সন্ধ্যা নামলেই লক্ষ্মীপুর জেলার চারটি পৌরসভা যেন একেকটি ‘মশার খনিতে’ পরিণত হয়। লক্ষ্মীপুর সদর, রায়পুর, রামগঞ্জ ও রামগতি—সবখানেই এখন মশার একচ্ছত্র রাজত্ব। ড্রেন পরিষ্কার না করা, যত্রতত্র ময়লার স্তূপ ও মশক নিধন কার্যক্রমে চরম স্থবিরতায় অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছেন কয়েক লাখ পৌরবাসী। একদিকে মশার অসহনীয় কামড়, অন্যদিকে ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়ার ক্রমবর্ধমান আতঙ্ক—সব মিলিয়ে নাগরিক জীবন এখন ওষ্ঠাগত।
জেলা পরিসংখ্যান ও স্থানীয় সূত্রমতে, এই চার পৌর এলাকায় বিপুল জনসংখ্যার বসবাস। দ্রুত নগরায়ণ ও ঘনবসতির কারণে আবাসন সমস্যা বাড়লেও আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা গড়ে ওঠেনি। ফলে নালা-নর্দমায় জমে থাকা পানি ও পচা বর্জ্য হয়ে উঠেছে মশার প্রধান প্রজনন কেন্দ্র।
জেলার প্রধান ও ‘ক’ শ্রেণির এই পৌরসভায় নাগরিক সুবিধা নিয়ে জনমনে তীব্র অসন্তোষ। শহরের বাঞ্চানগর, সমসেরাবাদ ও মজুপুর এলাকায় ড্রেনগুলো পলিথিন ও আবর্জনায় ভরাট হয়ে আছে। স্থানীয়রা বলছেন, দিনের বেলাতেও কয়েল জ্বালিয়ে রাখতে হচ্ছে। বাজারের খাদ্যদ্রব্যের দোকানগুলোতে মশার উপদ্রবে ক্রেতারা বেশিক্ষণ দাঁড়াতে পারছেন না। নাগরিকদের দাবি, কেবল প্রধান সড়কে ফগিং না করে অলিগলিতে লার্ভা ধ্বংসের ওষুধ ছিটানো জরুরি।
রায়পুর ও রামগঞ্জ পৌরসভা এলাকায় চিত্র আরও ভয়াবহ। রায়পুরের নতুনবাজার, বাসটার্মিনাল ও সরকারি হাসপাতাল এলাকায় ময়লার স্তূপ থেকে মশার বংশবিস্তার ঘটছে। সংবাদকর্মী ও স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, পৌরসভা থেকে নিয়মিত ফগার মেশিন চালানো হয় না। এমনকি মশক নিধনের জন্য বরাদ্দকৃত ওষুধের সঠিক ব্যবহার নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন শ্রমিকরা। অভিযোগ রয়েছে, ওষুধের সঠিক প্রয়োগ না হওয়ায় মশাগুলো এখন ‘অপ্রতিরোধ্য’ হয়ে উঠেছে।
মেঘনা উপকূলীয় রামগতি পৌরসভাতেও মশার উপদ্রব চরমে। নদীর তীরবর্তী এলাকা হওয়ায় এখানে মশার বিস্তার সহজে ঘটে। সন্ধ্যা হলেই হাট-বাজার ও বাসাবাড়িতে মানুষের টিকে থাকা দায় হয়ে পড়ে। জলাবদ্ধতা ও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার অভাবকে মশা বাড়ার প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন স্থানীয়রা।
পৌর এলাকার মেসগুলোতে থাকা কয়েক হাজার শিক্ষার্থীর পড়ালেখা এখন মশার কয়েলের ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন। কলেজ শিক্ষার্থীদের দাবি, প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ টাকা কয়েল ও এরোসলের পেছনে খরচ করেও পড়ার টেবিলে মনোযোগ রাখা যাচ্ছে না।
জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, ঋতু পরিবর্তনের সাথে সাথে লক্ষ্মীপুরে মৌসুমী জ্বরের প্রকোপ বেড়েছে। সাধারণ জ্বর নাকি ডেঙ্গু, তা নিয়ে মানুষের মধ্যে তীব্র উদ্বেগ কাজ করছে। বিশেষ করে শিশু ও বৃদ্ধরা মশাবাহিত রোগের উচ্চ ঝুঁকিতে রয়েছেন।
রায়পুর সরকারি কলেজের প্রাণিবিজ্ঞান বিভাগের একজন শিক্ষক বলেন, “শুধু ধোঁয়া ছিটানো (ফগিং) মশা নিধনের স্থায়ী সমাধান নয়। মশার লার্ভা ধ্বংসে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে ‘লার্ভিসাইডিং’ করতে হবে। ওষুধের গুণগত মান ও সঠিক মাত্রার প্রয়োগ নিশ্চিত করা না হলে মশা আরও শক্তিশালী হয়ে উঠবে।”
রায়পুর পৌরসভার কঞ্জারভেন্সি ইন্সপেক্টর রোমানুর রহমান বাজেট স্বল্পতার কথা জানালেও, সদর ও অন্যান্য পৌরসভার প্রশাসনিক কর্মকর্তারা দাবি করেছেন তারা নিয়মিত পরিচ্ছন্নতা অভিযান চালাচ্ছেন। যদিও মাঠ পর্যায়ের বাস্তব চিত্র বলছে ভিন্ন কথা।
পৌরবাসীদের মতে, সমন্বিত কর্মপরিকল্পনা ছাড়া এই মশা সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। ড্রেনেজ ব্যবস্থার আধুনিকায়ন, নিয়মিত বর্জ্য অপসারণ এবং লোকদেখানো অভিযানের পরিবর্তে কার্যকর মশক নিধন কর্মসূচি গ্রহণের জন্য জেলা প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট পৌর কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন তারা। অন্যথায়, লক্ষ্মীপুরের এই চার পৌরসভা অচিরেই জনস্বাস্থ্য বিপর্যয়ের মুখে পড়তে পারে।


