সেলুলয়েডে জাতীয় শোককাব্য

১৫ আগস্ট ১৯৭৫—বাংলাদেশের ইতিহাসের কলঙ্কিত দিন। এই দিনে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যা করে একদল ঘাতক। ঘটনার ৪৫ বছর পর অবশেষে সেই দিনের ঘটনাপ্রবাহ নিয়ে নির্মিত হয়েছে পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র—সেলিম খানের ‘আগস্ট ১৯৭৫’। শোকের এ মাসেই ছবিটি মুক্তি পাওয়ার কথা।

বিস্তারিত লিখেছেন মীর রাকিব হাসান

বিনোদনমূলক ছবির প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান শাপলা মিডিয়া। এই প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে পরিচালক শামীম আহমেদ রনীর প্রথম ছবি ‘শাহেনশাহ’। বছর দুই আগের কথা। ‘শাহেনশাহ’র শুটিং চলছে। রনীকে ডেকে প্রযোজক সেলিম খান বললেন, ১৫ আগস্টের অনেক গল্পই সাধারণ মানুষ জানে না। এর পরের দিন কী ঘটেছিল? বঙ্গবন্ধুর দাফন কিভাবে হয়েছিল? আমরা কি ১৫ আগস্ট নিয়ে কিছু একটা করতে পারি না? রনী এককথায় রাজি হয়ে গেলেন। প্রযোজকের উৎসাহে দলবল নিয়ে গবেষণায় নেমে পড়লেন। শামীম আহমেদ রনী এই ছবির উপদেষ্টা পরিচালক, গল্প এবং চিত্রনাট্যও তাঁর। প্রযোজনার পাশাপাশি পরিচালনা করেছেন সেলিম খান।

রনী বলেন, ‘বঙ্গবন্ধুর মরদেহ ১৫ আগস্ট সারা দিন পড়েছিল ধানমণ্ডির ৩২ নম্বরের বাড়িতে। ১৬ আগস্ট তাঁর দাফনের ব্যবস্থা করা হয়। সেদিনের ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট যাঁরা বেঁচে আছেন তাঁদের প্রত্যেককে আমরা খোঁজার চেষ্টা করি। কে এম সফিউল্লাহ থেকে শুরু করে লাশ দাফনে যাঁরা যুক্ত ছিলেন, সবার সঙ্গে কথা বলেছি। প্রায় দেড় বছর গবেষণার পর আমরা চিত্রনাট্য তৈরি করি। গবেষণা করতে গিয়ে এমন অনেক তথ্যই পেয়েছি, যা এই প্রজন্মের অনেকেই জানে না।’

রনীর কথার রেশ ধরে সেলিম বলেন, “আপনি অন্য কোনো মতাদর্শের রাজনৈতিক দলের সমর্থক হতেই পারেন। কিন্তু ‘বঙ্গবন্ধু’ তো দল-মতের ঊর্ধ্বে। তাঁর জানাজায় কেন মাত্র ২০-২৫ জন লোক হয়েছিল! অনেকে অনুমান করে বলেন, ভয়ে। সেদিন ঢাকার আশপাশের ১৯ জেলা কারফিউ দিয়ে ব্লক করে রাখা হয়েছিল। মানুষ কিভাবে আসবে? ওরা মুসলমান হয়েও কফিনসহ বঙ্গবন্ধুর মরদেহ কবর দিতে চেয়েছিল। মৌলভী হালিম, কনস্টেবল সিরাজ সেখানে কিভাবে ছিলেন? মেজর হায়দারের দায়িত্ব ছিল টুঙ্গিপাড়ায় নিয়ে লাশ দাফন করা। কোন পরিস্থিতিতে লাশ দাফন করা হয়েছিল? এসব তথ্য আওয়ামী লীগের এ প্রজন্মের অনেক নেতাকর্মীও জানেন না। সবাইকে সত্যিটা জানানোর জন্যই আমাদের এই ছবি।”

ছবিতে বঙ্গবন্ধু ও তাঁর পরিবারের কোনো চরিত্র থাকছে না। জাতীয় চার নেতা, খন্দকার মোশতাক, মেজর ডালিম, খালেদ মোশাররফ, জিয়াউর রহমান, বেবী মওদুদসহ ঐতিহাসিক অনেক চরিত্রই আছে। চরিত্রগুলোতে অভিনয় করেছেন এই সময়ের অভিজ্ঞ অভিনেতারা। অন্যতম প্রধান চরিত্র খন্দকার মোশতাক হয়েছেন শহীদুজ্জামান সেলিম। ইতিহাসের ঘৃণিত এই চরিত্র কিভাবে নিজের মধ্যে ধারণ করেছেন?

