সরকারি নিষেধাজ্ঞাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে লক্ষ্মীপুরের রায়পুর সংলগ্ন মেঘনা নদীতে চলছে মা ইলিশ ও জাটকা নিধনের মহোৎসব। পহেলা মার্চ থেকে ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত দুই মাস ইলিশ ধরা, পরিবহন ও মজুদের ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা থাকলেও বাস্তবে তার কোনো প্রতিফলন নেই। গত ১৫ দিন ধরে এক শ্রেণির অসাধু জেলে ও মৌসুমি ব্যবসায়ীরা প্রকাশ্যে এই ধ্বংসযজ্ঞ চালালেও জনবল সংকটের দোহাই দিয়ে অনেকটা ‘নির্বিকার’ মৎস্য বিভাগ।
শুক্রবার দুপুরে রায়পুরের মেঘনা নদীর বিভিন্ন পয়েন্টে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায় এক ভয়াবহ চিত্র। চরবংশীর হাজিমারা সুইসগেট, আলতাফ মাস্টার মাছঘাট, পুরানবেড়ি, চান্দারখাল ও সাজু মোল্লার ঘাটসহ পার্শ্ববর্তী হাইমচর এলাকায় কয়েকশ নৌকা নিয়ে জেলেরা অবাধে জাল ফেলছেন। নিষিদ্ধ ‘কারেন্ট জাল’ দিয়ে ধরা হচ্ছে ঝাঁকে ঝাঁকে মা ইলিশ ও জাটকা। এই রুপালি সম্পদ নদী থেকে তুলে সরাসরি বিক্রি করা হচ্ছে স্থানীয় বাজার ও অস্থায়ী আড়তগুলোতে। প্রশাসনের নজরদারি না থাকায় ক্রয়-বিক্রয় চলছে প্রকাশ্যেই।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, রায়পুর উপজেলায় মৎস্য বিভাগের কার্যক্রম বর্তমানে কাগুজে কলমেই সীমাবদ্ধ। গুরুত্বপূর্ণ ‘সিনিয়র উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা’র পদটি এক বছর ধরে শূন্য। এমনকি ‘সহকারী মৎস্য কর্মকর্তা’র পদটিও গত দুই বছর ধরে খালি পড়ে আছে। স্থানীয় সচেতন মহলের অভিযোগ, কোনো স্থায়ী কোস্টগার্ড কিংবা নৌ-পুলিশের ফাঁড়ি না থাকায় মেঘনার এই বিশাল এলাকায় কার্যত কোনো টহল নেই। ফলে জেলেরা কাউকেই তোয়াক্কা করছে না।
চান্দারখাল এলাকার জেলে মিলন মাঝি ও মানিক খান আক্ষেপ করে বলেন, “নিষেধাজ্ঞার সময় সরকার যে চাল দেয়, তা দিয়ে সংসার চলে না। উপরন্তু মহাজনদের কাছ থেকে নেওয়া দাদনের কিস্তি ও ঋণের চাপে আমরা নদীতে নামতে বাধ্য হচ্ছি।” হায়দরগঞ্জ এলাকার জেলে আব্বাস উদ্দিন জানান, অনেক সময় বড় মাছের আশায় জাল ফেললে মা ইলিশ ও জাটকা ধরা পড়ে, যা তারা আর নদীতে ফেরত দেন না।
মৎস্য বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, মা ইলিশের এই প্রজনন মৌসুমে যদি এভাবে নিধন চলতে থাকে, তবে ভবিষ্যতে নদীতে ইলিশের তীব্র সংকট দেখা দেবে। যার বিরূপ প্রভাব পড়বে জাতীয় অর্থনীতি ও জেলেদের জীবনজীবিকার ওপর।
জনবল ও সক্ষমতার সীমাবদ্ধতার কথা স্বীকার করে লক্ষ্মীপুর জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মুহাম্মদ দেলোয়ার হোসাইন বলেন, “রায়পুরে নতুন মৎস্য কর্মকর্তা পদায়ন করা হলেও তিনি এখনো যোগদান করেননি। কোস্টগার্ডের নিয়মিত টহল না থাকায় আমরা এককভাবে অভিযান চালিয়ে পেরে উঠছি না। তবে সীমিত সম্পদ নিয়েই আমরা চেষ্টা করছি। নিবন্ধনের বাইরে থাকা জেলেদেরও দ্রুত আইনের আওতায় আনা হবে।”
অবাধে ইলিশ নিধনের এই প্রক্রিয়া এখনই বন্ধ করা না গেলে ‘ইলিশের দেশ’ হিসেবে বাংলাদেশের বৈশ্বিক পরিচিতি হুমকির মুখে পড়বে বলে আশঙ্কা করছেন বিশিষ্টজনেরা।


