লক্ষ্মীপুরে টিসিবির ডিলাররা পন্য সরবরাহে অনাগ্রহী

মো. রাকিব হোসাইন রনি : 

করোনাভাইরাস পরিস্থিতি মোকাবেলায় প্রশাসনের ঘোষিত লকডাউনে চারদিকে এখন সুনসান নীরবতা। দিনে সাময়িক সময়ের জন্য খাদ্য পণ্যের দোকানপাট খোলা থাকলেও দাম আকাশ ছুই। রামজানেও স্থানীয় বাজার উর্ধ্বগতি। এমন অদ্ভুত পরিস্থিতিতে আশা পাশের জেলার নিম্ন ও মধ্যবিত্তরা যখন বিকল্প ব্যবস্থা সরকারের ট্রেড কর্পোরেশন অব বাংলাদেশ (টিসিবি’র) পণ্যের উপর নির্ভর। সেখানে টিসিবির এ সেবা থেকে বঞ্চিত লক্ষ্মীপুরের ভোক্তারা। শুধু চলতি সংকট মূহুর্তেই নয়, টিসিবির নিয়োগকৃত ডিলাররা খোলা বাজারে পণ্য না বিক্রি করায় গত ৫/৬ বছর ধরে সাশ্রয় মূল্যে টিসিবি’র পণ্য ক্রয় সেবা থেকে বঞ্চিত এ অঞ্চলের মানুষ।
এদিকে জেলায় টিসিবি’র পণ্য ডিস্টিভিউশন সেন্টার না থাকা, পণ্য পরিবহন ব্যয় ও বিক্রয় মূল্যের সামঞ্জস্য হীনতায় লোকসান গুনতে হয়। তাই ডিলারও টিসিবি’র পন্য বিক্রিতে আগ্রহী নন।

টিসিবি’র ডিলার তালিকা হালনাগাদ ২০১৯ এর তথ্য মতে, চুক্তি অনুযায়ী লক্ষ্মীপুরে টিসিবি’র পণ্য সরবরাহ করে স্বল্প মূল্যে পণ্য বিক্রয়ের জন্য ১২জন ডিলার নিয়োগ করা হয়। লক্ষ্মীপুর সদর উপজেলায় ৫ জন, কমলনগরে ২ জন, রামগঞ্জে ৩ জন ও রায়পুরে ২জন ডিলার। এদের মধ্যে রামগঞ্জ উপজেলার পানপাড়া বাজার এলাকার মেসার্স রিপাত ষ্টোর ও মেসার্স পাটোয়ারী ষ্টোর নামে দু’জন ডিলারের চলতি বছরের ডিসেম্বর পর্যন্ত চুক্তি নবায়ন করা হয়েছে। অপরদিকে টিসিবির পণ্য সরবরাহ ও বিক্রি না করার দায়ে ২০১৭ সালের ১৪ ডিসেম্বর সদরের চন্দ্রগঞ্জের মেসার্স হান্নান এন্ড ব্রাদার্স ও রায়পুরের মেসার্স ফারুক ষ্টোর, মেসার্স দিদার ষ্টোর নামে তিন ডিলারের জামানতসহ ডিলারশীপ বাতিল করে টিসিবি কর্তৃপক্ষ। এছাড়া ৭জন ডিলার চুক্তি নবায়ন না করায় মেয়াদ উত্তীর্ণের তালিকায় রয়েছে। মেয়াদ উত্তীর্ণ ডিলারগন হলেন, সদরের চন্দ্রগঞ্জ বাজার এলাকার মেসার্স কফিল উদ্দিন আহম্মদ, মেসার্স ওবায়েদুল হক, চন্দ্রগঞ্জ পশ্চিম বাজার এলাকার মেসার্স মতিন এন্ড ব্রাদার্স, হাজীরপাড়া বাজার এলাকার মেসার্স হামিদ ষ্টোর, কমলনগর উপজেলার তোরাবগঞ্জ বাজারের মেসার্স সোহেল এন্ড ব্রাদার্স, মেসার্স সওদাগর এন্ড সন্স এবং রামগঞ্জ উপজেলার পানপাড়া বাজারের মেসার্স রিফাত ট্রেডার্স।

স্থানীয় ভোক্তারা জানান, অস্থিতিশীল বাজার স্থিতিশীল রাখতে এবং নিম্ন ও মধ্যবিত্তদের সাশ্রয় মূল্যে পণ্য সেবা দিতে সরকারের এমন উদ্যোগ। অথচ র্দীঘ ৫/৬ বছর ধরে লক্ষ্মীপুরের নিয়োগকৃত ডিলাররা টিসিবির পন্য সরবরাহ করছেন না। চুক্তির মেয়াদ শেষ হলেও বাতিল করা হচ্ছে না ডিলারশীপ। এতে সরকারের ন্যায্য মূল্যে পণ্য সেবা থেকে বঞ্চিত তারা। উপায় না পেয়ে বাধ্য হয়েই নিম্ন আয়ের মানুষগুলো উচ্চ মূল্যে নিত্য পণ্য সামগ্রী কিনছেন। মেয়াদ উত্তীর্ণ ও অনাগ্রহী টিসিবির ডিলার বাতিল পূর্বক নতুন ডিলার নিয়োগের মাধ্যমে টিসিবির পণ্য সেবা নিশ্চিতে সংশ্লিষ্টদের প্রতি দাবী স্থানীয় ভোক্তাদের।

