলে, “অন্য সব বিষয়ে ভালো ফল করেছি। এবার গণিতে দিনরাত এক করে প্রস্তুতি নিয়েছি। কিন্তু প্রধান শিক্ষকের শঠতায় আমাদের সব স্বপ্ন এখন মরীচিকা।”
অভিভাবক সিরাজুল ইসলাম সরাসরি অভিযোগ তুলে বলেন, “এটি কেবল অবহেলা নয়, এটি পরিকল্পিত তছরুপ। ফরম পূরণের নামে টাকা পকেটস্থ করে আমাদের সন্তানদের জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলছেন তিনি। আমরা তাঁর কঠোর শাস্তি চাই।
ঘটনাটি জানাজানি হওয়ার পর স্থানীয় প্রশাসনে তোলপাড় শুরু হয়েছে। সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ক্যাথোয়াইপ্রু মারমা জানিয়েছেন, শিক্ষার্থীদের জীবন বাঁচাতে শেষ চেষ্টা চালানো হচ্ছে। তিনি বলেন, “প্রধান শিক্ষককে তলব করে বোর্ডে পাঠানো হয়েছে। বিশেষ ব্যবস্থায় যদি তাদের পরীক্ষায় বসানো যায়, আমরা সেই চেষ্টা করছি। তবে এই জালিয়াতির জন্য ওই শিক্ষকের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (শিক্ষা ও আইসিটি) আনোয়ার হোসাইন পাটোয়ারী জানিয়েছেন, বিষয়টিকে ‘পেশাগত স্খলন’ হিসেবে দেখছে জেলা প্রশাসন। তদন্ত কমিটি গঠন করে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
এখন সবার চোখ ৩ মের দিকে। প্রশাসনের হস্তক্ষেপে কি ৯ শিক্ষার্থীর কপাল ফিরবে, নাকি প্রধান শিক্ষকের ‘পেশাগত অসততা’র বলি হয়ে ঝরে যাবে ৯টি মেধাবী প্রাণ?


