রেড জোনের তালিকায় যেসব এলাকা, ওষুধ ছাড়া সবকিছু বন্ধ

ঢাকা : প্রাণঘাতি মহামারি করোনা ভাইরাসের (কোভিড-১৯) সংক্রমণের ব্যাপকতা বিবেচনায় নিয়ে রাজধানীসহ দেশের কিছু এলাকাকে রেড জোন হিসেবে চিহ্নিত করে তা লকডাউন করে দেবে সরকার। রেড জোন ঘোষণার ক্ষেত্রে ঢাকায় সবচেয়ে বেশি সংক্রমণ ছড়ানোর মাপকাঠিতে ওপরের দিকে রয়েছে উত্তরা, মোহাম্মদপুর, যাত্রাবাড়ী, ধানমন্ডি, কাকরাইল, মুগদা, মগবাজারের মতো এলাকা। রাজধানীতে এখন পর্যন্ত এমন ২৩টি এলাকা রয়েছে, যেখানে করোনায় আক্রান্তের সংখ্যা একশ’র বেশি।

স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয় থেকে জানা গেছে, রোববার (৭ জুন) থেকে পরীক্ষামূলকভাবে ঢাকার কিছু স্থানে জোনিং ব্যবস্থার মাধ্যমে লকডাউন শুরু হবে। রেড জোনে সবাইকে ঘরে থাকতে হবে, একান্ত প্রয়োজন না থাকলে কেউ বাইরে বের হতে পারবেন না। ওই এলাকার নিত্যপ্রয়োজনীয় যেসব জিনিসের দরকার হবে তা পৌঁছানোর ব্যবস্থা করা হবে। বেশি আক্রান্ত এলাকাকে রেড, অপেক্ষাকৃত কম আক্রান্ত এলাকাকে ইয়োলো ও একেবারে কম আক্রান্ত বা আক্রান্তমুক্ত এলাকাকে গ্রিন জোন হিসেবে চিহ্নিত করা হবে। রেড জোনকে লকডাউন করা হবে, ইয়োলো জোনে যেন আর সংক্রমণ না বাড়ে সেই পদক্ষেপ নেয়া হবে। সতর্কতা থাকবে গ্রিন জোনেও।

স্বাস্থ্য অধিদফতরের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুসারে, ঢাকায় ২০ হাজার ৭০৭ জন করোনাভাইরাসে আক্রান্ত রোগী শনাক্ত হয়েছেন। এর মধ্যে এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি করোনা সংক্রমিত রোগী পাওয়া গেছে মিরপুর এলাকায়। সেখানে ৯৬৯ করোনায় আক্রান্ত রোগী শনাক্ত হয়েছেন।

এরপর দ্বিতীয় সর্বোচ্চ আক্রান্ত রোগী পাওয়া গেছে মহাখালীতে। সেখানে এখন পর্যন্ত আক্রান্ত হিসেবে শনাক্ত হয়েছেন ৪৫৭ জন। আক্রান্তের তালিকায় এর পরে আছে উত্তরা, মুগদা ও মোহাম্মদপুর। এ তিন এলাকায় আক্রান্তের সংখ্যা যথাক্রমে ৪৩৩, ৪২৮ ও ৩৯৪।

বাকি যেসব এলাকায় সংক্রমিত রোগী বেশি, সেসব এলাকা হলো- যাত্রাবাড়ী (৩৮৭ জন), কাকরাইল (৩০০ জন), ধানমন্ডি (২৯৪ জন), মগবাজার (২৫৫ জন), তেজগাঁও (২৫১ জন), রাজারবাগ (২২১ জন), খিলগাঁও (২১৯ জন), লালবাগ (২০৬ জন), রামপুরা (১৯৭ জন), বাড্ডা (১৯৫ জন), মালিবাগ (১৬৪ জন), গুলশান (১৬৩ জন), বাবুবাজার (১৬২ জন), গেন্ডারিয়া (১৪২ জন), ওয়ারী (১২৪ জন), বাসাবো (১২২ জন), বংশাল (১০৯ জন) এবং আগারগাঁও (১০৮ জন)।

