করোনায় স্ত্রীকে হারিয়ে স্বাস্থ্য সচিবের আবেগঘন স্ট্যাটাস

ঢাকা : কি আশ্চর্য যোগসূত্র! ভাবলেই চমকে উঠি। মাত্র সাত দিন আগে আমাদের গ্রামের বাড়ির পারিবারিক কবরস্থানের দেয়ালে হাত রেখে ছোট ছেলে অম্লান আকস্মিক তার মাকে বলে ওঠে, দেখ মামণি! এটাই আমাদের নিজেদের কবরস্থান। আমরা কেউ মারা গেলে এখানেই কবর হবে। মা ছেলেকে হাত ধরে টেনে নিয়ে বলল, এসব নিয়ে এখনই তোমায় ভাবতে হবে না বাবা! তুমি অনেক দিন বেঁচে থাকবে।

ছেলের দ্বিতীয় প্রশ্ন, সবার আগে যে মারা যাবে তার কবরটা কোন দিকটায় হবে মামণি? এবার মা বলল, এখানেই কবর দেওয়া হবে। চল এবার ঘরে যাই।

কবরস্থানের পাশ দিয়েই বাড়ির সবার চলাচলের রাস্তা। এ বাড়ি ও বাড়ি, পুকুরঘাট এবং মসজিদে যাতায়াত। এত দিন হলো কবরস্থান হয়েছে কিন্তু এমন প্রশ্ন কেউ কখনো করেনি। আজ হঠাৎ ছেলের মুখে এমন কথা কেন? মনে মনে ভাবছে মা। পরদিন দুপুরবেলা বড় ছেলে আদিত্য ছোট ছেলে অম্লান ও করোনাভাইরাস সংক্রমণের হালকা উপসর্গ দেখা দেওয়া তাদের মা জেবুকে একই গাড়িতে নিয়ে ঢাকায় রওনা করে।

কত দূরে আছ, আর কতক্ষণ লাগবে পৌঁছাতে, ড্রাইভারকে সাবধানে চালাতে বল, এসব খোঁজ আমি সব সময় নিয়ে থাকি। ওইদিন ঢাকার কাছাকাছি এসে জেবুই আমাকে জানাল, ‘শোনো! আমি কিন্তু বাসায় পৌঁছে আলাদা বিছানায় থাকব। আমার করোনার টেস্ট করাতে হবে। ’ বললাম, ঠিক আছে, সাবধানে এসো। যথারীতি সন্ধ্যায় তারা বাসায় এসে পৌঁছে। আমি আগেই পাশের কক্ষে থাকার ব্যবস্থা করে রাখি। আসলে দুই দিন পর আমি স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সচিব পদে যোগদান করব, আমাকে সুস্থ রাখার নিমিত্তই সে পৃথক রুমে থাকার সিদ্ধান্ত নেয়। বাসায় প্রবেশ করেই জেবু বলল, ‘আমার শরীরটা ভালো নেই, আগামীকাল টেস্ট করাতে হবে। ’ আমাদের মেয়ে ও ছেলে দুজনই ডাক্তার। আমি বললাম, কালই তোমরা সবাই টেস্ট করাবে।

সকালে সবাই টেস্ট করার প্রস্তুতি নিচ্ছে। আমি সব ব্যবস্থা করে দিয়ে অফিসে চলে যাই। তারা যথাসময়ে নমুনা দেয়। এবং রাতেই রেজাল্ট পেয়ে যায়। কামরুননাহার জেবু পজিটিভ। অন্যরা নেগেটিভ। সবার মন খারাপ। ডাক্তার বলেছেন, চিকিৎসা নিলে ভালো হয়ে যাবে। জেবু কিছুটা বিষণ্ন হলেও উদ্বিগ্ন নয়। কারণ বাড়িতে সে দেখে এসেছে তার চেয়ে অনেক বেশি ডায়াবেটিস নিয়েও তার চাচিশাশুড়ি কয়েক দিন আগে করোনায় আক্রান্ত হয়ে সুস্থ হয়ে উঠেছেন।

