দেশের রাজনৈতিক নেতৃত্বের পাশাপাশি তাদের ঘনিষ্ঠ সহকারীদের ভূমিকা রাষ্ট্র পরিচালনায় ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। আসন্ন নির্বাচনের পর সরকার ও বিরোধী—উভয় পক্ষের নেতাদের এপিএস ও পিএস নিয়োগে যোগ্য, দক্ষ ও সুশিক্ষিত ব্যক্তিকে দায়িত্ব দেওয়ার দাবি উঠেছে বিভিন্ন পেশাজীবী মহল থেকে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু মন্ত্রী বা সংসদ সদস্য নয়—সচিব, মন্ত্রীর এপিএস-পিএস এবং সচিবের পিএসসহ সংশ্লিষ্ট পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের কাজ সম্পর্কে সুস্পষ্ট জ্ঞান ও বাস্তব অভিজ্ঞতা থাকা জরুরি। কারণ এই ব্যক্তিরাই মূলত একটি মন্ত্রণালয়ের নীতিনির্ধারণ ও বাস্তবায়নে নেপথ্য ভূমিকা পালন করেন।
এদিকে বিরোধী দলগুলোর ক্ষেত্রেও একই ধরনের দক্ষতা প্রয়োজন বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। তাদের মতে, বিরোধী দলের নেতাদের সহকারীরা যদি জ্ঞানসম্পন্ন, বিচক্ষণ ও প্রজ্ঞাবান হন, তাহলে সরকারের কার্যক্রমের গঠনমূলক সমালোচনা সম্ভব হবে। এতে করে ভুল সিদ্ধান্ত সংশোধনের সুযোগ তৈরি হবে এবং রাজনীতিতে সুস্থ প্রতিযোগিতা বজায় থাকবে।
জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক মো. হুমায়ন কবির বলেন, তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের উদাহরণ দিলেই বিষয়টি স্পষ্ট হয়। সাংবাদিকতা বিষয়ে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা নিয়ে কেউ যদি সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রে কাজ করেন, তাহলে যেমন দেশ উপকৃত হয়, তেমনি ব্যক্তি নিজেও পেশাগত মর্যাদা পান। একইভাবে মন্ত্রী, তার এপিএস ও পিএস এবং সচিব ও তার পিএস যদি সংশ্লিষ্ট বিষয়ে শিক্ষিত ও অভিজ্ঞ হন, তাহলে পুরো প্রশাসনিক কাঠামো আরও সচেতন ও কার্যকর হয়ে ওঠে।
তিনি আরও বলেন, একজনের পরিবর্তে যদি পাঁচজনই দক্ষ ও প্রজ্ঞাসম্পন্ন হন, তাহলে তাদের পারস্পরিক আলোচনা ও সিদ্ধান্ত হবে অনেক বেশি পরিপক্ক ও স্বচ্ছ। এর ফলে মন্ত্রণালয় পরিচালনা হবে স্মার্ট পদ্ধতিতে এবং অঞ্চলভিত্তিক উন্নয়ন পরিকল্পনায় ভারসাম্য নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একটি মন্ত্রণালয়ের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, মেধার অপচয় ও অপব্যবহার রোধে এই পাঁচটি পদ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রকৃত অর্থে তারাই একটি মন্ত্রণালয়ের দৈনন্দিন ও কৌশলগত কার্যক্রম পরিচালনা করেন। সৎ, দক্ষ ও দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের নিয়োগ দেওয়া হলে দল ও দেশ—উভয়ই উপকৃত হবে।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. মুন্সী ইসরাইল হোসেন বলেন, মন্ত্রী, সচিব এবং তাদের সহকারীরা যদি সংশ্লিষ্ট বিষয়ে পড়াশোনা করে আসেন, তাহলে অধীনস্থ কর্মকর্তাদের কাজ করতেও সুবিধা হয়। এর ইতিবাচক প্রভাব সরাসরি সমাজে পড়ে এবং সেবার মান বাড়ে।
অন্যদিকে, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. ফারহাত তাসনীম গবেষণার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তিনি বলেন, যারা গবেষণার সঙ্গে যুক্ত বা গবেষণাভিত্তিক জ্ঞান রাখেন, তাদের দিয়ে মন্ত্রী বা সংসদ সদস্যদের বক্তব্য ও নীতিগত সিদ্ধান্ত বিশ্লেষণ করানো উচিত। এতে করে সংসদ ও জনগণের সামনে ভুল বা অপরিপক্ক তথ্য উপস্থাপনের ঝুঁকি কমবে।
তিনি আরও উল্লেখ করেন, বাংলাদেশে সাধারণত প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা থাকলেও অনেক দেশে প্রতিটি মন্ত্রণালয়ের জন্য আলাদা পরামর্শক পর্ষদ থাকে। প্রয়োজন অনুযায়ী এসব পর্ষদের সঙ্গে আলোচনা করেই গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
উপরোক্ত পাঁচটি পদে নিয়োগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বিষয়ভিত্তিক জ্ঞানসম্পন্ন, সৎ ও যোগ্য ব্যক্তিদের দায়িত্ব দিলে রাষ্ট্র পরিচালনা হবে আরও আধুনিক ও কার্যকর। একটি সুপরিকল্পিত ও পরিপক্ক সিদ্ধান্তই পারে দেশের চেহারা বদলে দিতে।



