সেদিন কি ঘটেছিল কবরস্থানে : বাস্তব ঘটনা

মৃত ব্যক্তির লাশ দাফন করার নিয়ম এক জেলায় এক রকম।
লক্ষ্মীপুর জেলায় হচ্ছে লাশকে কবরে ডুকানোর পর বাঁশের ছালি দিবে, পরে উপরে কলা গাছের পাতা গিয়ে তার উপরে মাটি দিবে।

অন্য জেলার নিয়ম গুলো কেউ কাঠের চৌড়া পিজ দিয়ে কেউ বা ডুলি বাঁশের বেঁড়ার ছালি দেয়। অনেক জেলা বক্স করে দেওয়া হয় ভিতরে।

যাই হোক আসল কথায় আসি।
কবর মাটি কুড়ার পর মাটি কবরের দুই পাশে রাখা হয় যাতে দুইপাশের মাটি নিয়ে কবরে দেওয়া যায়।
ধর্মীয় নিয়ম অনুসারে কবরের মধ্যে যে তিন জন ব্যক্তি থাকবে তারা কবরের উপর থেকে সরাসরি মাটি কবরে নামাতে পারবে না অথবা কবরের উপরে থাকা ব্যক্তিগণ উপর থেকে সরাসরি মাটি কবরে পেলতে পারবে না।

তাহলে কি করতে হবে মাটিকে টুকরি বা বলের মাধ্যমে নিয়ে কবরে থাকা তিন ব্যক্তির কাছে দিবে তারা কবরে তা পেলবে।

এবার আসেন জরুরী ক কি কি জিনিস লাগে কবরে দাফনের সময়।
সংখ্যা
দুইটি বড় কুদাল
দুইটি টুকরি বা বল।
মাটি কাটা এবং ভর্তি করার জন্য।

এবার শুনেন দাফনের করুন এক গল্প : সবুজ বাংলাদেশ ইনাফা কবর দিতে গেল করোনা মৃত লাশ ইমাম সাহেবের প্রথম বক্তৃব্য সেচ্ছাসেবক টিম কাজ করতে এসেছে তারা সকল কাজ করবেন। বাকিরা যাবেন না কবরের পাশে। তারা যখন কবরে লাশকে ফুতে পেলবে বেশি ভাগটা তখন আপনারা যাবেন। থমকে উঠলাম আমি একজন ধর্মীয় মানুষের এমন উক্তি এটা কেমন চিন্তা তার!
তার কথা গুলো শুনে ক্ষনিকের মধ্যে শরীর শিহরে উঠলো তখন আমি কবরের মধ্যে লাশটা নামাবো।
নিজের মধ্যে ভয় ডুকলো। কারন ধর্মীয় যাজক যাদের আমরা বিশ্বাস করি তার এমন কথা…..!!
মহত্ত্বে স্বরণ পড়লো ইমাম সাহেব জানাজা তো পড়ালো না আমাদের সাথের ক্বারী আবদুর রহমান পড়ালো। হুজুরকে বললাম আপনি জানাজা নামাজ পড়ান হুজুর।
তিনি তখন বলে উঠলো আমি পারবো না।
আপনাদের ক্বারীকে দিয়ে সেরে পেলেন। মূহর্তে চিন্তা না করতেই কবরে লাশ নামালো বাকি টিমের সদস্যরা সেদিন আমরা ৫জন ছিলাম গভীর রাত হওয়াতে অনেকে যেতে চায়নি। চারদিকে গণ অন্ধকার চারদিকে কবর। যাকে কবর দিচ্ছি তার কবরের পিছনে সামনে, চারদিকে কবর সেখানে তখন সেচ্ছাসেবক এবং ছাত্রনেতা আবু তালেব সাথে আরোও তিনজন।
এই দিকে প্রচুর বৃষ্টি, আকাশে বিজলী, মনে হল বিজলীর গর্জনে জমিন ছিন্ন, ভিন্ন হবে।

কবরের ভিতরে পানি, কবরের উপরে চারদিকে পানি পা রাখলে পায়ের গাম্ভুজের অর্ধেক টা পানির ভিতরে ডুকে যায়।
শুধু খালি জায়গা হলে তো হতো।
বড় বাড়ি পারিবারিক কবরের স্থান এতো গণ গণ কবর যে কই রেখে কই পা রাখবো সাথে পানি।
পুরানো কবর গুলো বৃষ্টির পানি এবং জমা পানিতে নরম হয়ে আছে পা রাখলে পায়ের অর্ধেক ডুকে যায় কবরে, কি আঁতঙ্ক।
কবরের স্থানটা পরিস্কার করা হয়নি গত কয়েক বছরে এতো লতা, পাতা গজিয়েছে তার মধ্যে কাল বৈশাখী ঝড়, সাথে বিজলী গর্জন, অন্ধকার।।
মনে হচ্ছে কোন এক গভীর নির্জন ভয়াবহ স্থান।
মৃত মায়ের ছেলের উক্তি যত তাড়াতাড়ি সম্ভব দাফন করে পেলুন দেরি করা যাবে না বৃষ্টি আরোও বেশি নেমে আসবে।
সন্তানের মনে কিছুটা ভয় ছিল দুরত্ব বজায় ছিল। যদিও কিছু কাজ করতে চেষ্টা করতো সে শারীরিক ভাবে তেমন সুস্থ্য না তাই আমরা না করে দিতাম।
সে ভয়ে ছিল অনেকটা সেজন্যও চাপ দি নাই।