৯ জুন, ২০২০। জেবুর অসুস্থতা, তার মানসিক অবস্থা, একই বাসায় অথচ অন্য রুমে থাকা সব মিলিয়ে বিনিদ্র রজনি কাটে আমার। সচরাচর এমনটি হয় না। সমস্ত রাত নির্ঘুম কাটিয়ে দেওয়ার এমন নজির আমার প্রথম হতে পারে। সকালে উঠে পাশের কক্ষে উঁকি দিতেই দেখি সে বসে আছে চিন্তিত ও নির্বাক।

আমাকে দেখে বলল, ‘রাতে এক মিনিটও ঘুমাতে পারিনি। শরীর জ্বালাপোড়া করছে।’ বললাম, আমারও ঘুম হয়নি। জেবু কষ্ট নিয়ে অসহায়ের মতো আমার দিকে তাকিয়ে আছে। তাকে ওই দিনই হাসপাতালে ভর্তি হতে বললাম। সে বলল, ‘তুমি যোগদান করে এসো সন্ধ্যার দিকে যাব। ’

আরো বলল, ‘স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব জানলে আমাকে সবাই অনেক বেশি গুরুত্ব দেবে।’আমি নতুন অফিসে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছি। ড্রেস পরে (মাস্ক, গ্লাভসসহ) পাশের কক্ষে জেবুর সামনে দাঁড়িয়ে বিদায় নিতে গেলাম। সে আমাকে আপাদমস্তক দেখল। বলল, ‘সাবধানে থেকো, প্রথম দিন সাংবাদিক ও অন্যান্য মানুষ ভিড় করতে পারে।’

দিনটি ভীষণ ব্যস্ততায় কাটে। চার্জ দেওয়া-নেওয়া, মন্ত্রী মহোদয়ের উপস্থিতিতে সভা, বক্তৃতা, পরিচিতি নানা বিষয়ে আলাপ-আলোচনা, কর্মকর্তাদের সঙ্গে মতবিনিময় ইত্যাদিতে বিকাল গড়িয়ে যায়। তবে ভুলে যাইনি; আমি বাসায় ফিরে গেলে জেবু হাসপাতালে যাবে। সেদিন সূর্যাস্তের আগেই বাসায় ফিরে আসি।

জেবু আমাদের ডাক্তার ছেলে আদিত্যর তত্ত্বাবধানে গত দুই দিন থেকে বাসায় চিকিৎসা নিচ্ছিল। তার অবস্থা বাহ্যিকভাবে কখনো খারাপ দেখাত না। অসামান্য সহিষ্ণু, দৃঢ় মনোবল আর মেধা, মনন এবং উন্নত রুচির অধিকারিণী এই মহীয়সী কোনো দিন কারও মনঃকষ্টের কারণ হয়নি। যেন নীলকণ্ঠ হয়ে সবকিছু অবলীলায় ধারণ করেছে। প্রকাশ করেছে খুবই কম। সন্তানদের শতভাগ দায়িত্ব কাঁধে নিয়ে সংসারের ঘানি টেনেছে নাগাড়ে ৩২ বছর। তার দুঃখ-বেদনার ভাষা মুখশ্রীতে কোনো দিন প্রতিফলিত হতো না। বরং পরিবার বা আত্মীয়স্বজন সবার চাওয়া-পাওয়া, অভিযোগ-অনুযোগের আশ্রয়স্থল ছিল সবার প্রিয়জনেষু জেবু। সিদ্ধান্ত হলো, জেবু মাগরিব পড়ে ধানমন্ডির আনোয়ার খান মডার্ন হাসপাতালে যাবে। সব ঠিক করা আছে। কেবিন রিজার্ভ করা হয়েছে। আমাদের ডাক্তার মেয়ে মৌরিন, আদিত্য এবং অম্লানও মামণির সঙ্গে হাসপাতালে যাবে।

মা করোনায় আক্রান্ত, তবু তাদের তিনজনের মাঝে যেন এক প্রবল প্রতিযোগিতা সবাই মামণির সঙ্গে হাসপাতালে থাকবে। কাজেই তিন সন্তানকে নিয়েই জেবু হাসপাতালে চলে যায়। দুজন সঙ্গে রাতযাপন করে। একজন গভীর রাতে বাসায় ফিরে আসে। সারাক্ষণ খোঁজ রাখা হচ্ছে। আত্মপ্রত্যয়ী, আবেগাপ্লুত ছোট ছেলেটি আমাকে জানায়, ‘বাবা দোয়া কর, মামণি এক সপ্তাহের মধ্যে সুস্থ হয়ে বাসায় ফিরে আসবে। ’ আহা! সন্তানের কি আকুতি, কি নিরন্তর প্রার্থনা!

