পরিবর্তনের মানসিকতা ছাড়া মানবিকতা প্রতিষ্ঠিত হবে না

হাসিনা আকতার নিগার

ফেসবুকে  চট্রগ্রামের পুলিশ কর্মকর্তা ওসি মোহসীনের আবেগঘন পোস্টটি অনেকেরই হয়ত নজরে পড়েছে। সিনেমা নাটক আর বাস্তবের পুলিশ চরিত্রের বৈষম্যতা দেখে তিনি নিজের অনুভূতি আর অভিজ্ঞতা থেকে লিখেছিলেন-

“টিভিতে একটা নাটক দেখছিলাম। কাকতালীয়ভাবে বাসায় আমার সন্তানেরাও একই নাটকই দেখছিল। ছবির মতো সুন্দর একটি গ্রাম। সহজ সরল সে গ্রামের মানুষের জীবন। হাসি, আনন্দ, প্রেম, ভালবাসায় মুখর থাকে সে গ্রাম। কিন্তু হঠাৎই গ্রামের এমন মায়াময় পরিবেশে ছন্দপতন হয়। আর এর নেপথ্যে একজন পুলিশ অফিসার! গ্রামে মাদক ছড়ায়, ইভটিজিং বাড়ে, গরীবের উপর শোষণ বাড়ে, হাতে-পায়ে ধরেও ওই পুলিশের অনিষ্ট থেকে বাঁচতে পারে না আবাল বৃদ্ধ বনিতা…

এরপর টিভি বন্ধ করে দিলাম। আর দেখলাম না। কিন্তু হঠাৎই মনে হল, আমার সন্তানরাও তো এটাই দেখছে! বাসায় গিয়ে যদি তারা জিজ্ঞেস করে, ‘বাবা, পুলিশ এমন পঁচা কেন?’ আমি কী উত্তর দিব? এরপর সিদ্ধান্ত নিলাম। আজ বাসায়ই যাব না।

এরপর কাজে ডুব দিলাম। হঠাৎ দেখি ১৩-১৪ বছরের এক ছেলে আসল। এক হাতে বাবার তর্জনি ধরা, অন্য হাতে একটা বোর্ড সদৃশ কিছু। বোর্ডটা আমার জন্য সে উপহার এনেছে। বোর্ড উল্টে দেখি, এ তো আমি! আমাকেই এঁকেছে সপ্তম শ্রেণির আদর!! আমাকে দিয়ে বলল, ‘ আঙ্কেল আপনাকে আমার খুব ভাল লাগে। আমি বড় হয়ে আপনার মতো পুলিশ হবে।’

হঠাৎই আমার নাটকের কথা মনে হল। তাকে ওই নাটকের কথা জিজ্ঞেস করলাম, ‘ পুলিশ তো পঁচা। তবুও পুলিশ ভাল লাগে?’ সে বলে, ‘নাটক তো মিথ্যা দেখায়। এই নাটকে যে নায়ক ছিল। আরেক নাটকে সে গুণ্ডা! নায়ক কি কখনো গুণ্ডা হয়? নাটকই পঁচা। ভালকে তারা পঁচা দেখায়।’

তার এমন উত্তরে সত্যিই চমকে উঠলাম। নাটক, সিনেমায় আমাদের যেভাবে চিত্রায়িত করা হয় তাতে অন্তত শিশুদের সামনে নিজেদের ক্ষতিকারক মনে হয়। কিন্তু আদরদের মনে যে পুলিশের এমন ছবি আছে তা জেনে আবারও নিজেকে নিয়ে গর্ব হল। সিদ্ধান্ত আবারও পাল্টালাম, আদরের সাথে ছবি তুলেই বাসায় যাচ্ছি আদরের দেওয়া এই ছবি নিয়ে। আমার সন্তানেরা যদি জিজ্ঞেস করে পুলিশ কেন পঁচা আদরের উত্তরটাই তাদের দিব। জোর গলায়ই বলব, তোমাদের বাবা পঁচা না। আমরা পঁচা না। পুলিশ পঁচা না। আদরমাখা ভালবাসা আদরের জন্য। ”

ছোট শিশু আদরের দেখা ওসি মহসীনের মত চিন্তার পুলিশকে সমাজের সবাই দেখতে চায়। কোভিড-১৯ এর মহামারীতে বাংলাদেশের পুলিশ বাহিনী মানবিকতার যে পরিচয় দিয়েছে তা অনেকটাই ‘স্বপ্ন জাগানিয়া বাঁশি’ হয়ে বেজেছিল মানুষের মনে। দেশের প্রতিটি পর্যায়ে পুলিশের মতো মানবিকতার প্রত্যাশা ছিল সকলের। কিন্তু  তেমনটা দেখা যায়নি। কারণ অনিয়ম আর দুর্নীতির কাছে নতজানু মানুষ নিজেদের পরিবর্তন করতে পারেনি।  বরং কোভিড-১৯ কে হাতিয়ার করে মানুষের সাথে প্রতারণা করেছে অর্থলোভী ব্যক্তিরা।

করোনাভাইরাস সমাজ ও দেশের  তথা বিশ্বের চিত্র বদলে দেবে এ প্রত্যাশা ক্রমশ মিথ্যা প্রমাণিত হচ্ছে। কারণ একটি প্রতিষ্ঠানের মুষ্ঠিমেয় ব্যক্তির চিন্তাচেতনা সবাই ধারণা করবে- সে আশা পোষণ করা ভুল। বিশেষ করে আমাদের দেশে সামাজিক রাজনৈতিক ও প্রশাসনিকভাবে দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার করা অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। তাই করোনাকালের মানবিকতা কেবল উদাহরণে সীমাবদ্ধ হয়েছে। যদি ওসি মহসীনের পজিটিভ চিন্তাটা পুলিশের ছোট বড় সকল সদস্যেদের মনে গ্রোথিত হত, তাহলে পুলিশ বাহিনীর পরিবর্তনের মানসিকতা সত্যিকারভাবে মানবিকতাকে প্রতিষ্ঠিত করতো।

বদলে যাওয়া এ সমাজে খুব সহজ কাজ নয়। লোভাতুর মন দুর্নীতির হাতছানিকে রুখতে পারে না।  একই পেশায় থেকে জীবনযাপনের বৈষম্যতা থেকে কেউ দুর্নীতির পথে পা বাড়ায়। আবার কেউ যে কোন পন্থায় অর্থ উপার্জন করতে ঘুষ, চাঁদাবাজিকে অন্যায় মনে করে না। এসবের বাইরে যে বিষয়টি বিশেষভাবে উল্লেখ তা হলো ‘দুর্নীতির সিস্টেম।’

এ দুর্নীতির সিস্টেমকে পরিবর্তন করতে না পারলে বাস্তব জীবন থেকে  অন্যায় অনিয়ম দুর্নীতি দূর করা সম্ভব হবে না। একটা প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তিকে রাতারাতি বদলে দেয়া যায় না। নাটকের চরিত্রের পঁচা পুলিশ কেন পঁচা হলো তা খুঁজে বের করতে হবে। তা না হলে এ সমাজের কোন একক প্রতিষ্ঠান পরিবর্তনের মানসিকতা তৈরি করতে পারবে না। আর মানবিকতা হবে প্রশ্নের সম্মুখীন।

লেখক : কলামিস্ট।

Print Friendly, PDF & Email