জানাজা তে মোটামোটি আমরা সহ ১৪/১৫ জন ছিল। কবরে নেওয়ার পথে আস্তে আস্তে অনেক লোক ঘরের দিকে চলে যায়।

এবার আসুন কবরে মাটি দেওয়ার বাকি কথায়।
কবরে মাটি দিতে টুকরি বা বল দরকার উপরে বলে এসেছি।
নিশ্চই মনে আছে।

কবরে লাশ নামালাম ধরার মতো তেমন কেউ নাই তখন আমাদের টিমের ৫জনের তিন জন কবরে বাকি দুইজন উপরে বাট দুইজন দিয়ে কবরে লাশ নামানো সম্ভব না কি করবো চিন্তায় পড়ে গেলাম এই দিকে বৃষ্টি, বিজলী, অন্ধকার।
বলে রাখতে চাই তখন কারেন্ট ছিল না লাইট জ্বালিয়ে রাখতে বলাতে এক ৬০বছরের চাচা কবরের পাশ থেকে চলে গেল মনে হলো লাইট মারলে ভাইরাস লাগবে লাইটে।
একটা ১৯/২০ বছরের যুবক হঠাৎ একটা লাইট নিয়ে জ্বালিয়ে দিল চার্জ লাইট নিম নিম জ্বলে অত বড় না লাইট টা।
ইমাম সাহেব পূর্বের ন্যায় বাক্য গুলো বলছে শিহরে উঠছি কবরের মধ্যে দাঁড়িয়ে আছি এতো রাত, বৃষ্টি, বিজলীর বড় বড় গর্জন। নিম নিম লাইটের আলো, কবরের চারদিকে আরোও কবর রাত তখন ২:০০টা বাজে 😪
ইমাম সাহেবের উক্তি সব মিলিয়ে মনে মনে ভাবলাম এই মূহত্বে আমার /আমাদের বড় শক্তি মহান আল্লাহ, এবং মা, বাবা, সহ সকলের দোয়া সাথে নিজের মানসিক শক্তি।
কবরে লাশ কি করে নামাবো চিন্তায় পড়ে গেলাম আমরা তিনজন কবরে উপরে দুইজন সম্ভব না দুই একজন লোক আছে তারা আমাদের চাইতে ৩০ফুড দুরে। হঠাৎ ছাত্র নেতা আবু তালেব বলে উঠলো বাবু ভাই আমি কি ধরতে পারি?
সময়টা এমন ছিল চিন্তা না করেই খুঁশিতে হা বলে দিলাম। বেচারা সহযোগীতা করলো কোন মতে কবরে কয়েক ধাঁপ দিয়ে কবরে লাশ নামালাম মাঞ্জুমারা (৬৯)
শারীরিক ভাবে স্বাস্থ্যবান ছিল।

কবরে নামালাম এবার তিন বান খুলতে হবে লাশের তবে কবরের ভিতরে অন্ধকার।
লাশের মৃত দেহের ব্যাগের সেইন খুললাম নিজেই খোলার সাথে সাথে মনে হয় এসে গেলে চারদিকের আর্তনাদ কবরে একটা লাশ এতো গভীর রাত তার মধ্যে আমরা😭
সেইন টা খুলে ভয়ে সাময়িক ভয় আসলো মনে ক্বারী আজিজীকে বললাম বান গুলো খুলে দাও। সে চিকন মানুষ মাথার বান খুললো, পায়ের বানটাও খুললো। বুকের বান খুলবে বাট যারা গোসল দিল এমন ভাবে গিঁটে দিল খোলা সম্ভব না বসাও যায় না ক্বারী কষ্ট করে খুলে পেললো বানটা।

কবরে প্রথমে বাঁশের ছালি দিলাম, কলা পাতা দিলাম।
এবার মাটি দিবো বাট নেই একটাও টুকরি মাটি গুলো বৃষ্টিতে ভিজে গেছে টুকরি লাগবে, বৃষ্টি না হলেও টুকরি লাগতো যা উপরে বলে এসেছি।
তাৎক্ষনিক আমাদের সাথে নতুন সেচ্ছাসেবক হিসেবে যুক্ত হওয়া ছাত্র নেতা আবু তালেবের মুখের দিকে তাকালাম তখন লাশ কবরে আমরাও কবরে। সে বললো জীবনে এমন মানুষ বা বাড়ি দেখিনি মানুষ এতো ভয় পায় কেন। আর মানসিকতা এমন ছোট কেন সামান্য টুকরি দিয়ে সহযোগীতা করে না।

আসেন এবার টুকরি দিচ্ছে না কেন কারন টুকরিতে ভাইরাস ধরবে বলে, কেউ আসেনি ভাইরাসের ভয়,লাইটের কথা শুনে চাচা দোঁড় মারলো ভাইরাসের ভয়ে।
আমাদের ভয় নেই….

