সবার আগে দরকার সামাজিক প্রতিরোধ

বাণী ইয়াসমিন হাসি

এই সময়ে সবকিছুই বড্ড ক্লাসিফাইড; প্রেম এমনকি প্রতিবাদও। জলি তালুকদার সিপিবির একজন কর্মী ও নেতা। তার নিজের দলের আরেক কমরেড জাহিদ হোসেন খান কর্তৃক এক সমাবেশে নিপীড়নের শিকার হন এবং তা কেন্দ্র অবধি সালিশে গড়ায়। তার সাথে ঘটে যাওয়া অন্যায়ের বিচার না পাওয়ায় নিজের দলের অফিসেই জলি তালুকদার অনশনে বসেন। ঘটনাটি কয়েকদিন আগের।

সামাজিক প্রতিরোধের মাধ্যমেই এই মহামারি থামাতে হবে। মনে রাখতে হবে ধর্ষক কারো স্বজন নয়। তাকে কোনভাবেই নিজেদের লোক বানানো যাবে না। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ছাত্রী কিছুদিন আগে নূরু গং এর বিরুদ্ধে তথ্য প্রমাণসহ ধর্ষণের অভিযোগ করেছে, মামলা করেছে। গ্রেফতারের দাবি জানিয়েছে। সেই বোনটিও নিশ্চয়ই তার লড়াইয়ে আমাদের সবাইকে তার পাশে আশা করেছিলো? গত দুইদিন ধরে দেখছি যারা মেয়ের বয়সী মেয়েদের সাথে অসভ্যতা করে তারাও বেশ সোচ্চার। এতে আমার কোন আপত্তি নেই। আমার আপত্তির জায়গাটা হলো আপনি কত মেয়ের আতঙ্কের কারণ। শুদ্ধি অভিযানটা নিজেকে দিয়েই শুরু করেন। ধর্ষক, ধর্ষণের মদদদাতা এবং আশ্রয় প্রশ্রয়দাতা; সবার বিরুদ্ধেই সোচ্চার হওয়াটা এখন জরুরি।

কয়েকটা প্রশ্ন ; জানি উত্তর মিলবে না!

১. ঘটনাটি ঘটেছে ৪ সেপ্টেম্বর। পুলিশ সুপার একটি বেসরকারি টেলিভিশনকে বললেন এই ঘটনাটি এখলাসপুরের অনেকেই জানে এবং ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শীও আছে। আমার প্রশ্ন হলো সেখানে কি কোন থানা নেই? কি করে এই খবরটা ৩২ দিন চাপা থাকলো! কুলাঙ্গাররা ভিডিও আপলোড না করলে বা  ঘটনাটি সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল না হলে কোথাও কোন আওয়াজ হতো কি?

২. এই বর্বরতার পর দেলোয়ার বাহিনীর নাম সামনে এসেছে। প্রশাসনের নাকের ডগায় এই বাহিনী সক্রিয় হয় কিভাবে? দেলোয়ার বাহিনীর এটা কি প্রথম অপরাধ? কেন প্রশাসন এতদিন এদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়নি? কার আশ্রয় প্রশ্রয়ে এই বাহিনী ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছে?

৩. সংশ্লিষ্ট এলাকার মেম্বার, চেয়ারম্যান, উপজেলা চেয়ারম্যান, এমপি কি ঘটনা জানে না? তারা নীরব কেন? একটা বাহিনী গড়ে উঠলো আর কেউ সেটা জানলো না! এটা তো হতে পারে না। কে বা কারা এদেরকে পেলেপুষে এমন হিংস্র জানোয়ার বানালো?

৪. প্রতিটি এলাকায় এমন দেলোয়ার বাহিনী আছে। তারা প্রভাবশালীদের হাতিয়ার। আমি বিশ্বাস করি প্রশাসন এবং লোকাল প্রভাবশালীদের আশ্রয় প্রশ্রয় ছাড়া কোন ক্রাইম সম্ভব না। দায় এড়ানোর সুযোগ আছে কি?

