লক্ষ্মীপুর জেলাজুড়ে এ বছর আম গাছে মুকুলের সমারোহ দেখে কৃষকদের চোখেমুখে যে আশার ঝিলিক দেখা দিয়েছিল, মৌসুমের মাঝপথে এসে তা ফিকে হতে শুরু করেছে। ঋতুর শুরুতে গাছের থোকায় থোকায় সোনালী মুকুল দেখে বাম্পার ফলনের স্বপ্ন বুনলেও, প্রকৃতির খেয়ালিপনা আর বৈরী আবহাওয়ায় এখন স্বপ্নভঙ্গের হতাশায় নিমজ্জিত জেলার আমচাষিরা।
সদর উপজেলাসহ রায়পুর, রামগঞ্জ, রামগতি ও কমলনগরের প্রান্তিক এলাকাগুলো ঘুরে দেখা গেছে এক বিষণ্ন চিত্র। বাগানগুলোর অধিকাংশ গাছেই এখন মুকুলের দেখা নেই। কোথাও কালবৈশাখীর তাণ্ডবে মুকুল ঝরে গেছে, আবার কোথাও প্রচণ্ড দাবদাহ আর অনিয়মিত বৃষ্টিপাতের কারণে গুটি অবস্থায়ই ফল নষ্ট হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়েছে। ফলে ডালপালার ফাঁকে ফলের যে প্রাচুর্য থাকার কথা ছিল, তা এখন নগণ্য।
মজচৌধুরীর হাট এলাকার বড় আম বাগান মালিক মানিক পাটওয়ারীনিজের হতাশা ব্যক্ত করে বলেন, “মৌসুমের শুরুতে যখন বাগানজুড়ে মুকুলের ঘ্রাণ ছড়িয়েছিল, তখন ভেবেছিলাম গত কয়েক বছরের ক্ষতি এবার পুষিয়ে নিতে পারব। প্রচুর টাকা খরচ করে কীটনাশক ও পরিচর্যা করেছিলাম। কিন্তু হঠাৎ করে বয়ে যাওয়া তপ্ত হাওয়া আর কালবৈশাখীর ঝাপটায় সব ওলটপালট হয়ে গেছে। মুকুলগুলো গুটি হওয়ার আগেই কালো হয়ে ঝরে পড়েছে। এখন বিনিয়োগ ওঠানোই অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে।”
একই ক্ষোভ ও দীর্ঘশ্বাস শোনা গেল সদর উপজেলার কৃষক খোকনেরকণ্ঠে। তিনি আক্ষেপ করে জানান, “গাছে মুকুল দেইখা মনটা খুশিতে ভইরা উঠছিল। ভাবছিলাম এবার আমের ব্যবসা দিয়া সংসারের অভাব দূর হইব। কিন্তু কপাল মন্দ! অসময়ের বৃষ্টি আর হঠাৎ গরমের কারণে গুটিগুলো শুকিয়ে গেছে। এখন বড় বড় গাছগুলোতে কেবল পাতাই নজরে পড়ে, আমের দেখা মেলা ভার।”
তবে জেলার সব জায়গায় চিত্র এক নয়। সদর উপজেলার কিছু এলাকায় যেখানে নিয়মিত সেচ ও বিশেষ বৈজ্ঞানিক পরিচর্যা করা হয়েছে, সেখানে আমের ফলন তুলনামূলক ভালো হয়েছে। এই আংশিক সাফল্য বাকি চাষিদের মনেও কিছুটা স্বস্তি জোগাচ্ছে।
কৃষি বিশেষজ্ঞদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে তাপমাত্রার অস্বাভাবিক ওঠানামা এবং সঠিক সময়ে বৃষ্টি না হওয়া আম চাষের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তারা বলছেন, আমের মুকুল থেকে কাঙ্ক্ষিত ফলন পেতে আবহাওয়া অনুকূলে থাকা অপরিহার্য। বিশেষ করে গুটি ধরার সময় অতিরিক্ত তাপদাহ আমের জন্য ‘মরণফাঁদ’ হিসেবে কাজ করে। এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় কৃষকদের আধুনিক কৃষি প্রযুক্তির ব্যবহার এবং আপদকালীন সঠিক পরিচর্যার পরামর্শ দিচ্ছেন তারা।
আশঙ্কাজনক এই ফলন বিপর্যয়ের কারণে জেলার অসংখ্য চাষি এখন বড় ধরনের আর্থিক লোকসানের মুখে। এই সংকটময় মুহূর্তে সরকারি প্রণোদনা এবং কৃষি বিভাগের সরাসরি তদারকির দাবি জানিয়েছেন ক্ষতিগ্রস্ত বাগান মালিকরা। তাদের প্রত্যাশা, সঠিক দিকনির্দেশনা পেলে আগামীতে তারা এই ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে সক্ষম হবেন।


