বাংলাদেশকে একটি দুর্নীতিমুক্ত, ন্যায়ভিত্তিক ও মানবিক রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তোলার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান। তিনি বলেছেন, দল হিসেবে জামায়াত নিজেরা যেমন দুর্নীতিতে জড়াবে না, তেমনি কোনো দুর্নীতিবাজ ব্যক্তি বা গোষ্ঠীকেও কোনোভাবেই প্রশ্রয় দেওয়া হবে না। আইন ও বিচার ব্যবস্থায় রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করার কথাও বলেন তিনি।
আজ বৃহস্পতিবার (০৫ ফেব্রুয়ারি) দুপুরে রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলার মহিষালবাড়ি মহিলা ডিগ্রি কলেজ মাঠে আয়োজিত এক নির্বাচনী জনসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন জামায়াত আমির। জনসভায় রাজশাহী-১ (গোদাগাড়ী-তানোর) আসনের জামায়াত মনোনীত প্রার্থীর পক্ষে নেতাকর্মীদের উদ্দেশে দিকনির্দেশনামূলক বক্তব্য দেন তিনি।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, দেশে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা ছাড়া প্রকৃত পরিবর্তন সম্ভব নয়। তিনি বলেন, এমন বিচারব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করতে হবে, যেখানে একজন সাধারণ নাগরিক অপরাধ করলে যে শাস্তি পাবে, একই অপরাধে দেশের প্রধানমন্ত্রী কিংবা রাষ্ট্রপতিও একই আইনের আওতায় পড়বে। এখানে কোনো পদ, পরিচয় কিংবা ক্ষমতার কারণে ছাড় দেওয়ার সুযোগ থাকবে না। ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হলে জনগণ স্বাভাবিকভাবেই নিজেদের অধিকার ফিরে পাবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
তিনি জানান, জুলাই সনদ ও রাষ্ট্র সংস্কারের সব প্রস্তাব বাস্তবায়নের অঙ্গীকারের ভিত্তিতেই ১১টি রাজনৈতিক দল একত্রিত হয়েছে। এই জোটে প্রার্থী নির্বাচনের ক্ষেত্রে কঠোর যাচাই-বাছাই করা হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ১১ দলের মধ্যে এমন কেউ নেই, যার বিরুদ্ধে ব্যাংক ডাকাতি, চাঁদাবাজি, ঋণখেলাপি, মামলা বাণিজ্য কিংবা নারী নির্যাতনের মতো অভিযোগ রয়েছে। গুণে গুণে, বেছে বেছে প্রার্থী নির্বাচন করা হয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি।
আসন্ন নির্বাচন প্রসঙ্গে জামায়াত আমির বলেন, এটি কোনো সাধারণ নির্বাচন নয়; এটি জাতির দিক পরিবর্তনের নির্বাচন। তিনি বলেন, বহু ত্যাগ ও রক্তের বিনিময়ে এই নির্বাচনের সুযোগ এসেছে। যারা বুক চিতিয়ে লড়াই করে পরিবর্তনের পথ তৈরি করেছিলেন, তাদের অনেকেই আজ আর বেঁচে নেই। সেই আত্মত্যাগের মর্যাদা রক্ষা করা আমাদের দায়িত্ব। এই নির্বাচন সঠিক পথে জাতিকে এগিয়ে নেওয়ার একটি ঐতিহাসিক সুযোগ বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ রূপরেখা তুলে ধরে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, দেশের ভৌগোলিক সীমানা অপরিবর্তিত থাকবে; তবে রাষ্ট্র পরিচালনার ধরণে মৌলিক পরিবর্তন আনা হবে। বাংলাদেশকে অন্য কোনো দেশের অনুকরণে নয়, বরং বাংলাদেশের মতো করেই সাজানো হবে। তিনি বলেন, কেউ কেউ সিঙ্গাপুর বা কানাডার সঙ্গে তুলনা করেন, কিন্তু জামায়াত চায় একটি উত্তম বাংলাদেশ—যে বাংলাদেশে প্রতিটি মানুষ গর্বের সঙ্গে বলবে, ‘আলহামদুলিল্লাহ, আমি একজন বাংলাদেশি।’
সমাজের সব শ্রেণির মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার অঙ্গীকার করে তিনি বলেন, শিশু, বৃদ্ধ, নারী ও পুরুষ—সবাই নিরাপদ থাকবে এমন বাংলাদেশ গড়াই তাদের লক্ষ্য। বিশেষ করে নারীদের ঘর, কর্মস্থল ও চলাচলের ক্ষেত্রে পূর্ণ নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে। সমাজ ও রাষ্ট্র তাদের মর্যাদা দেবে বলেও আশ্বাস দেন তিনি।
শিক্ষা ব্যবস্থার প্রসঙ্গে জামায়াত আমির বলেন, এমন একটি শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলা হবে, যা দেশপ্রেমিক, দায়িত্বশীল ও সংগ্রামী নাগরিক তৈরি করবে। তিনি বলেন, যুব সমাজ কারও কাছে বেকার ভাতা চাইবে না; বরং কর্মসংস্থান ও আত্মনির্ভরতার সুযোগ সৃষ্টি করা হবে। পাশাপাশি গ্রামীণ অর্থনীতিকে আমূল পরিবর্তনের পরিকল্পনার কথাও জানান তিনি।
শ্রমজীবী মানুষের অধিকার বিষয়ে তিনি বলেন, শ্রমিকদের ন্যায্য দাবি আদায়ে রাষ্ট্রকেই দায়িত্ব নিতে হবে। শ্রমিকদের দাবি আদায়ের জন্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মুখোমুখি দাঁড় করানো হবে না। শিল্প ও ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় কর্মজীবী নারীদের জন্য বেবি কেয়ার ও ডে-কেয়ার সেন্টার স্থাপন এবং বিশেষায়িত হাসপাতাল গড়ে তোলার পরিকল্পনার কথাও জানান তিনি।
সমাজে নৈতিকতা ও শালীনতা প্রতিষ্ঠার ওপর গুরুত্ব দিয়ে তিনি বলেন, এমন একটি বাংলাদেশ গড়া হবে, যেখানে কোনো দুষ্ট, অভদ্র বা অপরাধী নারীকে বাঁকা চোখে তাকানোর সাহস পাবে না। ধর্ম, বর্ণ কিংবা জাতিগত বিভাজনের মাধ্যমে দেশকে আর টুকরো টুকরো হতে দেওয়া হবে না বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
জনসভা থেকে ভোটারদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, প্রথম ভোট হবে ‘হ্যাঁ’ ভোট, আর দ্বিতীয় ভোট হবে দুর্নীতিমুক্ত ও মানবিক বাংলাদেশ গড়ার প্রতীক—ইনসাফের দাঁড়িপাল্লায়।
এ সময় তিনি রাজশাহী-১ (গোদাগাড়ী-তানোর) আসনে জামায়াত মনোনীত প্রার্থী ও দলের কেন্দ্রীয় নায়েবে আমির অধ্যাপক মুজিবুর রহমানের হাতে আনুষ্ঠানিকভাবে নির্বাচনী প্রতীক দাঁড়িপাল্লা তুলে দেন।
জনসভায় সভাপতিত্ব করেন জেলা জামায়াতের আমির আব্দুল খালেক। এতে গোদাগাড়ী ও তানোর উপজেলার বিপুলসংখ্যক নেতাকর্মী অংশ নেন। নারী কর্মীদের জন্য আলাদা বসার ব্যবস্থাও রাখা হয়।



