বাংলাদেশ নারী ফুটবল দলের জন্য এটি এক অনন্য ইতিহাস। প্রথমবারের মতো এএফসি নারী এশিয়ান কাপের মূলপর্বে জায়গা করে নিয়েছে তারা। এই অর্জন নিছক একটি খেলার ফলাফল নয়—এটি জাতীয় গৌরব, সম্ভাবনার এক নতুন দিগন্ত। বাহরাইন, মিয়ানমার এবং তুর্কমেনিস্তানের মতো দলকে হারিয়ে ‘সি’ গ্রুপে চ্যাম্পিয়ন হয়ে বাংলাদেশের মেয়েরা সেই সম্ভাবনার বাস্তব রূপ দিয়েছেন। কিন্তু দুঃখজনকভাবে, এই গৌরব উদযাপন করতে গিয়ে বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের (বাফুফে) আয়োজন নিয়ে শুরু হয়েছে বিতর্ক।
রোববার দিবাগত রাত ১টা ২৫ মিনিটে ঢাকায় ফিরছে এই ইতিহাস গড়া নারী দল। তাদের অভ্যর্থনা জানাতে বাফুফে আয়োজন করেছে একটি বিশেষ সংবর্ধনার—যার সময় নির্ধারণ করা হয়েছে রাত আড়াইটা। এই সময়টি দেশের সাধারণ সামাজিক বা ক্রীড়াঙ্গনের প্রেক্ষাপটে এতটাই অস্বাভাবিক যে, অনেকেরই প্রশ্ন—এটা কি উদযাপন, নাকি ক্লান্ত শরীরের প্রতি এক ধরনের অবহেলা?
রাত আড়াইটায় সংবর্ধনা—অভিনব না অবিবেচনাপ্রসূত?
বাফুফের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, এই অসময়ের আয়োজন করার একমাত্র কারণ হলো দলের দুই গুরুত্বপূর্ণ সদস্য, ঋতুপর্ণা চাকমা ও মনিকা চাকমা, সোমবার সকালেই ভুটানে লিগ খেলতে রওনা হবেন। ফলে তাদের উপস্থিতি নিশ্চিত করতে হলে মধ্যরাতের আয়োজন ছাড়া উপায় ছিল না। কিন্তু প্রশ্ন উঠছে—তাদের যাত্রার দিন একদিন পিছিয়ে অথবা দেশে ফিরে বিশ্রামের পর আলাদা করে সংবর্ধনা দিলে কি খুব ক্ষতি হতো?
আন্তর্জাতিক ভ্রমণ শেষে ক্লান্ত খেলোয়াড়দের এক ঘণ্টা বিশ্রাম না দিয়ে, বিমানের দরজা থেকে সরাসরি অনুষ্ঠানস্থলে নেওয়ার চিন্তা কতটা মানবিক? শুধু তাই নয়, এত রাতে জনসাধারণ, সাংবাদিক বা ফুটবলপ্রেমীরা আদৌ উপস্থিত থাকতে পারবেন কিনা, সেটিও প্রশ্নসাপেক্ষ। এমন সময় যখন শহর ঘুমিয়ে থাকে, তখন এমন আয়োজনে কি সত্যিকার অর্থে সম্মান দেখানো হয়? নাকি এটি একটি লোক দেখানো তৎপরতা মাত্র?
বাফুফের অতীত ও বর্তমান—শুধুই প্রতিশ্রুতি, বাস্তবায়ন নেই
এটা প্রথমবার নয়, যখন বাফুফের সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। ২০২৩ সালের মার্চে অর্থের অভাবে নারী দলকে অলিম্পিক বাছাইপর্বে পাঠানো হয়নি—যেখানে অংশ নেওয়ার মাধ্যমে মেয়েরা আরও অভিজ্ঞতা অর্জন করতে পারতেন। সেই বাছাইপর্বও অনুষ্ঠিত হয়েছিল মিয়ানমারেই। অথচ ঠিক এক বছর পর, একই দেশে গিয়েই দলটি সাফল্য অর্জন করেছে, যা তাদের আত্মনিবেদন ও মানসিক দৃঢ়তার প্রমাণ।
এছাড়া ২০২২ সালের সাফ চ্যাম্পিয়নশিপ জয়ের পর ঘোষিত দেড় কোটি টাকার বোনাস আজও হাতে পাননি খেলোয়াড়রা। খেলোয়াড়দের মাসিক বেতন এখনো মাত্র ৫৫ হাজার টাকা, যা একজন জাতীয় পর্যায়ের নারী ফুটবলারের জন্য হতাশাজনক। মেয়েরা এখনো স্থায়ী চুক্তি, উন্নত চিকিৎসা সুবিধা বা বৈজ্ঞানিক খাদ্য পরিকল্পনার মতো মৌলিক সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত। অথচ ভুটানের মতো ছোট দেশের দলও এএফসি ক্লাব লিগে অংশ নিচ্ছে, যেখানে বাংলাদেশের কোনো ক্লাবই নেই।
অভিজ্ঞতা থেকেও শিক্ষা নেয় না বাফুফে?
