ব্যক্তিকে খুন করা যায়, আদর্শকে নয়

আনিসুর রহমান মিঠু

প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে বঙ্গবন্ধুর আদর্শ প্রজ্বলিত রাখতে, সাংগঠনিকভাবে আওয়ামী লীগকে দলের সকল পর্যায়ের প্রতি আরও অনেক বেশি যত্নবান হওয়া উচিত।

পাকিস্তানিরা বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করেনি, কারণ বঙ্গবন্ধু পূর্বপাকিস্তানের মানুষের মধ্যে একটি আদর্শ হয়ে ছড়িয়ে পড়েছিলেন। সাত কোটি মানুষই তখন শেখ মুজিবুর রহমান।

একাত্তরের পঁচিশে মার্চ রাতে বঙ্গবন্ধুকে গ্রেফতার না করে হত্যা করলেও যুদ্ধ বন্ধ হতো না। ৭ই মার্চেই বঙ্গবন্ধু সেভাবেই সমগ্র জাতিকে প্রস্তুত করে ফেলেছিলেন।

পাকিস্তানিরা তাই সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছে, বঙ্গবন্ধু আপোষহীনতা, নৈতিকতা, মাথা উঁচু রেখে মর্যাদার সাথে পথচলার, নির্যাতিত নিপীড়িত বঞ্চিত মানুষের ন্যায্য অধিকার আদায়ের সংগ্রামের আদর্শ এবং স্বাধীনতার স্বপ্নকে হত্যা করতে।

তারা লোভ দেখিয়ে, ফাঁসির ভয় দেখিয়ে চেষ্টা করেছিল, পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীর চেয়ারে বসিয়ে মুক্তিযুদ্ধ বন্ধ করে, স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে এনে, বঙ্গবন্ধুর প্রতি মানুষে বিশ্বাস, ভালোবাসা এবং প্রত্যাশাকে নষ্ট করতে ।

আপোষহীন বঙ্গবন্ধু পাকিস্তানের তথাকথিত বিচারালয়ে প্রকাশ্যে বলেছিলেন, আমি বাঙ্গালি, আমি মুসলমান। মুসলমান একবার মরে , বারবার মরে না। আমাকে হত্যা করা হলে, আমার লাশ যেনো বাংলার মাটিতে পৌঁছে দেয়া হয়।

লোভী রাজনৈতিকদের মতো ক্ষমতার চিন্তা করলে, আইয়ুব-ইয়াহিয়ার প্রিয় পাত্র তিনি অবশ্যই হতে পারতেন এবং আজীবন মন্ত্রিত্বে থাকতে পারতেন।

যুক্তফ্রন্টের মন্ত্রিসভা থেকে তিনি স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করে, দলীয় দায়িত্ব পালনে যত্নবান হয়েছিলেন।

বঙ্গবন্ধুর নির্লোভ এবং প্রতিবাদী চরিত্রের ছাপ পড়েছিল তাঁর সকল কর্মীদের চরিত্রে। তাঁর কর্মীরা দেশের জন্য, নিজের জীবনকে তুচ্ছ করতে শিখেছিলেন।

তাই তিনি গর্বভরে বলতে পেরেছিলেন, ‘তোমরা যখন মরতে শিখেছ, কেউ তোমাদের দাবায়ে রাখতে পারবে না ‘।

বঙ্গবন্ধু হত্যা করে, তাঁর সকল নিকটাত্মীয়দের হত্যা করে, চার প্রধান অনুসারীকে কারাভ্যন্তরে হত্যা করে, তাঁর বহু কর্মীকে হত্যা করে, গুম করে, জেলে রেখে এবং তার তৈরি করা অনেক নেতাকে আদর্শচ্যুত করেও, তাঁর আদর্শকে দাবায়ে রাখা যায়নি ।

বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করার পর, রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় গুজব ছড়িয়ে, অপপ্রচার চালিয়ে, রেডিও , টিভি, পত্রপত্রিকায় তাঁকে নিষিদ্ধ করেও দাবিয়ে রাখা যায়নি। কারণ আদর্শের মৃত্যু হয় না যদি একটা সুশৃঙ্খল সংগঠন থাকে ।

শেরেবাংলা একে ফজলুল হক, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, মাওলানা ভাসানীসহ বহু বিখ্যাত নেতার ইতিহাস হারিয়ে গেছে, সুশৃঙ্খল ও শক্তিশালী সংগঠনের অভাবে।

