লক্ষ্মীপুরের রায়পুর পৌরসভার কাঞ্চনপুর এলাকার বাসিন্দা ও সাবেক কাউন্সিলর স্বপন পাটোয়ারী (৫৫) প্রতি মাসে ৩৫০ থেকে ৪০০ টাকা পানির বিল দেন। কিন্তু তাঁর বাড়ির পানির লাইনে এক ফোঁটা পানিও আসে না। বেশি পানি পাওয়ার আশায় মোটা পাইপের সংযোগ নিয়েও কোনো লাভ হয়নি। একই অভিযোগ প্রতিবেশী শহীদ পাটোয়ারীরও। পৌর কর্তৃপক্ষের কাছে বারবার ধরনা দিয়েও কোনো প্রতিকার মেলেনি। বাধ্য হয়ে তাঁরা বাজার থেকে বা অন্যের বাড়ি থেকে খাবার পানি সংগ্রহ করছেন। আর গৃহস্থালির কাজে ব্যবহার করছেন পুকুরের ময়লা পানি। এতে পরিবারের সদস্যরা নানা অসুখে ভুগছেন।
শুধু স্বপন বা শহীদ পাটোয়ারীই নন, রায়পুর পৌরসভার পশ্চিম কাঞ্চনপুর, দেনায়েতপুর ও নতুন বাজারসহ কয়েকটি এলাকার অধিকাংশ বাসিন্দারই এখন একই দশা। কাঞ্চনপুর এলাকার দেওয়ান বাড়িতে পৌরসভার ২২টি পানির সংযোগ থাকলেও কোনোটিতেই পানি পাওয়া যাচ্ছে না। পাশের ভূঁইয়া বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, পানির লাইনটি ঘরের বাইরে অরক্ষিত অবস্থায় পড়ে আছে। গৃহিণী তাসলিমা খানম বলেন, ‘প্রায় এক মাস ধরে লাইনে পানি নেই। পাশের এক বাড়ি থেকে পানি এনে আমাদের চলতে হচ্ছে।’
গত রোববার (২৬ এপ্রিল) পৌরসভার ৪ ও ৬ নম্বর ওয়ার্ডের বিভিন্ন এলাকা ঘুরে গ্রাহকদের এই চরম ভোগান্তির চিত্র দেখা যায়। ৬ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা শহীদ পাটোয়ারীকে (৭৫) দেখা গেল দুই হাতে বালতিভর্তি পানি নিয়ে বাড়ি ফিরছেন। তিনি বলেন, ‘পৌরসভার লাইনে পানি আসে না অনেক দিন। রান্নার জন্য দূরের এক পুকুর থেকে পানি নিতে হচ্ছে। আর খাবার পানি জোগাড় করি অন্য বাড়ি থেকে। গোসল করতে হয় পুকুরের নোংরা পানিতে।’
পৌরসভার পানি সরবরাহ শাখা সূত্রে জানা গেছে, পৌর এলাকায় সরবরাহ লাইন প্রায় ৫-৬ কিলোমিটার। দৈনিক ২৫ লাখ লিটার পানি সরবরাহের সক্ষমতা থাকলেও বর্তমানে সরবরাহ করা সম্ভব হচ্ছে মাত্র ৭-৮ লাখ লিটার। পৌর এলাকায় ৮ হাজার হোল্ডিং ও প্রায় ২৭০০ পানির গ্রাহক রয়েছেন। পানি উত্তোলনের জন্য দুটি পাম্প থাকলেও সেগুলো চালাতে ৪২০ ভোল্টের বিদ্যুৎ প্রয়োজন। কিন্তু গত এক মাস ধরে পাওয়া যাচ্ছে ৩৬০-৩৭০ ভোল্ট। এর ওপর নতুন বাজার এলাকায় সড়ক সংস্কারের কারণে পানির লাইন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং ভূগর্ভস্থ পানির স্তরও নিচে নেমে গেছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে পৌরসভার একাধিক কর্মকর্তা বলেন, পৌরসভার যেটুকু সক্ষমতা আছে, সেটুকুরও যথাযথ ব্যবহার হচ্ছে না। অপরিকল্পিত পাইপলাইনের কারণে কিছু এলাকায় পানি পৌঁছালেও অনেক এলাকায় একেবারেই যাচ্ছে না। এছাড়া প্রভাবশালী ব্যক্তিরা মূল লাইনের সঙ্গে অবৈধভাবে পাম্প বসিয়ে পানি টেনে নিচ্ছেন। এসব অবৈধ সংযোগের সঙ্গে পৌরসভার কিছু অসাধু কর্মচারী জড়িত বলেও অভিযোগ রয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, আগে প্রতিটি বাড়িতে পুকুর থাকলেও এখন অনেক পুকুর ভরাট হয়ে গেছে। বাকি পুকুরগুলোর পানিও ব্যবহারের অনুপযোগী। গৃহবধূ মুক্তা আক্তার বলেন, ‘এ এলাকার ভূগর্ভস্থ পানিতে অতিরিক্ত লবণ। ব্যক্তিগত পাম্প বসিয়ে যে পানি তোলা হয়, তা খাওয়া যায় না। এখন খাওয়ার পানি কিনে খেতে হচ্ছে।’
পৌরসভার পানি শাখার উপসহকারী প্রকৌশলী মাসুদ রেজা বলেন, সরবরাহ লাইনে লিকেজ ও সড়ক সংস্কারের কারণে পানি সরবরাহে সমস্যা হচ্ছে। পানি সরবরাহ বাড়ানোর জন্য এই মুহূর্তে নতুন কোনো প্রকল্প নেই।
রায়পুর পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির ডেপুটি জেনারেল ম্যানেজার (ডিজিএম) মো. মোশারেফ হোসেন বলেন, ‘আমাদের চাহিদা ১৯ মেগাওয়াট, কিন্তু সরবরাহ পাচ্ছি মাত্র ৫-৬ মেগাওয়াট। লো-ভোল্টেজের কারণে পানি উত্তোলনে সমস্যা হচ্ছে, যা আমাদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে।’
রায়পুর পৌর প্রশাসক ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মেহেদী হাসান কাউছার বলেন, ‘পৌরসভার পানি সংকট নিয়ে সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলীদের সঙ্গে কথা বলেছি। সড়ক সংস্কারের সময় পাইপলাইন ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় এই সংকট তীব্র হয়েছে। এ বিষয়ে গত বৃহস্পতিবার নোয়াখালী থেকে একজন প্রকৌশলী এনে পরীক্ষা করানো হয়েছে। দ্রুত সমস্যা সমাধানের জন্য পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।’


