আমেরিকার ভাইস প্রেসিডেন্টে কমলা দেবী হ্যারিস এর না জানা গল্প

শ্যামলা গোপালন, দক্ষিণ ভারত চেন্নাইয়ের উনিশ বছরের এক তরুণী দিল্লী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গ্র্যাজুয়েশন করে গবেষণা কাজে পারি জমান সুদূর আমেরিকায়। ২৫ বছর বয়সেই ক্যালিফোর্ণিয়া বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি করে স্তনের ক্যান্সার গবেষণায় নিজেকে নিয়োজিত করেন।গবেষণাকালীন সময়েই শ্যামলার সাথে পরিচয় ও প্রণয় হয় জ্যামাইকান এক তরুণ ডোনাল্ড হ্যারিসের সাথে। একই বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির গবেষক, পরে একজন প্রথিতযশা অর্থনিতিবিদ হিসেবে প্রতিষ্ঠা পান ডোনাল্ড। মেধাবী এই মা – বাবার প্রথম সন্তান কমলা দেবী হ্যারিস , যিনি আমেরিকার নব নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের রানিং মেট আর সদ্য নির্বাচিত ভাইস প্রেসিডেন্ট ।

কমলা দেবীর বয়স যখন মাত্র পাঁচ, তখুনি মা আর বাবার সম্পর্কে চিড় ধরে, ছাড়াছাড়ি হয়ে যায়। ইতিমধ্যেই জন্ম নিয়েছে কমলার ছোট বোন মায়া লক্ষ্মী হ্যারিস। মা শ্যামলা গোপালন পড়েন মহা বিপাকে, একদিকে ক্যান্সার গবেষণা আর অন্যদিকে দু মেয়ের প্রতিপালন। এ টানাপোড়ণের মধ্যেও দু মেয়েকে মানুষ করার মহাযুদ্ধে নেমে পড়েন। গবেষণা, সংসারের ব্যয় নির্বাহ, দু সন্তানের দেখভাল সব একসাথে করা এতো সহজ ছিলো না প্রবাসী শ্যামলার। এ মহাযুদ্ধে যে শ্যামলা গোপালন ভালভাবেই উত্তীর্ণ হয়েছেন তার প্রমাণ আজকের আমেরিকার ভাইস প্রেসিডেন্ট কমলা আর সমান মেধাবী বোন মায়া। যিনি একাধারে আইনজ্ঞ, টিভি উপস্থাপক এবং একজন রাজনৈতিক বিশ্লেষক।

মা’ই ছিলো কমলা – মায়া দু বোনের পৃথিবী । মা’র ব্যক্তিত্ব, খাদ্যাভ্যাস, জীবনযাপন সব কিছুর ছাপ প্রচন্ডভাবে রয়েছে দু’ বোনের মধ্যে। স্বাভাবিকভাবেই দক্ষিণ ভারতের জনপ্রিয় খাবার ইডলি, সম্বর, ধোসা হলো কমলা আর মায়ার প্রিয় খাবার। সুযোগ পেলেই দু মেয়েকে নিয়ে শ্যামলা চলে যেতেন চেন্নাই, বাবার বাড়ি, শেকড়ের কাছে। কমলাও কখনোই ভোলেননি তার শেকড়ের কথা। কমলা তার আত্মকথায় লিখেছেন, “আমি শ্যামলা গোপালনের মেয়ে – এই পরিচয়টুকু থেকে বড় কোন পরিচয় আর সম্মান পৃথিবীতে হতে পারে বলে আমি বিশ্বাস করি না।”মা’ র প্রভাব কমলার জীবনে সব থেকে গভীর ঠিকই, কমলা কিন্তু তার দাদু – দিদিমার কথাও কখনো বিস্মৃত হননি। এক সাক্ষাৎকারে একবার নিজেই জানিয়েছিলেন তার খুব ছোটবেলার প্রিয় কিছু স্মৃতি কথা। মাদ্রাজ তখনো চেন্নাই নাম পায়নি, ফি বছরেই শ্যামলা গোপালন মাদ্রাজ আসতেন দু মেয়েকে সঙ্গে করে। কমলার এখনো স্পষ্ট মনে আছে, ছোট্ট কমলা দাদু পিভি গোপালনের হাত ধরে বন্ধুদের সাথে সমুদ্র তীরে হেঁটে বেড়াতেন আর দাদুর কাছে গল্প শুনতেন। ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে তার সক্রিয়তার কথা, ভারতের প্রশাসনের খুবই উঁচু দায়িত্ব পালনের কথা, সততার কথা, দুর্নীতির বিরুদ্ধে তার লড়াইয়ের কথা, ভারতের রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের কথা।

