বই পড়া, না পড়া

ফরিদ কবির

‘রবীন্দ্রনাথ ও জীবনানন্দ দাশ আমি পড়িনি’- এমন কথা কোনো লেখক বা কবি বললে লোকে তাকে ঠিক মূর্খ বলবে। কিন্তু রবীন্দ্রনাথ বা জীবনানন্দ দাশ আদ্যপান্ত আসলে ক’জন পড়েছেন?

জীবনানন্দ দাশের প্রকাশিত ও অপ্রকাশিত আশির ভাগ কবিতা এবং প্রায় সবগুলো প্রবন্ধ পড়লেও তার অন্য রচনা, মানে কথাসাহিত্য তেমন পড়িনি। তার একটি উপন্যাস ‘মাল্যবান’ ও কয়েকটি গল্পই কেবল পড়েছি।
রবীন্দ্রনাথের বেশির ভাগ কবিতার বই, উপন্যাস, ছোটগল্প ও স্মৃতিকথন পড়লেও তার অন্য রচনাগুলো আমার তেমন পড়া হয়নি। রবীন্দ্রনাথের রচনাভাণ্ডার সুবিশাল, সব রচনা পড়া একটু কঠিনই। সে অর্থে হয়তো ৬০ ভাগ রচনা আমি পড়ে উঠতে পেরেছি। চর্যাপদ, মধ্যযুগের কবিতা ও মধুসূদনও আমার মোটামুটি পড়া।

আমি নিশ্চিত বাংলাদেশের লেখক-কবিদের বেশিরভাগই আমার মতোই রবীন্দ্রনাথ ও জীবনানন্দের সকল রচনা পড়েননি।
বাংলা সাহিত্যের, বিশেষ করে কবিতার পরম্পরাটা বেশ দীর্ঘ! এবং কিছুটা দু’ভাগে বিভক্তই। পশ্চিমবঙ্গের কবিরা সুধীন্দ্রনাথ দত্ত, বিষ্ণু দে, অমিয় চক্রবর্তী, বুদ্ধদেব বসু, প্রেমেন্দ্র মিত্র, অরুণ মিত্র, সুভাষ মুখোপাধ্যায়, শক্তি চট্টোপাধ্যায়, শঙ্খ ঘোষ, অলোকরঞ্জন দাশগুপ্ত, উৎপল কুমার বসু, বিনয় মজুমদার পড়লেও বাংলাদেশের শামসুর রাহমান, আল মাহমুদ, সৈয়দ শামসুল হক, শহীদ কাদরী, আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ, আজীজুল হক, সিকদার আমিনুল হক, আবদুল মান্নান সৈয়দ ও ফরহাদ মজহার তেমন পড়েননি।
বাংলাদেশের কবিরাও জীবনানন্দ দাশ ছাড়া তিরিশের বাকি কবিদের রচনা কতোটা পড়েছেন আমি জানি না।
কবিদের মধ্যেই এমন অনেকে আছেন যারা বাংলাভাষার উল্লেখযোগ্য লেখকদের উপন্যাস ও ছোটগল্প তেমন পড়েননি।
বিভূতিভূষণ, মানিক, অমিয়ভূষণ, তারাশঙ্কর হয়তো কারো কারো পড়া। কিন্তু শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়, সমরেশ বসু, দেবেশ রায়, বিমল কর, অতীন, শীর্ষেন্দু ও কমলকুমার? বাংলাদেশের কজন তাদের পড়েছেন?