অভিনেতা সেলিম বলেন, “অভিনেতা হিসেবে চরিত্রটাকে আমি ঘৃণা করতে পারিনি, ভালোবাসতে হয়েছে। ঘৃণা করতে পারিনি এটা আমার জন্য কষ্টেরই। চরিত্রটা রপ্ত করতে বেশ কিছু বিষয় অনুশীলন করতে হয়েছে। সে কিভাবে হাঁটত, কিভাবে কথা বলত। খন্দকার মোশতাক কখনো ‘ছ’ উচ্চারণ করতে পারত না, ‘চ’ বলত। এটা কিন্তু রপ্ত করতে হয়েছে। এমন আরো বেশ কিছু বিষয় আছে।”

তৌকীর আহমেদকে দেখা যাবে তাজউদ্দীন আহমদের চরিত্রে। শ্যাম বেনেগালের পরিচালনায় বঙ্গবন্ধুর বায়োপিকেও এই চরিত্র করার কথা অভিনেতার। তৌকীর বলেন, ‘তাজউদ্দীন সাহেবের চরিত্রে সবাই কেন যেন আমাকেই ভাবেন। হয়তো মহান এই মানুষটার সঙ্গে আমার কিছু মিল পান। বঙ্গবন্ধুর অন্যতম ঘনিষ্ঠ মানুষটার অনুভূতি ১৫ আগস্টে কী হতে পারে, সেটা তুলে ধরেছি। বেদনার চরিত্র, একটা মানুষের সব হারানো চরিত্র।’

কনস্টেবল সিরাজের চরিত্রের অভিনেতা আনিসুর রহমান মিলন বললেন শুটিংয়ের অভিজ্ঞতা, ‘থমথমে একটা পরিস্থিতিতে শুটিং হয়েছে। প্রত্যেক অভিনয়শিল্পীই ছিলেন সিরিয়াস, সত্যিই অবাক করার মতো। অনেক সময় ক্যামেরার বাইরে বসেও আমরা কান্না ধরে রাখতে পারিনি। আবেগতাড়িত হয়ে চিত্রগ্রাহকও দৃশ্যধারণ করতে পারছিলেন না। গুণী অনেক শিল্পী অভিনয় করেছেন এখানে। আবেগী দৃশ্য তাঁরা কম করেননি জীবনে, কিন্তু এই চরিত্রগুলো করতে গিয়ে অনেকের শরীরের লোম দাঁড়িয়ে গেছে। অনেকেই বলেছেন, আমরা বঙ্গবন্ধুকে সম্মান করি, ইতিহাসের অনেক কিছুই জানি; কিন্তু এত খুঁটিনাটি তথ্য আমরাও জানতাম না।’

বেবী মওদুদের চরিত্রে আছেন ‘আয়নাবাজি’খ্যাত মাসুমা রহমান নাবিলা। কিছু ভিডিও ক্লিপ দেখে তাঁর কথা বলার ধরন, বাচনভঙ্গি রপ্ত করার চেষ্টা করেছেন নাবিলা। কাহিনির প্রেক্ষাপট নিয়ে পড়াশোনাও করেছেন। ‘শুটিংয়ের আগে দুই দিন একটা ঘোরের মধ্যে ছিলাম। ১৫ আগস্টের সেই গুলির আওয়াজ কিন্তু বেবী মওদুদও শুনতে পেয়েছিলেন। তাঁর বাসাও ছিল ৩২ নম্বরের কাছেই’—বললেন নাবিলা।

উপদেষ্টা পরিচালক রনী বলেন, ‘চরিত্র নির্বাচনে প্রথমে আমরা খুঁজেছি লুক অ্যালাইক। একই সঙ্গে চেয়েছি দক্ষ অভিনয়শিল্পী। কারণ একটা দুর্বল চরিত্র পুরো ছবির আমেজ নষ্ট করে দিতে পারে।’

শহীদুজ্জামান সেলিম, তৌকীর, মিলন, নাবিলা ছাড়াও ছবিতে আছেন তানভীন সুইটি, শাহেদ আলী, তাসকিন রহমান, মাজনুন মীজান, জয়ন্ত চট্টোপাধ্যায়, দিলারা জামান, ফজলুর রহমান বাবু, মুনিরা মিঠু, তুষার খান, আরমান পারভেজ মুরাদ, ফারুক আহমেদ, আগুন, আমান খান প্রমুখ।

এই করোনার মধ্যে এফডিসিতে মাত্র ১৪ দিনে সম্পন্ন হয়েছে শুটিং। নির্মাণ ব্যয় প্রায় দুই কোটি ৮৬ লাখ টাকা। প্রযোজক-পরিচালক সেলিম খান বলেন, ‘আমরা ভালো ছবি বানানোর চেষ্টা করেছি। খরচ নিয়ে ভাবিনি। এই ছবি দিয়ে ব্যবসা করাই আমাদের মূল উদ্দেশ্য নয়। জাতিকে আমরা কিছু একটা দিতে চাইছি। কতটা পারলাম বা পারলাম না, সেটা মুক্তির পরই বোঝা যাবে।’

১৪ আগস্ট ছবিটি হলে মুক্তি দেওয়ার পরিকল্পনা ছিল নির্মাতা প্রতিষ্ঠানের। কিছু কারণে দেরি হয়ে গেল। বুধবারেও ছবিটি ছিল সেন্সর বোর্ডে। দু-এক দিনের মধ্যেই ছাড়পত্র পাওয়ার কথা। প্রযোজক বললেন, ‘আশা করছি ২১ আগস্ট ছবিটি মুক্তি দিতে পারব। তথ্য মন্ত্রণালয় আমাদের আশ্বাস দিয়েছে, এই ছবির জন্য সীমিত সময়ের জন্য হলেও নির্দিষ্ট কিছু সিনেমা হল খুলে দেবে।’

Print Friendly, PDF & Email