বঙ্গবন্ধু তাঁর রাজনৈতিক জীবনে তাই সব চাইতে বেশি গুরুত্ব দিয়েছিলেন সংগঠন গড়ে তোলার প্রতি। তিনি বিভিন্ন গ্রামে, পথে প্রান্তরে হেঁটেছেন। বিভিন্ন শ্রেণি পেশার মানুষের সাথে মিশেছেন। বহু কর্মীর বাড়িতে খেয়েছেন, ঘুমিয়েছেন।

সংগঠন গড়ে তোলার ক্ষেত্রে খাঁটি হিরাগুলো বেছে বেছে তুলে আনার চেষ্টা করেছেন। তিনি কোথাও কোন বিশাল আকৃতির কমিটি করেননি। কারণ কমিটির আকার বড় হলে, কমিটির সদস্যদের গুরুত্ব কমবেই। সংগঠনের কোন পর্যায়েই গঠনতন্ত্রের কোন ধারার লঙ্ঘন তিনি কখনো হতে দেননি ।

তিনি ছাত্রদের হৃদয়ে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে প্রগতির মশাল জ্বেলে যাওয়ার জন্য ছাত্রলীগ জন্ম দিয়েছিলেন।

তিনি সোনার মানুষ গড়ে তুলে, তাদের হাতে নেতৃত্ব দিয়ে সোনার বাংলা গড়তে যুবলীগ গড়ে তুলেছিলেন।

সুবিধাবাদী, লুটেরা, আদর্শহীন মানুষের জায়গা হওয়ার কথা ছিল না তাঁর আদর্শে গড়া সংগঠনের কোন স্তরে।

দলের সবচাইতে সুদিনে, দেশব্যাপী আদর্শবাদী রাজনৈতিক কর্মী তৈরি হওয়ার কথা ছিল ঝাঁকে ঝাঁকে। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রেই হয়েছে উল্টো!

সাড়ে তিনশ লোক মানে একটা বিশাল জনসমষ্টি, এতোগুলো লোক দিয়ে ছাত্রলীগ বানানোর চিন্তা কার মাথা থেকে প্রথম এসেছিল, সে তদন্তে না গিয়ে, এটার আকার দ্রুত ছোট করা উচিত।

৭১ এর চেতনাকে সমুন্নত রাখার শ্লোগানকে সামনে আনার উদ্দেশ্য নিয়ে, প্রতিটি অঙ্গ সংগঠনের সদস্য সংখ্যা ৭১এ সীমিত রাখা উচিত।

বিচ্ছিন্নভাবে আদর্শ লালন করা কঠিন। সংগঠনই পারে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে আদর্শকে চলমান রাখতে।

রাজনৈতিক কর্মীর কাজ ধান্দাবাজ দিয়ে হয় না। টাকা দিয়ে আদর্শবাদী কর্মী বানানো যায় না। প্রকৃত রাজনেতিক কর্মী তৈরী করতে হলে অবশ্যই সংগঠনের প্রতি যত্নবান হতে হবে।

আদর্শের অনুশীলন ও চর্চা এবং তথ্য ও তাত্ত্বিক জ্ঞান শূন্য মানুষ কোনভাবেই আদর্শবাদী মানুষ নয়, ওরা মাংসবাদী। ওদেরই এখন জয়জয়কার!

গত ১০/১২ বছরে বিভিন্ন মত ও চিন্তার মানুষ বিভিন্ন কারণে আশ্রয় নিয়েছে আওয়ামী লীগের বিভিন্ন অঙ্গ সংগঠনে। তাদের এখন আশ্রিত মনে হয় না, তারা পুনর্বাসিত।

অনুপ্রবেশকারী পুনর্বাসিত নেতা কর্মীরা এখন নীতিনির্ধারকের মতো মতপ্রকাশ শুরু করেছেন। তারা আওয়ামী লীগের ধর্মনিরপেক্ষ চেতনারও বিরোধিতা শুরু করেছে!

আওয়ামী লীগের আচরণ এবং চেহারায়ও এক ধরনের ছাপ ছিল, যা দেখলেই তাদের আলাদাভাবে চেনা যেতো।

বর্তমানে অনেক উচ্চপদের লোকের চেহারা খুব ভালোভাবে লক্ষ করে দেখে আমার কাছে কোনোভাবেই তাদের আওয়ামী লীগ মনে হয়নি! প্রগতিশীলতা ও প্রতিক্রিয়াশীলতার বিভক্তি রেখা অস্পষ্ট হয়ে যাচ্ছে। আমরা কবে সচেতন হবো?

লেখক: যুব ও ক্রীড়া বিষয়ক সম্পাদক, কুমিল্লা মহানগর আওয়ামী লীগ

Print Friendly, PDF & Email