ইরানে আবারও সরকারবিরোধী আন্দোলনের ঢেউ উঠেছে, আর এবার রাজপথে নেমেছেন বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। গত মাসে সহিংস দমন-পীড়নের পর এটিই প্রথম বড় ধরনের সমাবেশ বলে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। পরিস্থিতি এমন এক সময়ে উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে, যখন দেশটি আন্তর্জাতিক চাপ ও কূটনৈতিক টানাপোড়েনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।
রাজধানী তেহরানের শরিফ ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজি ক্যাম্পাসে শত শত শিক্ষার্থী মিছিল করেছেন—এমন ভিডিও যাচাই করেছে বিবিসি। প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, নতুন সেমিস্টারের শুরুতেই শিক্ষার্থীরা শান্তিপূর্ণভাবে জমায়েত হন। অনেকের হাতে ছিল জাতীয় পতাকা, আর স্লোগানে উঠে আসে সরকারবিরোধী বক্তব্য। দেশটির সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি–র বিরুদ্ধেও শ্লোগান শোনা যায়। পরে একই এলাকায় সরকার-সমর্থকদের পাল্টা সমাবেশ হলে দুই পক্ষের মধ্যে উত্তেজনা ও সংঘর্ষের পরিস্থিতি তৈরি হয়।
শুধু শরিফ বিশ্ববিদ্যালয় নয়, তেহরানের শহীদ বেহেশতি বিশ্ববিদ্যালয় এবং আমির কবির ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজিতেও অবস্থান কর্মসূচি ও স্লোগানের খবর পাওয়া গেছে। উত্তর-পূর্বাঞ্চলের মাশহাদ শহরেও শিক্ষার্থীরা ‘স্বাধীনতা’ ও ‘অধিকারের আওয়াজ তুলো’ স্লোগান দেন। দিনের শেষভাগে আরও সমাবেশের আহ্বান জানানো হয়, যদিও তাৎক্ষণিকভাবে গ্রেপ্তারের খবর নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
এই বিক্ষোভের পটভূমি আরও গভীর। গত মাসে অর্থনৈতিক অসন্তোষ থেকে শুরু হওয়া আন্দোলন দ্রুত সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে এবং ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর এটিকে অন্যতম বড় গণআন্দোলন হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক হিউম্যান রাইটস অ্যাক্টিভিস্টস নিউজ এজেন্সি (হরানা) দাবি করেছে, ওই দফার দমন-পীড়নে হাজারো মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে। তবে ইরানি কর্তৃপক্ষ বলছে, নিহতদের বড় অংশ নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য বা সহিংসতার শিকার সাধারণ নাগরিক।
এদিকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও উত্তেজনা বাড়ছে। ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় দেশগুলোর সন্দেহ নতুন নয়। সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প সীমিত সামরিক পদক্ষেপের সম্ভাবনার কথা উল্লেখ করেছেন। একই সঙ্গে সুইজারল্যান্ডে দুই দেশের কর্মকর্তাদের বৈঠকে আলোচনার অগ্রগতির কথাও শোনা গেছে। তবে চূড়ান্ত সমঝোতা হবে, নাকি সামরিক উত্তেজনা বাড়বে—তা এখনো অনিশ্চিত।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, অভ্যন্তরীণ বিক্ষোভ এবং বহির্বিশ্বের চাপ—দুই দিক থেকেই চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে তেহরান। নির্বাসিত বিরোধীপক্ষ বিদেশি হস্তক্ষেপকে স্বাগত জানালেও দেশের ভেতরের অনেক গোষ্ঠী তা প্রত্যাখ্যান করছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে চলছে তীব্র বিতর্ক—ইরানের ভবিষ্যৎ কোন পথে যাবে, সেই প্রশ্নে।
সব মিলিয়ে শিক্ষার্থীদের এই নতুন আন্দোলন কেবল ক্যাম্পাসের সীমায় আবদ্ধ নয়; এটি দেশের বৃহত্তর রাজনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে গেছে। পরিস্থিতি কোন দিকে মোড় নেয়, তা এখন নির্ভর করছে অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত ও আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক সমীকরণের ওপর।