এতদিনের অভিজ্ঞতাতেও বাফুফে কেন যেন বারবার ব্যর্থ হচ্ছে নারী ফুটবলারদের নিরাপত্তা ও মর্যাদা নিশ্চিত করতে। সাফ জয় পরবর্তী ছাদখোলা বাসের সংবর্ধনার কথা এখনও অনেকে ভুলতে পারেননি। বিশৃঙ্খল পরিবেশ, সড়কের বিলবোর্ডে আঘাত পেয়ে ঋতুপর্ণার মাথায় লেগেছিল তিনটি সেলাই। তার মতো খেলোয়াড়, যিনি এবার মিয়ানমারের বিপক্ষে দুই গোল করে বাংলাদেশকে ইতিহাস গড়তে সাহায্য করেছেন—তাঁর নিরাপত্তা কি এতটাই তুচ্ছ?
বিমানবন্দরেই একটি সংক্ষিপ্ত অথচ মর্যাদাপূর্ণ সংবর্ধনার আয়োজন করা যেত। ফুলেল শুভেচ্ছা, একটি স্মারক ও আর্থিক সম্মাননা—সবকিছু মিলিয়ে একটি ভারসাম্যপূর্ণ প্রক্রিয়া হতে পারত। তাতে ক্লান্ত খেলোয়াড়দের বিশ্রামও নিশ্চিত হতো, আবার দেশবাসীও জানত, তাদের কৃতিত্ব যথাযথভাবে সম্মানিত হয়েছে।
পরিকাঠামোর অভাব—নারী ফুটবলের বড় সংকট
নারী ফুটবলে ধারাবাহিকতা তৈরির জন্য টেকসই লিগ ও টুর্নামেন্ট অত্যন্ত জরুরি। বর্তমানে দেশে একটি মাত্র নারী লিগ হয়, তাও বছরের নির্দিষ্ট সময়ের বাইরে কোনো আয়োজন থাকে না। কোনো ফ্র্যাঞ্চাইজি ভিত্তিক লিগ নেই, নেই গ্রীষ্মকালীন বা শীতকালীন টুর্নামেন্ট। কোচিং স্টাফেও পর্যাপ্ত জনবল নেই—বিদেশি গোলরক্ষক কোচ বা সহকারী কোচের অভাব প্রকট।
উন্নত দেশগুলোর মতো খাদ্য পরিকল্পনায় একজন পুষ্টিবিদ, ক্লাব পর্যায়ে উন্নত প্রশিক্ষণ সুবিধা ও মনোবিদ থাকাও অত্যন্ত জরুরি। কিন্তু এসব বিষয়ে বাফুফের পরিকল্পনা খুবই ঝাপসা। অথচ সাফল্য ধরে রাখতে হলে এই সবকিছুর দিকে এখনই মনোযোগ দেওয়া প্রয়োজন।
সম্মান না ক্লান্তি—সংবর্ধনার মূল উদ্দেশ্য কী?
একটি বিষয় স্পষ্ট—নারী ফুটবলাররা দেশের মুখ উজ্জ্বল করেছেন। ভেতরের নানা সংকট, কোচের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ এবং অব্যবস্থাপনা সত্ত্বেও তারা মাঠে পারফর্ম করেছেন। ঋতুপর্ণা চাকমা, মনিকা চাকমারা শুধু ক্রীড়াবিদ নন—তারা আমাদের প্রেরণা। তাদের নিয়ে চিন্তা করার মানে কেবল রাত ২টার অনুষ্ঠানের ফটোসেশন নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদি পেশাদার কাঠামো গড়ে তোলা।
এই প্রজন্ম যদি এখন অবহেলিত হয়, তাহলে আগামী প্রজন্মের কেউ নারী ফুটবলে আসতে চাইবে না। তাই প্রয়োজন লোক দেখানো সংবর্ধনার পরিবর্তে মানবিক, কার্যকর ও স্থায়ী সম্মাননা সংস্কৃতি গড়ে তোলা। বাফুফের উচিত আত্মসমালোচনার সুযোগ তৈরি করে, এই অর্জনকে দেশের নারী ফুটবলের পূর্ণাঙ্গ রূপান্তরের সূচনাবিন্দুতে পরিণত করা।
এই ইতিহাস কেবল একটি ম্যাচ নয়, এটি একটি সুযোগ—ভবিষ্যতের ভিত্তি নির্মাণের। সেই সুযোগকে রাত ২টার ক্লান্ত মুখ নয়, সকালের সুপরিকল্পিত আলোয় উদযাপন করা উচিত ছিল।




