লক্ষ্মীপুরের রায়পুর পৌরসভাসহ ১০টি ইউনিয়নে ৩৫টি হাট-বাজার রয়েছে। এসব হাট-বাজারে পশু, পান, মাছ ও বিভিন্ন পরিবহনে সরকার ঘোষিত টোল বা খাজনা আদায়ের নিয়ম না মেনে নিজেদের ইচ্ছামত চারগুণ হারে রশিদ ছাড়াই টোল ও খাজনা আদায় করছেন ইজারাদাররা। শুক্রবার ও সোমবার কয়েকটি হাট-বাজারে ঘুরে ইজারাদাররা অনিয়ম করে রশিদ ছাড়াই টোল আদায় করেছেন সরেজমিনে দেখা যায়। এতে ইজারাদারদের অতিরিক্ত টোল আদায়ের কারণে ফসল উৎপাদনকারী কৃষক এবং ব্যবসায়ীরা বর্তমানে চরম ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছেন।
সুত্রে জানা যায়, প্রতি বাংলা বছরের শুরুতে বিভিন্ন হাট বাজারের ইজারা গ্রহন করে ইজারাদারগণ। এর মধ্যে রয়েছে তিনটি বড় পান বাজার, মাছ বাজার, তরকারী বাজার, কৃষি বাজার এবং দৈনন্দিন বিভিন্ন যানবাহনের যাত্রাবিরতি ইত্যাদি। সরকারের ইজারা নীতিমালা অনুসারে কোন ইজাড়াদার ওই বাজার সাব ইজারা দিলে তার মূল বাজারের ইজারা বাতিল হয়ে যাবে। সরকারের এই নিয়ম মেনে ইজারাদাররা একটি চু্ক্তি বা দলিলে স্বাক্ষরও করেন।
আরও পড়ুন- বিদ্রোহের শাস্তি ‘মৃত্যুদণ্ড’ রেখে আনসার ব্যাটালিয়ন আইন অনুমোদন
সোমবার সকালে (৪ সেপ্টেম্বর) শহরের নতুন বাজার মহিলা কলেজ সংলগ্ন পান হাটা গিয়ে দেখা যায়, প্রতিসপ্তাহে শুক্রবার ও সোমবার প্রায় এক’শ কৃষক, বর্গাচাষি ও ব্যবসায়ীদের সমন্বয়ে পান হাট বসে। এ বাজারে এক’শ বছর ধরে চাঁদপুরের হাইমচর, আলগি, রায়পুরের জনতা বাজার, গন্ডামারা, হায়দরগঞ্জ, ঝাউডুগি, উদমারা, বাংলা বাজার এলাকার কৃষক ও চাষিরা পান বিক্রি করতে আসেন।
এছাড়াও হায়দরগঞ্জ ও ক্যাম্পেরহাট বাজারে বড় পানবাজার বসে। এসব বাজারে রশিদ ছাড়াই বিক্রেতার কাছ থেকে ১০০-১৭০ টাকা এবং ক্রেতার কাছ থেকে ২০-৫০ টাকা করে আদায় করা হয়। বাজার দিন প্রায় ২০ হাজার বিড়া (১ বিড়া ৭২টি পান থাকে) বিক্রি হয়।
প্রায় সময় বিভিন্ন হাট বাজারে কৃষকদের সাথে ইজাদারদের বাকবিতন্ডা পাশাপাশি প্রায় বাজারে প্রভাবশালী ইজাদারগণ কৃষক ও বাবসায়ীদের শরীরে হাতও তুলতে দিধাবোধ করছেন না বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
প্রতিবেদনের সময় রায়পুর পৌর শহরের নতুন বাজারের পান হাটি, কাঁচা বাজার, জনতা বাজার, টিসি সড়ক, চরবংশী ইউপির মোল্লার হাট, খাসের হাট, হাজিমারা সুইসগেইট বাজার, কেরোয়া ইউপির সুনামগঞ্জ ও মীরগঞ্জ বাজার, চরআবাবিল ইউপির হায়দারগঞ্জ বাজার, উদমারা, ক্যাম্পেরহাট, সোনাপুর ইউপির রাখালিয়া বাজার, বামনী বাংলাবাজার সহ ৩৫টি বাজারে ইজাদারদের পক্ষ থেকে টোল আদায়ের মূল্য তালিকা সম্বলিত কোন সাইন বোর্ড বাজারে দেখা যায়নি!