সেদিন একবুক আশা নিয়ে আমাদের রাত কাটে। সঠিক চিকিৎসা হলে জেবু দ্রুত সুস্থ হয়ে উঠবে। পরদিন আমি অফিসে যাই। বাচ্চারা সবাই তাদের মামণির সঙ্গে হাসপাতালে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রাখছে। তার জন্য বোর্ড গঠিত হয়েছে। সবাই সচেষ্ট, তৎপর ও সতর্ক রয়েছে। লাংয়ের সিটি স্ক্যান রিপোর্ট আসে দুপুরের পর। রিপোর্ট দেখে প্রফেসর হতাশ স্বরে কথা বলেন আমাদের ডাক্তার সন্তানদ্বয়ের কাছে। বিষয়টি আমাকে জানানো হলে সঙ্গে সঙ্গে অফিস ত্যাগ করে সরাসরি হাসপাতালে পৌঁছি।

প্রফেসর সাহেব বললেন, ‘লাং ইনফেকশন অনেক বেশি। ওনার আইসিইউ দরকার হবে। এখানকার সব বেড অকোপাইড। সিএমএইচ বা ডিএমসিএইচ হলে খুব ভালো হবে।’

চার তলার কেবিনে হুইল চেয়ার আকৃতির একটি স্ট্রেচারে বসে আছে জেবু। আমি লিফট থেকে নেমে তার অনেকটা নিকটে যাই। আদিত্য, মৌরিন, অম্লান কাছাকাছি আছে। জেবু আমাকে মাস্ক পরা অবস্থায় দেখল। আমিও তাকে দেখছি, কারও কথা নেই, তাকিয়ে আছি শুধু। সম্ভবত সে নিজেও লাংয়ের রিপোর্টটি সম্পর্কে জেনেছিল। জেবুর সঙ্গে মূলত সেটিই আমার শেষ দেখা। নিচে নেমে আমি মুহূর্তের মধ্যে চিফ অব আর্মি স্টাফের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করি এবং তাকে পেয়েও যাই। কথা হলো। অনেকটা অধিকার নিয়ে, দাবি নিয়ে আমার স্ত্রীর অবস্থার কথা বললাম। তার বদান্যতা ও মানবিকতার কারণে সিএমএইচে পৌঁছতেই সবকিছু রেডিমেড ব্যবস্থা পেয়ে যাই। পরে জেনেছি, আমাদের অভিভাবক মন্ত্রিপরিষদ সচিব মহোদয়ও বলেছেন।

চিফ মহোদয়ের সঙ্গে আমার পূর্বপরিচয় ছিল, কমিশনার, চট্টগ্রাম বিভাগ হিসেবে কাজ করার সময়। তখন ভাবছিলাম, মহান আল্লাহ সহায় আছেন। জেবু এখান থেকে আরোগ্য লাভ করবে। ইমারজেন্সি থেকে খুব তাড়াতাড়ি আইসিইউতে স্থানান্তরিত হয়ে যায়। ইমারজেন্সির সামনে অ্যাম্বুলেন্স থেকে নামানোর মুহূর্তে জেবুকে পুনর্বার আমি এক নজর দেখি, সে-ও যেতে যেতে তাকিয়েছিল। এ পৃথিবীতে তার সঙ্গে সেই আমার শেষ দেখা।

