মহামারী মোকাবেলায় যেমন রাষ্ট্র প্রয়োজন

চীনে শুরু হওয়ার পর নভেল করোনাভাইরাস মহামারী আকারে এখন সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়েছে। অনেকেই বলছে, চীন সরকার পরিস্থিতির গুরুত্ব ও প্রকৃত অবস্থা সম্পর্কে তথ্য গোপন করেছে। যেখানে উদাহরণ হিসেবে চীনের একজন ডাক্তার লি ওয়েনলিয়াংয়ের কথা বলা যায়। যিনি একেবারে শুরুতে করোনা নিয়ে সতর্কবার্তা দেয়ায় শাস্তির মুখে পড়েছিলেন। অথচ ঘটনার নির্মমতা হলো সেই ওয়েনলিয়াংই পরে একই রোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেন। যা কিনা সরকারের কর্তৃত্বমূলক ও ত্রুটিপূর্ণ রাষ্ট্র ব্যবস্থাকে চিহ্নিত করে।

পরিস্থিতি অবশ্য এখন গণতান্ত্রিক সরকারগুলোর জন্যও বেশ বিব্রতকর বলেই মনে হচ্ছে। ইউরোপের বিভিন্ন দেশে রোগীর সংখ্যা অনেক আগেই চীনকে ছাড়িয়ে গেছে। বিশ্বের অনেক গণতান্ত্রিক দেশের নেতারা মহামারীর এই বিপদ কমিয়ে আনার ক্ষেত্রে একই ধরনের চাপ অনুভব করছেন। সেটা হতে পারে অর্থনৈতিক ক্ষতি এড়াতে কিংবা ব্যক্তি স্বার্থ রক্ষার দিক থেকেও।

এমন নয় যে এটা কেবল ব্রাজিলের জাইর বোলসোনারো অথবা মেক্সিকোর লোপেজ ওবরাডোরের জন্য সত্য। বরং এটা যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জন্যও সমান সত্য। যিনি কিনা মার্চের মাঝামাঝি সময়েও বলে আসছিলেন, যুক্তরাষ্ট্রে রোগটি নিয়ন্ত্রণে আছে এবং খুব দ্রুতই এটি থেমে যাবে।

এটাই বলে দিচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্র ভাইরাসের হামলার আগে প্রস্তুতির জন্য হাতে থাকা দুই মাস সময় হাতছাড়া করেছে। যা কিনা টেস্টিং কিট ও মেডিকেল সরঞ্জামের অভাবও তৈরি করেছে। এদিকে ব্রিটেনে থাকা চীনা শিক্ষার্থীরা বিস্ময় প্রকাশ করেছেন বরিস জনসন সরকারের নেয়া পদক্ষেপগুলো দেখে।

এদিকে যখন এই মহামারীর প্রকোপ কমে আসবে, তখন অবশ্য সরল বৈপরীত্যের নীতি বাতিল করতে হবে। সংকট মোকাবেলায় কার্যকর পদক্ষেপ নিতে একদিকে স্বৈরতন্ত্র এবং অন্যদিকে গণতন্ত্রকে বসিয়ে দেয়া যাবে না। বরং সেখানে উচ্চদক্ষতাসম্পন্ন স্বৈরতন্ত্র থাকবে এবং কিছু বিপর্যয়কারী ফলাফলও থাকবে। গণতান্ত্রিকদের মাঝে ছোট আকারে হলেও একই রকম বৈষম্য দেখা যাবে।

তবে কর্ম সম্পাদনের গুরুত্বপূর্ণ নির্ধারক শাসনের ধরন হবে না। তা হবে রাষ্ট্রের সক্ষমতা এবং তারও ওপর সরকারের প্রতি নাগরিকদের বিশ্বাসযোগ্যতা দিয়ে। সংকটকালে সব রাজনৈতিক পদ্ধতির উচিত বিবেচনামূলক কর্তৃত্ব কার্যনির্বাহী শাখায় অর্পণ করা। আগে থেকে নির্ধারিত কোনো আইন অথবা নীতি কোনোভাবেই দ্রুত পরিবর্তনশীল অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে রাষ্ট্র কোন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে পারে, তা অনুমান করতে পারে না।