আরও পড়ুন- সংসদের ২৪তম অধিবেশন বসছে বিকেলে
অনুসন্ধানে জানা যায়, উপজেলার প্রায় প্রতি হাটবাজারে সরকারের এ নীতি অমান্য করে হাট বাজার সাব ইজারা হচ্ছে। আবার রাজনৈতিকভাবে সিন্ডিকেটের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রিত হয় বলেও জানা যায়। পরে মুল ইজারাদারগণ প্রতিটি বাজার টুকরো টুকরো করে একাধিক ইজারাদারদের কাছে বিক্রি করেন। শেষে ওইসব সাব-ইজারাদারগণ নিজেদের ইচ্ছা মতো টোল বা খাজনা আদায় করে থাকেন। সরকারের ঘোষিত ৩৭টি পণ্যের মধ্যে গৃহস্থের জন্য মাত্র ১১টি পণ্যের টোল বিধান থাকলেও বাকি ২৫টি পণ্যের জন্য কোন টোল প্রদান করতে হয় না। ইজাদাররা কোন পণ্য থেকেই টোল গ্রহণ বাদ দিচ্ছেন না।
গৃহস্থের যে কোন পণ্য বাজারে তুললেই ১০০ টাকা থেকে ১২০ টাকা পর্যন্ত টোল আদায় করা হয়। সরকারী টোল আইন অনুযায়ী গৃহস্থের জন্য সর্বোচ্চ হাঁস, মুরগি, কবুতর দোকান প্রতি ৬ টাকা খাজনা দিতে হবে। বাস্তবে প্রতি হাঁস, মুরগি থেকে শতকরা ৩০ থেকে ৪০ টাকা খাজনা আদায় করা হয়ে থাকে। নারিকেল জোড়া ও দুধ প্রতি কেজি ২ টাকা। তরকারী শাক-সবজির দোকান ৩ টাকা, ফল শতকরা ২ টাকা, মাছ দোকান ৩ টাকা, ধান মণ প্রতি ৫ টাকা, ডিম দোকান প্রতি ৫ টাকা, বুট-বাদাম-সয়াবিন দোকান প্রতি ৫ টাকা টোল আদায় করার কথা থাকলেও বাস্তবে তা মানা হচ্ছে না।
আরও পড়ুন- গত ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গুতে আরও ৪ জনের মৃত্যু, হাসপাতালে ভর্তি ১৫৩৪
সরকারের বাজার ইজারা আইন অনুযায়ী ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে দোকান প্রতি ২ টাকা থেকে ১৫ টাকা, ঘর দোকান একমাত্র মাংসের দোকান ৫০ টাকা টোল আদায়ের বিধান থাকলেও ইজাদাররা দোকান প্রতি ১০০ টাকা থেকে ২৫০ টাকা আদায় করে থাকেন।
শুক্রবার পান হাটা গৃহস্থ আহছান উল্যা, বিক্রেতা নারায়ন দাস ও হাছান আলী অভিযোগ করে বলেন, আমরা প্রায় এক’শ খুচরা ও প্রাইকারী ব্যবসায়ী প্রতি শুক্র ও সোমবার রায়পুর নতুনবাজারে পান বিক্রি করতে আসি। খাজনা আদায় কারী বাবুল মিয়া রশিদ ছাড়েই বিক্রেতাদের কাছ থেকে ১০০ থেকে ১৭০ টাকা ও ক্রেতাদের কাছ থেকে ৫০-৭০ টাকা হারে জনপ্রতি হারে আদায় করছেন। প্রতিবাদ করলে মারধর করতে তেড়ে আসে।
তবে এব্যাপারে বাবুল মিয়া বলেন, ‘সাঈদ হোসেন নিক্সন নামের একজন পৌরসভা থেকে ১৫ লক্ষ টাকায় বাজার কিনেছেন। পূর্বের খাজনা আদায়কারীদের মত রশিদ ছাড়া খাজনা আদায় করছি। সরকারী মূল্যে খাজনা আদায় করলে আমাদের অর্ধেক টাকাও উঠবে না।’
আরও পড়ুন- অশিক্ষিত-মূর্খদের হাতে দেশ পড়লে অগ্রগতি হবে নাঃ প্রধানমন্ত্রী
এছাড়া বাজার ইজাদারদের বাজার পরিস্কার পরিচ্ছন্ন করার দায়িত্ব থাকলেও তারা তা পালন করছেন না। বাজার পরিস্কার পরিচ্ছন্ন রাখার জন্য ব্যবসায়ীদের মাসে প্রায় ১০০ টাকা আদায় করছে বণিক সমিতি। ব্যবসায়ীদের অভিযোগ ইজারাদারা বছরের পর বছর এ রকম ইজারা গ্রহন করলেও প্রশাসনের পক্ষ থেকে কোন সহযোগিতাই ব্যবসায়ীরা পাচ্ছে না।
রায়পুর পৌরসভার মেয়র গিয়াস উদ্দিন রুবেল ভাট বলেন, ‘পানবাজারসহ রায়পুর পৌরসভায় ৪টি বাজারে রয়েছে। খাজনা আদায়ের পণ্যের তালিকার ব্যাবস্থা করা হবে। বিক্রেতার পাশাপাশি ক্রেতার কাছ থেকে খাজনা আদায় হচ্ছে বলে তা আমার জানা নেই। বিষয়টি গুরুত্বের সাথে দেখবো।’
রায়পুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) রাসেল ইকবাল বলেন, ‘খাজনা আদায়ের তালিকা প্রত্যেকটি ইজাদারের কাছে আছে। কেউ যদি এর বেশি গ্রহন করে থাকে এরকম কোন অভিযোগ কাছে আসলে তদন্ত করে তার বিরুদ্ধে আইনগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’