টিসিবির ডিলারদের অভিযোগ, লক্ষ্মীপুর জেলায় টিসিবি’র কোন ডিস্টিবিউশন সেন্টার নেই। জেলা থেকে ৭০/৮০ কিলোমিটার দুরে চট্টগ্রাম বা কুমিল্লা আঞ্চলিক কার্যালয় থেকে পণ্য সরবরাহ করতে হয়। এতে পণ্য পরিবহন ব্যয় অনেক বেশি। লক্ষ্মীপুরে ডিস্টিবিউশন সেন্টার থাকলে পরিবহন ব্যয় কমে যেতো। তাছাড়া টিসিবির পণ্য বিক্রিতে ২/১ টাকার বেশি লাভ করা যায় না।এতে লাভের চেয়ে লোকসানই বেশি। টিসিবির পণ্যের মান নিয়েও তাদের অভিযোগ রয়েছে।
লক্ষ্মীপুর সদর উপজেলার চন্দ্রগঞ্জ পশ্চিম বাজার এলাকার মেসার্স মতিন এন্ড ব্রাদার্স এর মালিক ডিলার মতিন বলেন, টিসিবির পণ্য সরবরাহ করতে গেলে নানা সমস্যার সম্মুখিত হতে হয়। ওজনে কম ও নিম্নমানের পণ্য দেয়া কর্তৃপক্ষ। সঠিক ওজন দেয়ার জন্য তাদের বাড়তি টাকাও দিতে হয়। তাই ৫ বছর থেকে টিসিবির পণ্য বিক্রি বন্ধ করে দেন তিনি।
কমলনগর উপজেলার তোরাবগঞ্জ বাজার এলাকার মেসার্স সোহেল এন্ড ব্রাদার্স বলেন, টিসিবির নিজস্ব কোন পন্য নেই। বাজারের বিভিন্ন আড়ৎ থেকে পণ্য কিনে ডিলারদের সরবরাহ করে। নিম্ন মানের মশুর ডাল, দেশী চিনি দ্রুত গলে যাওয়ায় বিক্রি করা সম্ভব হয় না। পরিবহন ব্যয়ের সাথে বিক্রিয়ের সামঞ্জস্য থাকে না। অনেক সময় বাজার মূল্য ও টিসিবির মূল্য সমান হয়। এতে ক্ষতির সম্মূখিন হতে হয়। তাই বাধ্য হয়েই টিসিবির পণ্য সরবরাহ বন্ধ করে দেয়া হয়েছে।
এদিকে লক্ষ্মীপুর জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের নেজারত শাখার কম্পিউটার অপরেটর মো. জহির বলেন, দেশে পেঁয়াজ সংকট মূহুর্তেও ডিলারদের খোলা বাজারে সাশ্রয়ী মূল্যে টিসিবি’র পেঁয়াজ বিক্রির জন্য বলা হলেও তারা কর্ণপাত করেনি। এসময় জেলা প্রশাসক কার্যালয় থেকে ডিলারদের সহযোগিতা করার আশ্বাস দেয়া হলেও তারা পণ্য সরবরাহ করতে রাজি হয়নি। চলতি করোনা ও রমজান পরিস্থিতিতেও টিসিবি’র পণ্য বিক্রির জন্য অনুরোধ করা হয়। তারা টিসিবি’র পণ্য বিক্রি করতে অনাগ্রহী। জেলার ভোক্তা সেবা নিশ্চিত করতে টিসিবি’র নতুন ডিলার নিয়োগ করা অতি জরুরী বলে তিনি দাবী করেন।
জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের (নেজারত শাখা) সহকারী কমিশনার মো. বনি আমিন বলেন, লক্ষ্মীপুরে টিসিবির ডিলারদের চুক্তির মেয়াদ নেই। দীর্ঘ কয়েক বছর পণ্য সেবা থেকে বঞ্চিত এ জেলার মানুষ। অনাগ্রহী ও মেয়াদ উত্তীর্ণ ডিলারদের জামানতসহ ডিলারশীপ বাতিরে জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে লিখিত ভাবে জানানো হবে। তিনি আরো বলেন, নতুন ডিলার নিয়োগের জন্য দুইটি প্রতিষ্ঠানের আবেদপত্র টিসিবি’র কার্যালয়ে পাঠানো হয়েছে। পর্যায়ক্রমে নতুন ডিলার নিয়োগের মাধ্যমে জেলায় টিসিবি’র পণ্য সেবা নিশ্চিত করা হবে বলে জানান তিনি।
ট্রেড কর্পোরেশন অব বাংলাদেশ (টিসিবি’র) কুমিল্লা আঞ্চলিক কার্যালয়ের প্রধান শহিদুল ইসলাম জানান, ডিলার নিয়োগ ও বাতিল প্রক্রিয়া সম্পন্ন টিসিবি’র ঢাকা প্রধান কার্যালয় থেকে হয়ে থাকে। কুমিল্লা কার্যালয় থেকে শুধুমাত্র ডিলারদের পণ্য সামগ্রী সরবরাহ করা হয়। কিন্তু লক্ষ্মীপুরের কোন ডিলারই পণ্য সরবরাহ করেন না।
করোনা ও রমযান পরিস্থিতিতে খোলা বাজারে পণ্য সেবা নিশ্চিত করতে চিনি ও মশুর ডাল খুচরা বিক্রয় মূল্য কেজি প্রতি ৫০ টাকা, সয়াবিন তেল প্রতি লিটার ৮০ টাকা হারে ৫ লিটার ৪শ টাকা, খেঁজুর ১২০টাকা ও ছোলা ৬০ টাকা কেজি হারে দরা হয়েছে।

Print Friendly, PDF & Email