এলডিসি থেকে উত্তরণের সুখবর আসছে শিগগির

ঢাকা : কিছুদিন পরেই স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উদ্যাপন করবে বাংলাদেশ। এর মধ্যেই আরেকটি সুখবর আসছে। স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণের ‘যোগ্যতা অর্জনের’ আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি শিগগিরই পেতে যাচ্ছে বাংলাদেশ। এখন শুধু ঘোষণার অপেক্ষা।

গত সোমবার জাতিসংঘের কমিটি ফর ডেভেলপমেন্ট পলিসি বা সিডিপি এলডিসিভুক্ত দেশগুলোর জন্য পর্যালোচনা বৈঠক শুরু করছে। বৈঠকে দ্বিতীয় দফায় এলডিসি থেকে বের হওয়ার প্রয়োজনীয় মানদণ্ড বাংলাদেশ পূরণ করতে পেরেছে কি না, তার আনুষ্ঠানিক মূল্যায়ন করা হবে।

অর্থাৎ এ পরীক্ষায় পাস করলে উত্তরণের পথে আর কোনো বাধা থাকবে না। এখন শুধু প্রস্তুতিপর্ব। এ সময় পার হয়ে ২০২৬ সালে উন্নয়নশীল দেশের মর্যাদা পাবে বাংলাদেশ।

অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) কর্মকর্তাসহ বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, মোটামুটি নিশ্চিত, দ্বিতীয় দফায়ও বাংলাদেশ এলডিসি থেকে উত্তরণের প্রয়োজনীয় সব শর্ত পূরণে সক্ষম হবে। বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, এলডিসি থেকে উত্তরণ বাংলাদেশের উন্নয়নের পথে আরেকটি মাইলফলক হবে। তবে এই উচ্ছ্বাসের পাশাপাশি কিছু উদ্বেগও রয়েছে।

এর কারণ হিসেবে তারা বলেন, উন্নয়নশীল দেশের মর্যাদা পাওয়ার পর বিশ্ব বাণিজ্যে পণ্যের শুল্কমুক্ত সুবিধা, সহজ শর্তে এবং কম সুদে ঋণসহ কিছু সুযোগসুবিধা হারাবে বাংলাদেশ। তাই উত্তরণকালীন প্রস্তুতি বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। টেকসই উত্তরণের জন্য কৌশল ও কর্মসূচি ঠিক করতে হবে বলে মত দেন তারা।

ইআরডির এক কর্মকর্তা জানান, পর্যালোচনা সভা চলবে পাঁচ দিন। এর পরই আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসবে জাতিসংঘ থেকে। কারোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের কারণে নিউইয়র্কে জাতিসংঘের সদর দপ্তরে সরাসরি সভাটি বাতিল করা হয় এবার। ভার্চুয়াল এই সভায় বাংলাদেশসহ বিভিন্ন এলডিসির প্রতিনিধিরাও অংশ নিচ্ছেন।

২০১৮ সালের মার্চে প্রথম দফায় বাংলাদেশ এলডিসি থেকে বের হওয়ার যোগ্যতা অর্জন করে। নিয়ম হচ্ছে, এলডিসি থেকে বের হতে জাতিসংঘের সিডিপির পরপর দুটি ত্রিবার্ষিক পর্যালোচনা সভায় যোগ্যতা অর্জনের স্বীকৃতি পেতে হয়।

স্বীকৃতি পাওয়ার পর প্রস্তুতির জন্য তিন বছর অপেক্ষা করতে হয়। সে অনুযায়ী, ২০২৪ সালে এলডিসি থেকে বের হওয়ার কথা বাংলাদেশের। কিন্তু উত্তরণ-প্রক্রিয়াকে মসৃণ ও টেকসই করা এবং করোনার প্রভাব কাটিয়ে উঠতে বাড়তি দুই বছর সময় চেয়েছে বাংলাদেশ। সে হিসাবে ২০২৬ সালে উত্তরণ ঘটবে, অর্থাৎ ওই বছর উন্নয়নশীল দেশের মর্যাদা পাবে বাংলাদেশ।