যাক, আদিত্য সার্বক্ষণিক মায়ের সঙ্গেই আছে। ১০ জুন রাতেই সিএমএইচের ট্রমা সেন্টারের আইসিইউতে ভর্তি হয়ে যায়। গভীর রাত অবধি নিচে হাঁটাহাঁটি করি অম্লান, মৌরিন আর আমি। আদিত্য মাকে এক মিনিটের জন্য ছেড়ে যাবে না। এটি তার শপথ। মা-ও তাকে ছাড়া অসহায় বোধ করে। চিকিৎসা শুরু হয়েছে, জানতে পারি এখন বেশ ভালো, রোগী স্টেবল আছে, কথা বলছে। সন্তানদের অনুমতি নিয়ে আমি বাসায় ফিরে আসি। ছোট ছেলে অম্লান রাতভর নিচে গাড়িতে বসে থাকে। মামণির কিছু প্রয়োজন হলে সে দ্রুত দিয়ে আসবে। মেয়ে মৌরিনও জামাই হাসানকে নিয়ে সারা রাত অন্য একটি গাড়িতে অপেক্ষমাণ থাকে।

১১/১২ জুন বেশ আশাবাদী হয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে থাকি। বিদেশি ইনজেকশন, প্লাজমা থেরাপিসহ যখন যা বলা হয়েছে তা-ই সরবরাহের আপ্রাণ চেষ্টা করে যাচ্ছি। এ সময় আমাদের ডাক্তার ছেলে আদিত্যকে বললাম, ‘বাবা! তোমার মামণি তো কভিড-১৯-এ আক্রান্ত। তুমি পিপিই নিয়ে খুব সতর্কতার সঙ্গে সব সময় সামান্য দূরে থেকো। নিজের দিকেও খেয়াল কোরো।’

সেদিন তার মৃত্যুপথযাত্রী মায়ের হাতে হাত রেখে ছেলে উত্তর দিয়েছিল, ‘বাবা! আমাকে এমন কথা বোলো না, আমি মামণির সঙ্গেই মরে যেতে চাই। মামণিই আমাদের সব।’ আমি বাকরুদ্ধ, স্তম্ভিত। অজান্তে অশ্রুসিক্ত হলাম। ভাবছিলাম, আমার ছেলে শৈশবে পাঠ করা বায়েজিদ বোস্তামির গল্পকেও হার মানিয়েছে। জেবু নিজেও তার ভক্ত সুসন্তানদের স্বচক্ষে দেখে গেল। এদিকে জেবুর অবস্থা খানিকটা ওঠানামা করছে।

বাচ্চারা আমাকে সব সময় ভালো খবর দেওয়ার চেষ্টা করে। তারা বাবাকে সান্ত্বনা দিয়ে চলেছে। জানতে পারলাম, আদিত্য বিশ্রামহীন দিন-রাত দাঁড়িয়ে থেকে পা দুটো ফুলিয়ে ফেলেছে। তবু মায়ের চোখের আড়াল হচ্ছে না। মা-ও ছেলেকে না দেখলে অস্থির, অশান্ত হয়ে ওঠে। আমি ছেলের জন্য কাঁদব না স্ত্রীর জন্য- বুঝে উঠতে পারছিলাম না। আমি একুল-ওকুল ভাবনায় আড়ষ্ট হয়ে পড়ি। ১৩ জুন দিনভর সবাই সিএমএইচে। অম্লান নিজে ড্রাইভ করে বাসা থেকে খাবার ও প্রয়োজনীয় জিনিস আনা-নেওয়া করছে। আমি বিভিন্নজনকে ফোন করছি, বোর্ড করার অনুরোধ করছি। হাসান নানা সূত্রে পাওয়া তথ্য থেকে নতুন নতুন ওষুধের ব্যবস্থা করে যাচ্ছে। সন্ধ্যা থেকেই জেবুর অবস্থার অবনতি ঘটতে থাকে। আমাকে ছেলেরা না বললেও হাসপাতালসূত্র থেকে জেনেছি। সিএমএইচের দীর্ঘ সড়ক ধরে আমি পায়চারি করছি। এদিক-ওদিক আকাশের দিকে তাকাই। ওপরে আমার ছেলে এবং অসুস্থ স্ত্রী জীবন-মরণের সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। অস্থির বিচলিত, শ্বাসরুদ্ধকর এমন কয়েক ঘণ্টা দুর্বিষহ অতিক্রম করি। শুনতে পাচ্ছি তার অবস্থা ক্রমেই নেমে যাচ্ছে। আদিত্য নিজেও কান্নায় ভেঙে পড়ছে, মামণি তাকে জড়িয়ে ধরতে বলছে। তার কষ্ট হচ্ছে, অনেক কষ্ট, আদিত্যকে ছাড়তে চাচ্ছে না।

