কী ছিল রিজেন্টের সঙ্গে চুক্তিতে

করোনাভাইরাস আক্রান্ত রোগীদের বিনামূল্যে চিকিৎসায় রিজেন্ট হাসপাতালের সঙ্গে চুক্তি করেছিল স্বাস্থ্য অধিদফতর। টেস্ট ও চিকিৎসার নামে কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে প্রতারক চক্র। চুক্তিতে না থাকলেও ওই হাসপাতালে প্রায় দেড় কোটি টাকার যন্ত্রপাতি দিয়েছে কেন্দ্রীয় ওষুধাগার। তারা এসব যন্ত্রপাতি ফিরিয়ে নিতে চাইলেও হদিস মিলছে না দুটি ডায়ালাইসিস মেশিনের।

গত ১৩ জুলাই সেন্ট্রাল মেডিকেল স্টোরস ডিপো (সিএমএসডি) পরিচালক আবু হেনা মোরশেদ জামান স্বাক্ষরিত এক চিঠিতে দেখা যায়, ‘গত ৭ মে রিজেন্ট হাসপাতালে প্রায় অর্ধকোটি টাকার ২টি ডায়ালাইসিস মেশিন, একটি ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট, ২টি আইসিইউ ভেন্টিলেটর ও দুটি ডায়ালাইসিস বেড দেওয়া হয়েছে।’ এখন এসব যন্ত্রপাতি ফেরত চাইছে তারা। কিন্তু রিজেন্ট হাসপাতালের সঙ্গে স্বাস্থ্য অধিদফতর স্বাক্ষরিত চুক্তিতে সরকারি যন্ত্রপাতি দেওয়ার কোনো উল্লেখ পাওয়া যায়নি।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্বাস্থ্য অধিদফতরের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, ‘গত ২১ মার্চ স্বাস্থ্য অধিদফতরের সঙ্গে রিজেন্ট হাসপাতালের চুক্তি হয়। চুক্তি অনুযায়ী রিজেন্ট হাসপাতালকে করোনা টেস্টের অনুমোদন দেওয়া হয়নি। তাদের শুধু নমুনা সংগ্রহের অনুমতি দেওয়া হয়েছিল। তারা নমুনা সংগ্রহ করে সরকার নির্ধারিত ল্যাবে পাঠাবে। রোগীদের চিকিৎসা বাবদ যে অর্থ ব্যয় হবে তা সরকার পরিশোধ করবে। তাদের কোনো ধরনের সরকারি যন্ত্র দেওয়ার বিষয় চুক্তিতে ছিল না।’

কিন্তু চুক্তির এই সবগুলো শর্তই ভঙ্গ করেছে রিজেন্ট হাসপাতাল। নমুনা সংগ্রহ করে ভুয়া রিপোর্ট দিয়ে রোগীদের সঙ্গে প্রতারণা করেছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। কভিড-১৯ পরীক্ষার নামে জালিয়াতির অভিযোগে রাজধানীর উত্তরা পশ্চিম থানায় দায়ের করা র‌্যাবের মামলায় বলা হয়েছে, ভুয়া প্রতিবেদন দিয়ে প্রায় ছয় হাজার লোকের কাছ থেকে দুই কোটি ১০ লাখ টাকা আদায় করেছে রিজেন্ট। যদিও এ ক্ষেত্রে রোগীর কাছ থেকে কোনো টাকা তাদের নেওয়ার কথা নয়, কারণ সেসব পরীক্ষা সরকারি পরীক্ষাগারে হওয়ার কথা। সরকারের সঙ্গে করা চুক্তি ভেঙে রিজেন্ট করোনাভাইরাস চিকিৎসার জন্য রোগীদের কাছ থেকে অর্থ নিয়েছে। আবার স্বাস্থ্য অধিদফতরেও এক কোটি ৯৬ লাখ টাকার একটি বিল জমা দিয়েছে বলে জানানো হয়েছে এজাহারে। এখন প্রশ্ন উঠেছে, ওই হাসপাতালে সরকারি যন্ত্রপাতি দেওয়া হলো কোন ভিত্তিতে। গত ৬ জুলাই রিজেন্ট হাসপাতালে র‌্যাবের অভিযানে মালামালের যে তালিকা করা হয়, সেখানে রিজেন্টের দুই হাসপাতালের কোনোটিতেই ডায়ালাইসিস ইউনিট খুঁজে পাওয়া যায়নি। ওই সময়ে রিজেন্ট হাসপাতালের চেয়ারম্যান মো. সাহেদ করিমের করোনা আক্রান্ত বাবাকে ডায়ালাইসিস সুবিধা না থাকায় রাজধানীর অন্য একটি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। হাসপাতাল থেকে যন্ত্রপাতিও উধাও। হাসপাতাল সিলগালা করার পর যন্ত্রপাতিগুলো ফেরত চেয়েছে সিএমএসডি।

গত ১১ জুলাই স্বাস্থ্য অধিদফতরের সহকারী পরিচালক ডা. মো. জাহাঙ্গীর কবিরের পাঠানো সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ‘রিজেন্ট হাসপাতালের স্বত্বাধিকারী মো. সাহেদ করিমের বিভিন্ন প্রতারণার বিষয়ে স্বাস্থ্য অধিদফতর আগে অবহিত ছিল না। দেশে কভিড-১৯ রোগীর সংখ্যা বেড়ে গেলে কোনো বেসরকারি হাসপাতাল কভিড রোগী ভর্তি করতে চাইছিল না। এ অবস্থায় রিজেন্ট হাসপাতাল উত্তরা ও মিরপুরে অবস্থিত ওই নামের দুটি ক্লিনিককে কভিড হাসপাতাল হিসেবে ডেডিকেটেড করার আগ্রহ প্রকাশ করে। মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশনায় স্বাস্থ্য অধিদফতরের হাসপাতাল বিভাগ সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের উদ্যোগ নেয়। ক্লিনিক দুটি পরিদর্শনের সময় চিকিৎসার উপযুক্ত পরিবেশ দেখলেও লাইসেন্স নবায়ন ছিল না। বেসরকারি পর্যায়ে কভিড-১৯ আক্রান্তদের চিকিৎসায় অন্য বেসরকারি হাসপাতালগুলোকেও উৎসাহ দেওয়ার লক্ষ্যে লাইসেন্স নবায়নের শর্ত দিয়ে রিজেন্ট হাসপাতালের সঙ্গে চুক্তি হয়।’

Print Friendly, PDF & Email