একইভাবে পশ্চিমবঙ্গের লেখকদের মধ্যে কজন সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ, শওকত ওসমান, আবু ইসহাক, শওকত আলী, আখতারুজ্জামান ইলিয়াস, সৈয়দ শামসুল হক, রশীদ করীম ও মাহমুদুল হক পড়েছেন?
হুমায়ূন আহমেদ, সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম, বুলবুল চৌধুরী, কায়েস আহমেদ, মঈনুল আহসান সাবের, শহীদুল জহির- এঁদের কথা নাইবা বললাম।
ওপরে যাদের নাম উল্লেখ করলাম, তাদের দু’-চারটি করে বই আমি পড়েছি। আমার পড়া হয়েছে, কারণ বই পড়াটাই আমার নেশা। নেশা হওয়ার কারণে, এবং কিছুটা দরিদ্র হওয়ার কারণে হাতের কাছে যা পেয়েছি, তাই পড়েছি। ভালো যে কটি বই পড়েছি, সেগুলো পড়া হয়েছে আমার লেখক বন্ধুদের পরামর্শে।
বছর দশেক আগে পশ্চিমবঙ্গের কথাসাহিত্যিক আবুল বাশারের সঙ্গে একবার আমার তর্ক বেঁধেছিলো।
তিনি বলেছিলেন, সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহর ‘লাল শালু’ তিনি পড়েছেন। হাসান আজীজুল হকের ‘আত্মজা ও একটি করবীগাছ’ও। বাংলাদেশের কথাসাহিত্য সে অর্থে তিনি পড়েননি।
তিনি জিজ্ঞেস করেছিলেন, বাংলাদেশে আর কোনো কথাসাহিত্যিক কি আছেন, যাদের নাম করা যায়?
আমি পাল্টা জানতে চেয়েছিলাম, আপনি আর কার কার নাম জানেন?
তিনি ঠোঁট উল্টে বলেছিলেন, এর বাইরে উল্লেখযোগ্য কোনো লেখক থাকলে তো আমার জানা থাকার কথা!
আমি বললাম, আপনার ধারণা এ দু’জন ছাড়া বাংলাদেশে আর কোনো লেখক নেই?
তিনি শূন্য দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকালেন। বললেন, হুমায়ূন আহমেদের একটা বই আমি পড়েছি। ইলিয়াস অবশ্য আমার এখনো পড়া হয়নি।
আমি বললাম, ধরেন একজন কথাসাহিত্যিক মানিক, বিভূতি, অমিয়ভূষণ ও তারাশঙ্কর পড়েননি, তার সম্পর্কে আপনার কী ধারণা হবে?
তিনি হেসে বললেন, এঁদের বই না পড়ে লেখক হবে কীভাবে?
আমি বললাম, শ্যামল, সমরেশ বসু, শীর্ষেন্দু, দেবেশ রায়? বিমল কর?
তিনি বললেন, এঁদেরও পড়া উচিত।
আমি বললাম, আমিও তাই মনে করি। সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ, সৈয়দ শামসুল হক, শওকত ওসমান, শওকত আলী, আখতারুজ্জামান ইলিয়াস না পড়ে কেউ লেখক হবেন কী করে? পড়তে হবে রশীদ করীম, রিজিয়া রহমান, সৈয়দ মনজুরুল ইসলামও।
আবুল বাশার চুপ করে গেলেন। মনে হচ্ছিলো, আমার এ কথায় তার তেমন সায় নেই।
আমি বললাম, লেখক কিন্তু দু’ভাবেই হওয়া সম্ভব। আমরা যাদের নাম নিলাম তাদেরকে পড়েও। কাউকে, এমনকি রবীন্দ্রনাথকে না পড়েও।
আবুল বাশার মাথা নাড়লেন। মনে হলো, এবার আমার কথাটা তার পছন্দ হয়েছে।
কথাটা হুট করে বললেও আমার মনে হয়, কথাটা আমি ঠিকই বলেছিলাম। কেউ লেখক বা কবি হতে পারেন বাংলাভাষার সকল গুরুত্বপূর্ণ লেখক বা কবিদের বই পড়েও।
আবার কাউকে একেবারে না পড়েও।
