লক্ষ্মীপুরে মানবিক সহায়তার তালিকা তৈরি নিয়ে অস্থিরতা

কমলনগর (লক্ষ্মীপুর) প্রতিনিধি :

করোনাভাইরাসের সঙ্কটকালে মানবিক সহায়তা কর্মসূচি ‘বাস্তবায়ন কমিটি’ গঠন এবং উপকারভোগীর তালিকা তৈরি নিয়ে লক্ষ্মীপুরের কমলনগরে অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। কর্মসূচি বাস্তবায়নে ওয়ার্ড ও ইউনিয়ন পর্যায়ে কমিটি গঠনে রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধি মনোনয়ন এবং উপকারভোগীর তালিকা তৈরি নিয়ে উপজেলা পরিষদ ৩৪ শতাংশ কোটা চাওয়ায় এ অচলাবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। এ কারণে আগামীকাল মঙ্গলবারের (৫ এপ্রিল) মধ্যে উপকারভোগীর তালিকা তৈরি করে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে জমা দেওয়ার কথা থাকলেও তা সম্ভব হচ্ছে না। এতে করে মেঘনা উপকূলীয় দারিদ্রপীড়িত এ উপজেলায় সরকারের এ কর্মসূচিটি বাস্তবায়ন নিয়ে শঙ্কা দেখা দিয়েছে।

জানা গেছে, করোনাভাইরাসের কারণে উদ্ভূত পরিস্থিতিতে কর্মহীন মানুষদের জন্য মানবিক সহায়তা কর্মসূচির আওতায় ভাতা ও সুবিধাপ্রাপ্ত পরিবার বাদে উপজেলার ৭৫০০ দুস্থ পরিবার সরকারি বিভিন্ন সহায়তা পাবেন। কর্মসূচি বাস্তবায়নের লক্ষ্যে ওয়ার্ড ও ইউনিয়ন কমিটি গঠন করে উপকারভোগীর তালিকা তৈরির জন্য জনপ্রতিনিধিদের প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হয়। নির্দেশনা অনুযায়ী ওয়ার্ড ও ইউনিয়ন কমিটিতে ক্ষমতাসীন দলের চারজন করে প্রতিনিধি রাখা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি-সাধারণ সম্পাদকের মনোনীত ব্যক্তি নিয়েই কমিটিগুলো করা হয়। ইতোমধ্যে ওই কমিটিগুলোর মাধ্যমে উপকারভোগীদের তালিকা তৈরির কাজ সম্পন্ন হওয়ার পথে। কিন্তু এরই মধ্যে উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যানের কার্যালয় থেকে প্রতিটি ওয়ার্ড ও ইউনিয়ন কমিটিতে রাজনৈতিক প্রতিনিধি হিসেবে যুবলীগ নেতাদের নাম মনোনীত করে তালিকা পাঠানো হয় ইউনিয়ন পরিষদগুলোতে। পাশাপাশি উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ও উপজেলা যুবলীগের আহ্বায়ক মেজবাহ উদ্দিন আহম্মেদ বাপ্পী দুই দিন আগে প্রত্যেক ইউপি চেয়ারম্যানের মুঠোফোনে খুদেবার্তা পাঠান। এতে প্রতিটি ওয়ার্ড থেকে উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যানের ২০, ভাইস চেয়ারম্যানের ১০ এবং রাজনৈতিক দলের মনোনীত ২০ জন করে নিয়ে উপকারভোগী তালিকা করার নির্দেশনা দেওয়া হয়।

এদিকে উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যানের রাজনৈতিক প্রতিনিধি মনোনয়নের চিঠি ও উপকারভোগীর তালিকা তৈরিতে কোটা চেয়ে নতুন এ বার্তা পেয়ে বিপাকে পড়ে যান ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও সদস্যরা। ক্ষুব্ধ ওই সব জনপ্রিতিনিধিদের দাবি, উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যানের নীতিমালা বহির্ভূত নির্দেশনায় তাদের কাজে স্থবিরতা দেখা দিয়েছে। এ কারণে তালিকা তৈরি করে মঙ্গলবার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে জমা দেওয়ার কথা থাকলেও তারা দিতে পারছেন না।