কি করা এখন কবরে লাশ মাটি পেলতে হবে। টুকরি দিবে না কেউ 😥😪
আমাদের সেচ্ছাসেবক অমি টিমের এতো কষ্ট দেখে সে কাঁন্না সূরে জোরে জোরে পড়তে লাগলো আসহাদুআল্লাহ লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মোহাম্মাদুর রাসুলেল্লাহ।

মূহত্বে শরীরটা আরোও ভারি হয়ে উঠলো।
তাৎক্ষনিক নতুন চিন্তা উপর থেকে মাটি কুদাল দিয়ে দিবে আমরা নিচ থেকে হাত পেতে পেতে মাটি নিচে দিবো।
এক কবর মাটি চারটি খানি কথা না।

কখনও আবু তালেব, কখনও জাহিদ পাপ্পু, কখনও এক মুরুব্বি টেনে দিচ্ছে আমরা কবরে দিচ্চি।
যে কাজ হতো ১ঘন্টায় সেটি হলো ২ঘন্টায় শুধু টুকরির অভাবে।
মাটি টেনে টেনে কবর শেষ তখন শুধু কবরের উপরের সরু টা করা বাকি কে যেন একজন একটা টুকরি এনে দিল আমার হাতে।
টুকরি দেখে সহ্য করতে পারিনি কাজ শেষ টুকরির কাজ কি এখন!!
জঙ্গলের দিকে ছুঁড়ে পেলে দিলাম টুকরি টা।

কবরের সরুটা শেষ করলাম ইমাম সাহেব কে বলা হলো নারিকেল গাছে পাতাটা আর পানিটা ডেলে দিতে সে বললো ক্বারী সাব কে বলেন দিয়ে দিতে।

ইমাম সাহেবকে রেগে যাওয়ার পর রাজি হলো সে দুইটি কাজ করলো শেষ মুনাজাত দিল কবরের কাজ শেষ।
গলাটা পেটে যাচ্ছে পিপাসায়, ক্লান্ত মন চায় কবরের পাশে শুয়ে পড়ি। এক চাচা এসে বললো খাটনি টা নিয়ে চলেন। অবাক দৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে চিলাম কিছু সময়।
ছাত্র নেতা তালেব সহ খাটনি টা নিয়ে গেলাম বাড়ির ভিতরে স্টিলের খাট বড্ড ওজনি জিনিস।

বাড়িতে নেওয়ার পর আরেক চাচা যাকে কবরের সময় পাশে দেখিনি বললো কিছু মনে নিবেন না খাটটি অন্যস্থানে মানে মসজিদে রেখে আসলে ভালো হবে একটু পানি আর স্পে করে।
চাচার মুখে আবারও ক্লান্ত চোখে তাকিয়ে রইলাম হটাৎ মৃত মায়ের ছেলে বললো না এটা করতে হবে না এটা এখানে থাকুক কাল সকালে হবে সব।
আপনারা যান।
সবাই সকল নিরাপদ সামগ্রী যে গুলো পুড়ানো জিনিস সেগুলো পুড়ালাম। মোটামোটি সব পরিস্কার করলাম গরম পানি দিয়ে।।
অবশেষে রাত তখন ৩টা বাজে রওনা হইলাম লক্ষ্মীপুরের পথে সবাই অফিসে আসলাম।
জুয়েল ভাই, অমি গরম পানি দিয়ে অফিসে গোসল করলো পরে বাসায় গেল।, আজিজি আগেই বাসায় গেলো। আমি পাপ্পু বসে বসে গল্প করলাম এরই মধ্যে ফজরের আজান।

বাসায় আসিনি তখন কারন এতো রাতে বাসার গেইট খুলবে না আর ডাকাটাও সুন্দর হবে না।
তাই চেয়ারে বসে ঝিমিয়ে নিলাম কিছুটা সময় চলে গেলেন আমি ভাবলাম একটু ঝিমিয়ে নি বাট হবে না। দুইজন দুইজনের বাসায় গেলাম গরম পানি, সেভলন সাবান গোসল। এই হচ্ছে একটি স্মরণীয় রাত।

ধন্যবাদ সেই রাতের সহযোগী ছাত্র নেতা আবু তালেব তার সহযোগীতা না থাকলে সেদিন আরোও কষ্ট পেতে হতো।

পরিশেষে বলবো এতো বড় বিপদ জেনেও কাজ করছি মুত লাশ দাফনে,সৎকারে উৎসাহ দিবেন দোয়া করবেন। সমালোচনা থেকে বিরত থাকবেন।

আমাদেরও মা বাবা, ভাই, বোন আছে তাদের রেখে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে যুদ্ধে নেমেছি অদৃশ্য শত্রুকে পরাজিত করতে।
দোয়া করবেন যেন সুস্থ্য থাকি। নিরাপদে থাকি।

-ইসমাইল হোসেন বাবু

স্বেচ্ছাসেবী ও সাধারণ সম্পাদক
সবুজ বাংলাদেশ

Print Friendly, PDF & Email