অবশ্য আমার ধারণা, ভালো কিছু লিখতে গেলে আগে ভালো পাঠক হওয়া খুব দরকার। ভালো পাঠক হলেই যে কেউ ভালো লিখবেন, তার নিশ্চয়তা নেই। কিন্তু ভালো পাঠক না হলে যে ভালো লেখক হওয়া যায় না, এটা একেবারেই নিশ্চিত।
কাউকে পড়লে ভালো করে পড়াই ভালো। কেবল ‘সোনার তরী’ কিংবা ‘পুনশ্চ’ পড়লে যেমন রবীন্দ্রনাথকে জানা হয় না, তেমনি কেবল ‘বনলতা সেন’ কিংবা কেবল ‘রূপসী বাংলা’ পড়লেও জীবনানন্দ দাশকে জানা হয় না।
একজন লেখক বা কবিকে জানতে ও বুঝতে হলে তার অন্তত ৫০% রচনা পড়া দরকার। কোনো কবিকে বুঝতে হলে বই ধরে ধরে পড়াই ভালো। নইলে একজন কবির বেড়ে ওঠা বা বদলে যাওয়াটা বোঝা মুশকিল। খাবলা-খাবলা এখান-সেখান থেকে তার কবিতা বিচ্ছিন্নভাবে পড়লে কাউকেই ঠিক বোঝা যায় না।
আমার অবশ্য কৌতূহল একটু বেশি। যখন কোনো কবি বা লেখক সম্পর্কে আগ্রহ জাগে আমি পরপর তার কয়েকটা বই পড়ে ফেলি। যেমন,  জয়, মৃদুল বা রণজিৎ দাশের প্রায় সব বই আমার পড়া। যেমন, আমার ঘনিষ্ট কবিবন্ধুদের, বিশেষ করে সিদ্ধার্থ হক, তুষার দাশ, আবু হাসান শাহরিয়ার, মাসুদ খান, সুব্রত অগাস্টিন গোমেজ, সৈয়দ তারিক, দারা মাহমুদ, জুয়েল মাজহারের সব বই আমার পড়া। আবার উল্টোদিকে, অলোকরঞ্জন দাশগুপ্ত বা হুমায়ুন আজাদের প্রথম দুটি বই পড়লেও তাদের বাকি কবিতা পড়েছি বিছিন্নভাবে।
কবিতা কিছুটা বাছবিচার করে পড়লেও গল্প-উপন্যাস আমি কিছুটা বাছবিচার ছাড়াই পড়ি। পশ্চিমবঙ্গের অমর মিত্র, আবুল বাশার, অনিল ঘড়াই, প্রবুদ্ধ মিত্র, তমাল রায় যেমন পড়েছি, তেমনি বাংলাদেশের ওয়াসি আহমেদ, ইমদাদুল হক মিলন, নাসরীন জাহান, মঞ্জু সরকার, আতা সরকার, শাহাদুজ্জামান, শাহীন আক্তার, বিশ্বজিৎ চৌধুরী, আহমাদ মোস্তফা কামাল, পাপড়ি রহমান, মশিউল আলম, আনিসুল হক, ইরাজ আহমেদ, মাশরুর আরেফিন, অদিতি ফাল্গুনী, মোজাফ্ফর হোসেন, প্রশান্ত মৃধা, স্বকৃত নোমান, খালিদ মারুফ, সাগুফতা শারমীন তানিয়া ও মোস্তাক শরীফও আমি পড়েছি। মিলন ও নাসরীনের বই ৭-৮টি করে পড়লেও তানিয়া ও মোস্তাক শরীফের হয়তো একটি করে। তাদের কারোর নাম ধরে আপনি যদি প্রশ্ন তোলেন, এটা আবার কে?
তাহলে কঠিন জবার শুনতে হবে আপনাকে। আমার প্রশ্ন হবে, আপনি কে? আপনি এমন কী লিখে ফেলেছেন?

এদের লেখা আপনি পড়বেন কি পড়বেন না, সে আপনার ইচ্ছে। আমি নির্বিচার পড়ি, আপনি হয়তো বাছবিচার করে। তা পড়ুন। তবে, প্রকাশ্যে ‘আমি অনেক পড়েছি’ বলার মধ্যে যেমন বাহাদুরি নেই, ‘আমি পড়িনি’ বলার মধ্যেও কোনো বাহাদুরি নেই। ‘পড়িনি’ বলার মধ্যে কেবল মূর্খতাই প্রকাশ পায়। কিন্তু কবি-লেখকদের মধ্যে অনেকেই বেশ অহংকারের সঙ্গেই বলেন, অমুকের লেখা আমি পড়িনি। ভাবটা এমন, ও এমনকি লেখক?
যাদের লেখা পড়িনি বা কখনোই আর পড়বো না- সেটা আমি আর যাই হোক প্রকাশ্যে বলতে যাবো না।

(ফেসবুক থেকে সংগৃহীত)

Print Friendly, PDF & Email