কমলা নিজের আত্মকথায় বলেছেন, দাদুর সাথে সেসব প্রাতঃভ্রমণ থেকে নিজের জীবনের জন্যে অনেক দামি শিক্ষা পেয়েছেন। পাশাপাশি, দিদিমা রাজম গোপালনের ছায়াও কমলার স্বাধীনচেতা চরিত্রের মধ্যে স্পষ্ট। মাত্র বারো বছর বয়সে বাকদত্তা, ষোলয় পৌঁছে বিয়ে হয়ে যাওয়া রাজম। তখনকার অন্যান্য ভারতীয় গৃহিণীর মতো স্রেফ ঘরের মাঝেই আঁটকে রাখেননি নিজেকে । পারিবারিক, সামাজিক অত্যাচারে শিকার হওয়া মেয়েদের জন্যে সরব হয়েছেন বারবার। সে চল্লিশের দশকে রাজম নিজেই ভোক্সওয়াগন চালিয়ে ঘুরে বেড়াতেন চেন্নাই শহরে, নানা সামাজিক কাজে। কুসংস্কার আর সামাজিক রীতিনীতির বিরুদ্ধে গিয়ে নিম্নবিত্ত পরিবারের মেয়েদের শেখাতেন জন্ম নিয়ন্ত্রণের নানা সুবিধার কথা। সামাজিক অনুশাসন অমান্য করে সামাজিক অত্যাচারে নিপীড়িত মেয়েদের সাহায্যে এগিয়ে আসতেন, আশ্রয় দিতেন । কমলা তার আত্মকথায় লিখেছেন, “আমার দাদু তো ঠাট্টা করে বলতেন, দিদিমার এ সামাজিক কাজের ঠেলায় তার ক্যারিয়ারটাই না নষ্ট হয়ে যায়। দিদিমা অবশ্য দাদুর ওসব কথায় পাত্তাই দেননি কোনদিন।”আমেরিকায় যখন সিভিল রাইটস আন্দোলন তুঙ্গে, তখনি কমলা বড় হয়ে উঠেছেন। মা-বাবা ছোট্ট কমলাকে নিয়ে হাঁটতেন মিছিলে, জড়ো হতেন বিভিন্ন জমায়েতে। কমলা তার আত্মজীবনীতে লিখেছেন, একেবারে ছোটবেলার কিছু স্মৃতি তার স্পষ্ট মনে আছে, চারদিকে অসংখ্য পা হেঁটে চলছে সারিবদ্ধ ভাবে; আর সে মিছিল থেকে আর্থ – সামাজিক মুক্তির সব স্লোগান উঠছে। কমলা বড় হয়ে মা শ্যামলা’র মুখে তার ছোটবেলার এক গল্প শুনতেন প্রায়ই, কমলা সবে তখন কথা বলতে শিখছে, মুখে আধো – আধো বুলি ফুটেছে, তখন সে প্রায়ই কান্নাকাটি করতো। মা তাকে কি চাই জিজ্ঞেস করলে, ঠোঁট ফুলিয়ে আধো – আধো গলায় ছোট্ট কমলা বলতো,“ফিডম !!!”