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের গবেষণা পরিচালক ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, এলডিসি থেকে বেরিয়ে আসার প্রক্রিয়ায় প্রতিযোগিতায় বড় একটি হাতিয়ার হতে পারে সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই)। এই সুযোগটি হাতছাড়া করা যাবে না।

‘শুল্কমুক্ত সুবিধা উঠে গেলেই যে বাংলাদেশের সক্ষমতা হারিয়ে যাবে, তা ভাবার কোনো কারণ নেই। কারণ অতীতে এ ধরনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে এসেছে বাংলাদেশ,’ মন্তব্য করেন তিনি।

বর্তমানে বাংলাদেশ এলডিসি হিসেবে ইউরোপের বাজারে ‘এভরিথিং বাট আর্মস’ বা ইভা কর্মসূচির আওতায় শুল্কমুক্ত সুবিধা পাচ্ছে। বাংলাদেশ যদি ২০২৬ সালে এলডিসি থেকে বের হয়, তাহলে স্বাভাবিক নিয়মে ২০২৯ সাল পর্যন্ত এই সুবিধা পাওয়া যাবে। তবে এই সুবিধা যাতে আরও কয়েক বছর অব্যাহত থাকে সে লক্ষ্যে আন্তর্জাতিক মহলে তদবির করছে বাংলাদেশ।

জাতিসংঘের সিডিপি তিনটি সূচকের মানের ভিত্তিতে স্বল্পোন্নত দেশ থেকে বের হওয়ার যোগ্যতা মূল্যায়ন করে। সূচকগুলো হচ্ছে মাথাপিছু আয়, মানবসম্পদ ও অর্থনৈতিক ভঙ্গুরতা। ২০১৮ সালে বাংলাদেশ তিনটি সূচকেই প্রয়োজনীয় মান অর্জন করে।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা বলেন, ‘বাংলাদেশ সব শর্ত পূরণ করতে পেরেছে। তার মানে আমাদের অর্থনীতির অবস্থা ভালো। অতি দ্রুত করোনার প্রভাব কাটিয়ে উঠে ঘুরে দাঁড়িয়েছে অর্থনীতি। এসব বিবেচনায় আমরা আশা করছি, এবারও সফল হবে বাংলাদেশ।’

বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) প্রথম সহসভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, কবে নাগাদ বিশ্ব থেকে করোনা বিদায় নেবে, কেউ জানে না। সামনে অনেক চ্যালেঞ্জ। এ চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হলে সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।

এলডিসি থেকে বেরিয়ে আসার সময় আরও দুই বছর চাওয়ার জন্য সরকারকে ধন্যবাদ জানান তিনি। এলডিসি থেকে উত্তরণের বিষয়ে গত ১২ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত সিডিপির এক্সপার্ট গ্রুপের ভার্চুয়াল সভায় বাংলাদেশের শক্তিশালী অবস্থান তুলে ধরা হয়। এতে এলডিসি থেকে বেরিয়ে আসার পরও বিদ্যমান সুযোগ-সুবিধা অব্যাহত রাখার দাবি জানানো হয়। একই সঙ্গে করোনা-পরবর্তী পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের সামনে নতুন করে উঠে আসা চ্যালেঞ্জগুলো তুলে ধরে সরকার।

বর্তমানে এলডিসির সংখ্যা ৪৬। বাংলাদেশ ১৯৭৫ সালে এলডিসি দেশের তালিকাভুক্ত হয়। এ পর্যন্ত ছয়টি দেশ এলডিসি থেকে উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণে সমর্থ হয়েছে। দেশগুলো হলো বোতসোয়ানা, কেপভার্দে, মালদ্বীপ, সামোয়া, ইকুয়েটোরিয়াল, গিনি ও ভানুয়াতু।

Print Friendly, PDF & Email