ঢাকার বাইরে এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত রোগী শনাক্ত হয়েছে চট্টগ্রাম, নারায়ণগঞ্জ, কুমিল্লা, গাজীপুর ও কক্সবাজারে। আইইডিসিআরের সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুসারে, এ পাঁচ জেলায় আক্রান্তের সংখ্যা যথাক্রমে ২৮৭৫, ২৪৬০, ১১৭৩, ১১৫০ ও ৯৬৯। এসব জেলায়ও সংক্রমণের শীর্ষ এলাকা ধরে চিহ্নিত হতে পারে রেড জোন।

স্বাস্থ্য অধিদফতরের সর্বশেষ শনিবারের (৬ জুন) বুলেটিন অনুসারে, দেশে এ পর্যন্ত করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন ৬৩ হাজার ২৬ জন। এর মধ্যে গত ২৪ ঘণ্টায়ই আক্রান্ত হয়েছেন দুই হাজার ৬৩৫ জন। আক্রান্তদের মধ্যে মারা গেছেন ৮৪৬ জন। এর মধ্যে গত ২৪ ঘণ্টায়ই মারা গেছেন ৩৫ জন।

গত ক’দিনে সংক্রমণ ও মৃত্যু লাফিয়ে লাফিয়ে বেড়ে বাংলাদেশ এখন করোনায় সংক্রমিত দেশগুলোর তালিকায় ২০ নম্বরে উঠে গেছে। এর মধ্যেই সরকারের পক্ষ থেকে এলাকাভিত্তিক রেড জোন চিহ্নিত করার বক্তব্য এলো।

রেড জোনে ওষুধ ছাড়া সবকিছু বন্ধ : নতুন পদ্ধতিতে লকডাউনের আওতায় নিয়ে আসা হচ্ছে দেশকে। আজ রোববার থেকেই কিছু কিছু এলাকায় এটা কার্যকর করা শুরু হবে। রেড, ইয়েলো ও গ্রিন- এই তিন জোনে ভাগ করে রেড জোনের ব্যাপারে সর্বোচ্চ কড়াকড়ি আরোপ করবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। করোনা মোকাবেলায় দেশের যে বিশেষজ্ঞ কমিটি, তারা রেড জোনে ওষুধের দোকান ছাড়া অন্য সবকিছু বন্ধের সুপারিশ করেছেন। সরকারও তেমনটাই ভাবছে বলে জানা গেছে।

ইতোপূর্বে দেশে প্রায় দুই মাসেরও বেশি সময় সাধারণ ছুটি থাকলেও মানুষকে সম্পূর্ণভাবে ঘরে রাখা যায়নি। এবার আটঘাট বেঁধে নামছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। জনগনকে স্বাস্থ্যবিধি মানাতে রেড জোনে ‘যে কোনো ব্যবস্থা’ নেবে পুলিশ। এই জোনে বাইরে থেকে কেউ ঢুকতে পারবে না, ভেতর থেকে কেউ বেরুতেও পারবে না।

করোনা প্রতিরোধে জাতীয় টেকনিক্যাল কমিটির এক সদস্য বলেন, শেষ সুযোগ হিসেবে এখনও আমাদের হাতে কিছু সময় আছে। করোনার ছড়িয়ে পড়া ঠেকাতে সর্বশক্তি নিয়োগ করতে হবে। আমরা বেশকিছু পরামর্শ দিয়েছি- যেসব ওয়ার্ডে ৪০ জনের বেশি আক্রান্ত সেটাকে রেড জোন ঘোষণা করা। রেড জোনে ওষুধের দোকান ছাড়া কিছু খোলা থাকবে না। কেউ মাস্ক না পরলে দৃষ্টান্তমূলক জরিমানা আদায় করতে হবে। এমন আরো কিছু পরামর্শ আছে, কর্তৃপক্ষ প্রায় সবগুলোর ব্যাপারেই ইতিবাচক।

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে ইতোমধ্যেই একটি ‘করোনা মানচিত্র’ তুলে ধরা হয়েছে, যার মাধ্যমে আক্রান্ত বিবেচনায় রেড, ইয়েলো ও গ্রিন জোনের ভাগ করা হয়েছে দেশকে। ৫০ জেলা ও ৪০০ উপজেলাকে রেড জোন (পুরোপুরি লকডাউন) হিসেবে দেখানো হয়েছে। ইয়েলো জোন হিসেবে দেখানো হয়েছে ১৩ জেলা ও ১৯ উপজেলাকে, এসব এলাকায় আংশিক লকডাউন কার্যকর হবে। গ্রিন জোন (লকডাউন নয়) হিসেবে দেখানো হয়েছে ১ জেলা ও ৭৫ উপজেলাকে।

