দেশের সয়াবিন ভাণ্ডার খ্যাত ‘সয়াল্যান্ড’ লক্ষ্মীপুরে এবার হাসি নেই কৃষকের মুখে। মেঘনা উপকূলীয় রায়পুর উপজেলার চরাঞ্চলে মাইলের পর মাইল বিস্তৃত সয়াবিন ক্ষেতে হানা দিয়েছে সর্বনাশা বিচা পোকা (পাতাখেকো পোকা)। দামী কীটনাশক প্রয়োগ করেও দমন করা যাচ্ছে না এই আক্রমণ। ফলে সোনালী স্বপ্নের সয়াবিন এখন কৃষকের গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিড়ম্বনার এখানেই শেষ নয়, চরম দুঃসময়ে পাশে নেই স্থানীয় কৃষি বিভাগ—এমনই গুরুতর অভিযোগ প্রান্তিক চাষিদের।
মাঠে মাঠে পোকার রাজত্ব, ধ্বংস হচ্ছে সবুজ বিপ্লব:
সরেজমিনে রায়পুরের দক্ষিণ চরবংশী ইউনিয়নের চরকাছিয়া এলাকা ঘুরে দেখা যায় এক হাহাকারের চিত্র। ১০-১৫ দিন আগে শুরু হওয়া এই পোকার আক্রমণে সয়াবিন গাছের পাতা ও ডগার রস চুষে নিচ্ছে বিচা পোকা। সবুজ পাতাগুলো ঝাঁঝরা হয়ে তামাটে বা কালো রং ধারণ করছে। পোকার আক্রমণে অনেক গাছে ফুল আসছে না, ফলে ফলন আসার সম্ভাবনাও ক্ষীণ হয়ে পড়ছে।
ঋণের চাপে পিষ্ট কৃষক:
কাছিয়ারচর এলাকার কৃষক শামছুদ্দিন আক্ষেপ করে বলেন, “৮ শতাংশ (বিঘা প্রতি হিসেবে) জমিতে প্রায় এক লাখ টাকা খরচ করে সয়াবিন চাষ করেছি। এনজিও আর মহাজনের কাছ থেকে চড়া সুদে ঋণ নিয়েছি। কিন্তু পোকার আক্রমণে সব শেষ হতে বসেছে। ১৫০০ টাকার ওষুধ দিয়েও কোনো কাজ হচ্ছে না।” একই উদ্বেগের কথা জানালেন কৃষক স্বজল মাঝি। গত বছর লাভ করলেও এবার পুঁজি হারানো শঙ্কায় তিনি দিশেহারা।
পরিসংখ্যান ও লক্ষ্যমাত্রা:
উপজেলা কৃষি অফিসের তথ্যমতে, চলতি বছর রায়পুরে ৮ হাজার ৬০০ হেক্টর জমিতে সয়াবিন আবাদ হয়েছে, যা গত বছরের তুলনায় ১ হাজার ১০০ হেক্টর বেশি। উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে প্রায় ৩০ হাজার মেট্রিক টন। তবে কৃষকদের দাবি, চরাঞ্চলেই এবার আবাদ হয়েছে ১০ হাজার হেক্টর জমিতে। এপ্রিলের শেষে ফসল ঘরে তোলার কথা থাকলেও বর্তমান পরিস্থিতিতে লক্ষ্যমাত্রা অর্জন নিয়ে বড় ধরনের অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে।
কৃষি বিভাগের ‘অনুপস্থিতি’ ও দায়সারা বক্তব্য:
ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের সবচেয়ে বড় অভিযোগ স্থানীয় কৃষি অধিদপ্তরের বিরুদ্ধে। কৃষক শামছুদ্দিনের সরাসরি অভিযোগ, “কৃষি অফিসের লোকজন মাঠে আসেনা। সরকার কৃষকের জন্য যা দেয়, তারা অফিসেই তা ভাগযোগ করে খেয়ে ফেলে।”
এদিকে, অভিযোগ অস্বীকার করে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মাজেদুল ইসলাম দাবি করেন, তারা নিয়মিত মাঠ পরিদর্শন করছেন। তবে অবাক করার বিষয় হলো, মাঠে পোকার ব্যাপক আক্রমণের খবর তার জানা নেই বলে জানান তিনি। এই পরিস্থিতির জন্য বৈরী আবহাওয়াকে দায়ী করছেন এই কর্মকর্তা।
সংকট ও সমাধান:
মেঘনার চরাঞ্চলের হাজার হাজার কৃষক এখন ঋণের বোঝা আর ফসলের ক্ষতির আশঙ্কায় দিন কাটাচ্ছেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, দ্রুত কার্যকর কীটনাশক নির্ধারণ এবং উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তাদের মাধ্যমে সঠিক পরামর্শ প্রদান না করা হলে দেশের সয়াবিন উৎপাদনে বড় ধরনের ধস নামতে পারে।
এখন দেখার বিষয়, কৃষি বিভাগ কি শেষ পর্যন্ত মাঠ পর্যায়ে গিয়ে কৃষকের পাশে দাঁড়াবে, নাকি কেবল দাপ্তরিক প্রতিবেদনেই সীমাবদ্ধ থাকবে ‘সয়াল্যান্ডের’ এই দুর্যোগ?