মা দক্ষিণ ভারতীয় আর বাবা জ্যামাইকান ফলে জন্মের পর থেকেই মিশ্র সংস্কৃতির মধ্যে মেলামেশা করার সুযোগ পেয়েছিলো কমলা। এক একান্ত সাক্ষাৎকারে কমলা স্পষ্টতই বলেছেন, “আমার ছোটবেলার সব বন্ধুরাই ছিলো ভারতীয় অথবা কালো। আর আমরা একসাথে জড়ো হলেই নানা ধরণের ভারতীয় খাবার রান্না করতাম।” এমন এক মিশ্র সংস্কৃতিতে বেড়ে ওঠার কারণেই দু’বোন কমলা ও মায়া কখনো ব্ল্যাক ব্যাপ্টিস্ট গির্জায় গিয়ে কয়্যারে গিয়েছে, আবার বাসায় ফিরে এসেই মার হাত ধরে গুটিগুটি পায়ে হাঁটা দিয়েছে কোন হিন্দু মন্দিরের দিকে। এমন নানামুখী সংস্কৃতিতে বেড়ে ওঠার কারণে কমলার অনেক জায়গায় ঘুরে বেড়ানোর সুযোগ হয়েছে। কখনো বাবার সাথে ক্যারাবিয়ান দীপপুঞ্জ, কখনো মায়ের সাথে ভারত। মা শ্যামলা গোপালন গল্পেচ্ছলে এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন,  কমলা তখন সবে ফার্স্ট গ্রেডে পড়ুয়া, তার ক্লাস টিচার শ্যামলাকে ডেকে বলেছেন, আপনার মেয়ের কল্পনাশক্তি দারুণ, ক্লাসে যখনি দূরের কোন দেশের কথা হয় তখন ছোট্ট কমলা মাথা নেড়ে বলতো, “হ্যাঁ, আমি তো ওখানটায় গিয়েছিলাম।” শ্যামলা ক্লাস টিচারকে শুধরে বলতেন, “মেয়ে আমার মনগড়া কিছুই বলেনি, সত্যি সত্যি ওই বয়সেই সে ভারত, দক্ষিণ এশিয়া, ইউরোপ, ক্যারাবিয়ান দীপপুঞ্জ, আফ্রিকার বিভিন্ন দেশ ঘুরে ফেলেছে।”মা’র জীবন সংগ্রাম; দাদুর সততা, দেশপ্রেম ও দায়িত্ববোধ; দিদিমার আধুনিক মনস্কতা, সামাজিক দায়িত্ববোধ ও সমাজ সংস্কারমূলক কাজ কমলা’র জীবনে এতোটাই প্রভাব ফেলেছে যে, তার ভেতরে সামাজ ও দেশের প্রতি দায়িত্ব পালনের ইচ্ছে শিশু বয়সেই গ্রথিত হয়ে যায়। যার প্রতিফলন হয়েছে তার ফেলে আসা জীবনের কাজে। ক্যালিফোর্নিয়া ইউনিভার্সিটি ও হাওয়ার্ড ইউনিভার্সিটি থেকে আইন বিষয়ে উচ্চ শিক্ষিত কমলা ইতিমধ্যেই আমেরিকার আইনসভার প্রভাবশালী সদস্য হিসেবে, ভোক্তা অধিকার, জন নিরাপত্তা, মৃত্যুদণ্ড রহিতকরণ, সমকামী ও লেসবিয়ানদের অধিকার রক্ষা, ধর্ষণ ও বলৎকার রোধ, এ সংক্রান্ত অনেক আইন প্রবর্তনে অবদান রেখেছেন। মা শ্যামলা গোপালনের আদর্শে গড়া কন্যা কমলাকে সারা বিশ্ব আমেরিকার ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে গ্রহণ করতে যাচ্ছে। অনন্ত শুভকামনা কমলা দেবী হ্যারিস !!

Print Friendly, PDF & Email