রাজধানীর ১৮০ পয়েন্টে করোনা রোগী ১৯ হাজার : রাজধানী ঢাকার মেট্রোপলিটন এলাকার ৮টি বিভাগের ৪৬টি থানার ১৮০টি স্পটে ছড়িয়ে পড়েছে করোনাভাইরাস। ৬ জুন পর্যন্ত এসব এলাকায় সর্বমোট ১৯ হাজার ১০০ জন রোগী শনাক্ত হয়েছে। রাজধানীতে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত রোগীর শীর্ষ তালিকায় রয়েছে মতিঝিল ও লালবাগ। সবচাইতে কম উত্তরায়।

সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে ইতোমধ্যেই ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ ১৮০টি স্পটের ১ হাজার ৩০টি এলাকার ১ হাজার ৭৫৪টি বাড়ি লকডাউন করে দিয়েছে। আক্রান্ত স্পট ও এলাকার ওপর ভিত্তি করে রেড জোন চিহ্নিত করা হয়েছে।

এই চিহ্নিত তালিকা অনুযায়ী রোববার (৭ জুন) থেকে এলাকাভিত্তিক পূর্ণাঙ্গ লকডাউন করা হতে পারে। দেশে গত ৮ মার্চ প্রথম করোনাভাইরাসে আক্রান্ত রোগী শনাক্ত হয়। শুরুর দিকে সংক্রমিত রোগী ও এ রোগে আক্রান্ত হয়ে মৃতের সংখ্যা স্বল্পসংখ্যক থাকলেও ধীরে ধীরে সংখ্যা বাড়তে থাকে। সম্প্রতি আক্রান্ত রোগী ও মৃতের সংখ্যা আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে।

স্বাস্থ্য অধিদফতরের তথ্য অনুসারে ৮ মার্চ থেকে ৬ জুন পর্যন্ত রাজধানীসহ সারাদেশে সর্বমোট তিন লাখ ৮৪ হাজার ৮৫১টি নমুনা পরীক্ষায় ৬৩ হাজার ২৬ জন রোগী সনাক্ত ও মে‌াট ৮৪৬ জ‌নের মৃত্যু হয়। করোনাভাইরাসে আক্রান্ত ও মৃতের তালিকার শীর্ষে রয়েছে রাজধানী ঢাকা তথা ঢাকা বিভাগ।

স্বাস্থ্য অধিদফতর সূত্রে জানা গেছে, ৬ জুন পর্যন্ত ঢাকা মেট্রোপলিটন এলাকার আটটি বিভাগের মধ্যে সর্বোচ্চসংখ্যক ৩ হাজার ১৪০ জন রোগী রয়েছে মতিঝিলে। এরপর দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ৩ হাজার ৯৭ জন রয়েছে লালবাগে।

এছাড়া মিরপুরে ২ হাজার ৯১৫ জন, রমনায় ২ হাজার ৬৮৮ জন, ওয়ারীতে ২ হাজার ৪৯৪ জন, তেজগাঁওয়ে ২ হাজার ২২৬ জন, গুলশানে ১ হাজার ৫২৫ জন ও উত্তরায় ১ হাজার ১৫ জন আক্রান্ত রোগী রয়েছেন।

এরপর যেসব এলাকায় সবচেয়ে বেশি রোগী পাওয়া গেছে সেসব এলাকা হলো: মহাখালী (৪৫০), যাত্রাবাড়ী (৪১১), কাকরাইল (৩৯৩), মোহাম্মদপুর (৩৮৯), মুগদা (৩৭৬), রাজারবাগ (৩৪৬), ধানমন্ডি (২৯৪), মগবাজার (২৬৫), লালবাগ (২৭৯), উত্তরখান (২৬০), উত্তরা বেড়িবাঁধ (২৫২), বাবুবাজার (২৩৯), তেজগাঁও (২৩৭)।

Print Friendly, PDF & Email