রাত ১২টা ৫ মিনিটে তার নিজের হাতে তৈরি করা ডাক্তার ছেলের বুকেই শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করে জেবু। তার মৃত্যুর সংবাদ শুনে আমি হাসপাতালের নিচে রাস্তায় শুয়ে পড়ি। আমার মাথায় হঠাৎ আকাশ ভেঙে পড়ে। আমার কী হবে, এখন গন্তব্য কোথায়, বাঁচার অবলম্বন কী হবে? কেন আমার জন্য এত কিছু করল সে? মুহূর্তে হাজারো ভাবনা ভিড় করল চারদিক থেকে। আমি অন্ধকার রাতের আকাশের তারার দিকে চোখ মেলে আছি। যেন ৩৪ বছরের বিচিত্র সব স্মৃতি বিস্মৃতির অতীত আমাকে গ্রাস করতে উদ্যত হচ্ছে। আমি রাস্তায় পড়ে আছি। একটু পরে আদিত্যসহ বাচ্চারাও এসে আমার পাশে দাঁড়িয়ে চিৎকার করে কাঁদছে।

হাসান আর জেবুর ছোট ভাই সোহেল লাশটি মারকাজুল ইসলামের মাধ্যমে গ্রহণ করে গ্রামে নেওয়ার যাবতীয় ব্যবস্থা নেয়। তখন রাত শেষ হয়ে এসেছে প্রায়। জেবুর শবযাত্রা হবে। মাত্র সাত দিন আগে তার প্রিয় বাড়িঘর, পুকুর, বিল -ঝিল, ধান-পাট, গরুবাছুর আর অগণিত সাধারণ মানুষের বুকভরা ভালোবাসার গ্রাম থেকে সে ঢাকায় আসে। সেই মায়াবী গ্রামেই আজ কফিন-ভর্তি লাশের গাড়িতে তার প্রত্যাবর্তন। ভাবছিলাম, আমরা সবাই যাচ্ছি জেবুকে নিয়ে। একই পথ, একই মহাসড়ক, চারপাশ, সবুজ প্রকৃতি, বৃক্ষের সারি সূর্যোদয়, মানুষের কোলাহল, কলরব, যান্ত্রিক জীবনের একদিন প্রতিদিন। শুধু জেবু প্রাণহীন নিথর লাশ।

বিগত তিন দশকে কত শতবার এ পথে তাকে নিয়ে গাড়িতে গান শুনে শুনে গ্রামের বাড়ি গিয়েছি। আজ আমি হতভম্ব, বিস্মিত ও বুকভাঙা ব্যথায় বেদনার্ত। আমি যেন আমারই চিরচেনা, চিরআপন মা ও মানুষের এ পৃথিবীকে দেখেও বুঝে উঠতে পারিনি। আমার প্রতি তার এ নিষ্ঠুরতম আচরণ আমাকে ছন্দহীন, গন্ধহীন, প্রাণহীন রঙিন ফুলের মূল্যহীন অলঙ্কারে পরিণত করেছে।

সেদিন বাড়িতে পৌঁছে জানাজা এবং সামাজিকতা শেষে আমাদের পারিবারিক কবরস্থানের ঠিক সেই জায়গায় তাকে সমাধিস্থ করা হলো; যেখানের দেয়ালে হাত রেখে ছেলে অম্লান বলেছিল, মামণি দেখ! এখানেই আমাদের সবার কবর হবে। জেবু তখন ছেলের হাত ধরে টেনে নিয়ে বলেছিল, ‘এসব নিয়ে এখনই তোমায় ভাবতে হবে না বাবা! তুমি অনেক দিন বেঁচে থাকবে।’

Print Friendly, PDF & Email