উপজেলার পাটারীরহাট ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট একেএম একেএম নুরুল আমিন রাজু জানান, মানবিক সহায়তা কর্মসূচির উপজেলা কমিটি তার ইউনিয়ন থেকে ৮০০ দুস্থ পরিবারের নাম তালিকাভুক্ত করে জমা দিতে বলেছে। নিয়ম অনুযায়ী গঠিত ওয়ার্ড কমিটির মাধ্যমে তারা ৯টি ওয়ার্ড থেকে ৮৮ জন করে উপকারভোগীর তালিকা করেছেন। কিন্তু সেখান থেকে উপজেলা পরিষদ ৩০ এবং রাজনৈতিক দলের জন্য ২০টি করে কোটা চেয়ে উপজেলা চেয়ারম্যান এখন খুদে বার্ত পাঠিয়েছেন। এ হিসেবে ইউনিয়ন পরিষদের জন্য মাত্র ৪৪ শতাংশ উপকারভোগীর নাম দেওয়ার সুযোগ থাকে। অথচ এ কর্মসূচির শতভাগ দায়ভার ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও সদস্যদের। তাই বিষয়টি জনপ্রতিনিধিরা কোনোভাবে মেনে নিচ্ছেন না।

উপজেলার চরকালকিনি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মাস্টার মো. ছায়েফ উল্যাহ জানান, সভা ডেকে তিনি  পরিষদের সদস্যদের উপজেলা পরিষদের কোটা চাওয়ার বিষয়টি জানিয়েছেন। কিন্তু ওই সভায় কোনো সিদ্ধান্ত না দিয়ে ক্ষুব্ধ সদস্যরা সভা থেকে বেরিয়ে যান।

উপজেলার চরকাদিরা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মাওলানা খালেদ সাইফুল্যাহ বলেন, নীতিমালা অনুযায়ীই আমরা উপকারভোগীর তালিকা প্রস্তুত করছি। উপজেলা পরিষদের কোটার জন্য উপজেলা কমিটিতে তা অনুমোদন না হলেও নিয়ম বহির্ভূত কোনো কাজ আমার পরিষদ করবে না।

স্থানীয় সংসদ সদস্যের প্রতিনিধি ও উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি একেএম নুরুল আমিন মাস্টার জানান, নীতিমালা অনুযায়ী এ কর্মসূচির উপকারভোগী নির্বাচনের এখতিয়ার সম্পূর্ণ ইউনিয়ন পরিষদের। যেখানে সংসদ সদস্য এ উপকারভোগী নির্বাচনে কোনো হস্তক্ষেপ করেনি; সেখানে উপজেলা পরিষদের ৩৪ শতাংশ কোটা চাওয়ার বিষয়টি সম্পূর্ণ অযৌক্তিক।

ওয়ার্ড ও ইউনিয়ন কমিটিতে আওয়ামী লীগের প্রতিনিধির জায়গায় যুবলীগের একজন করে প্রতিনিধি মনোনয়নের হস্তক্ষেপ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, দলের কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ওই সব কমিটিতে আওয়ামী লীগের প্রতিনিধিই থাকবেন।

তবে এসব বিষয়ে বক্তব্য নেওয়ার জন্য উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান ও উপজেলা যুবলীগের আহ্বায়ক মেজবাহ উদ্দিন আহমেদ বাপ্পীর মোবাইল ফোনে একাধিকবার কল করলেও তিনি রিসিভ করেননি।

মানবিক সহায়তা কর্মসূচির উপজেলা কমিটির সভাপতি ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ মোবারক হোসেন জানান, নীতিমালা অনুযায়ী গঠিত কমিটির মাধ্যমেই উপকারভোগীদের তালিকা তৈরি করার কথা। এক্ষেত্রে কোটা চেয়ে হস্তক্ষেপ করার কোনো এখতিয়ার উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান বা ভাইস চেয়ারম্যানদের নেই। তিনি বলেন, নীতিমালার আলোকে দ্রুত তালিকা প্রস্তুত করে জমা দেওয়ার জন্য ইউপি চেয়ারম্যানদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

Print Friendly, PDF & Email