একজন নারী সে যত প্রতিষ্ঠিত বা ক্ষমতাবানই হোক না কেন দিনশেষে সে কিন্তু ভালনারেবল। জামাই তাকে ইচ্ছেমতন পিটাতে পারে। এমনকি রাস্তার রিকশাওয়ালাও তাকে টিজ করতে পারে। ৬ মাসের মেয়েশিশু থেকে শুরু করে ৭৫ বছরের বৃদ্ধা কেউই তো নিরাপদ নয়। ‌অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ধর্ষণ বা নির্যাতনের কারণ হিসেবে নারীর পোষাককে দায়ী করা হয়। কখনো কখনো বলা হয়ে থাকে, মেয়েটাই প্রভোক করেছিলো। আমার প্রশ্ন হলো এই শিশু বা বৃদ্ধারও কি পোষাকে সমস্যা ছিল? তারাও কি কাউকে প্রভোক করেছিলো!

সমস্যাটা আসলে মাথার এবং মননের। ব্যাপারটা সেল্ফ রেসপেক্টের। একটা মেয়ের ‘না’ মানে কিন্তু না। একজন পুরুষকে পুরুষ হওয়ার আগে মানুষ হতে হবে; একজন মানবিক মানুষ। গতকাল একজন শিশু নির্যাতনকারীর বিরূদ্ধে মুখ খুলেছে তারই এক নিকট আত্মীয়। সেই মেয়েটি শৈশবে তার দ্বারা নির্যাতনের শিকার হয়েছিলো। শুধু মেয়েটি একা নয়; তার সব কাজিনরাই লোকটার দ্বারা নির্যাতিত। মানসিক বিকারগ্রস্ত এই লোকটি একটা নামকরা পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক। একবার ভাবুন তো, ঐ বাচ্চাগুলো কেমন ট্রমার মধ্যে বড় হয়েছে।

আমাদেরই আশেপাশে অনেক সুবেশী পুরুষকে দেখি। এদের কেউ কেউ আবার নারী রিলেটেড যেকোন ইস্যুতে এতটাই সোচ্চার যা নারীবাদীদেরকেও হার মানিয়ে দেয়। কিন্তু বাস্তবতা হলো এরাই ইনবক্সে ইনিয়ে বিনিয়ে এর ওর কাছে প্রেম ভিক্ষা চায়। নিজের অফিস কলিগ এবং অধীনস্তদের জীবন নরক বানিয়ে ফেলে। একটা ধর্ষণকামী মন আর মাথা নিয়ে সারাক্ষণ ঘুরে বেড়ায়।

আবারও বলছি; আইন করে ধর্ষককে শাস্তি দেওয়া যাবে কিন্তু এই পচন থামানো যাবে না। ধর্ষককে কোনভাবেই নিজেদের লোক বানানো যাবে না। ঘরে নিজের শিশুপুত্রকে নারীকে সম্মান করতে শেখান। বাচ্চার সামনে তার মাকে অসম্মান করবেন না। বাচ্চার বেড়ে ওঠার সময়টাতে তাকে বুঝতে শেখান, নারী কোন নিষিদ্ধ বস্তু নয়। নারী পুরুষের সম্পর্কটা স্বাভাবিক এবং প্রাকৃতিক। এগুলো কোন ট্র্যাবু নয়।

আপনার মেয়ে বা বোনকে প্রতিবাদ করতে শেখান। দয়া করে তাকে সবকিছু মেনে নিতে বা মানিয়ে নিতে বাধ্য করবেন না। সমাজ বা আশেপাশের কে কি বললো তারচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ আপনার বোন বা মেয়ের ভালো থাকাটা। সমাজ বা চারপাশ কারো চোখের পানি মুছিয়ে দেয় না; বরং খুঁচিয়ে রক্তাক্তই করে।
সবার আগে দরকার সামাজিক প্রতিরোধ। আর সেটা না হয় শুরু হোক আপনার ঘর থেকেই।

লেখক: সম্পাদক, বিবার্তা২৪ডটনেট।

Print Friendly, PDF & Email