শীর্ষে থাকা মানুষের সক্ষমতা ও বিবেচনাবোধই ঠিক করে দেয় ফলাফল ভালো হবে নাকি খারাপ। পাশাপাশি বিশ্বস্ততা অর্জন হচ্ছে এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়, যা কিনা সমাজের ভাগ্য নির্ধারণ করতে পারে। মানুষকে এই বিশ্বাস রাখতে হবে যে নির্বাহীরা জানেন তারা কী করছেন।

একটা জনপ্রিয় ভুল ধারণা প্রচলিত আছে যে উদার গণতান্ত্রিক সরকার দুর্বল হয়ে থাকে, কারণ তাদের জনরুচি ও আইনি প্রক্রিয়ার প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকতে হয়। সব আধুনিক সরকারকে শক্তিশালী কার্যনির্বাহী শাখা গড়ে তুলতে হয়, কারণ এটা ছাড়া কোনো সমাজই টিকে থাকতে পারে না।

তাদের শক্তিশালী, কার্যকর ও আধুনিক হতে হবে যেন তারা প্রয়োজনীয় সময়ে সমাজকে রক্ষার জন্য শক্তি প্রয়োগ করতে পারে এবং মানুষকে প্রয়োজনীয় সেবা দিতে পারে। একটি উদার গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ও স্বৈরতান্ত্রিক রাষ্ট্রের মধ্যে পার্থক্য হলো প্রতিষ্ঠানগুলোর মাঝে ক্ষমতার ভারসাম্য, আইনের শাসন ও গণতান্ত্রিক জবাবদিহিতা।

আমেরিকা হয়তো কাজের শুরুটা ধীরগতিতে করেছে। কিন্তু এটি যখন একবার গতিসম্পন্ন হয়ে উঠবে তখন এটি চীনসহ একনায়ক সরকারের সমান সক্ষমতা অর্জন করতে পারে। আবার অনেকে বলতে পারে যুক্তরাষ্ট্রে ক্ষমতা যখন গণতান্ত্রিকভাবে বৈধ, তাই এটি স্বৈরতান্ত্রিক সরকারের চেয়ে অধিক টেকসই হবে। পাশাপাশি সরকার নাগরিক এবং নাগরিক সমাজের ভাবনা ও তথ্যকে কাজে লাগাতে পারবে, যা চীন পারবে না।

একইভাবে একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র নির্বাহীদের কাছে জরুরি ক্ষমতা হস্তান্তর করে দ্রুত বাড়তে থাকা হুমকি মোকাবেলা করার জন্য। যদি সবকিছু নির্ভর করে এই বিশ্বাসের ওপর যে নির্বাহীরা সেই ক্ষমতা বুদ্ধিমত্তা ও কার্যকরভাবে ব্যবহার করবে। যা এখন আবার যুক্তরাষ্ট্রসহ আরো অনেক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের জন্য বড় সমস্যা।

বিশ্বাসযোগ্যতা মূলত দুটি ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে থাকে। একটি হচ্ছে নাগরকিদের অবশ্যই বিশ্বাস থাকতে হবে যে তাদের সরকারের দক্ষতা, প্রযুক্তিগত জ্ঞান, সামর্থ্য ও নিরপেক্ষভাবে বিচার করার যোগ্যতা রয়েছে। দ্বিতীয় ভিত্তি হচ্ছে হায়ার্কির শীর্ষ পর্যায়ের ওপর বিশ্বাস, যা কিনা যুক্তরাষ্ট্রে লিংকন, উইলসন ও রুজভেল্টের মতো প্রেসিডেন্টরা পেয়েছিলেন। যুদ্ধকালীন প্রেসিডেন্ট হিসেবে এ তিনজনকে সাফল্যের প্রতীক ধরা হয়।

তবে সেদিক থেকে ডোনাল্ড ট্রাম্প তার সাড়ে তিন বছরের রাজত্বে অর্ধেকের বেশি সেসব মানুষের কাছে পৌঁছার চেষ্টা করেননি, যারা কিনা তাকে ভোট দেননি। বিশ্বাস পাওয়ার জন্য তিনি ন্যূনতম কোনো পদক্ষেপ নেননি।

অন্যদিকে কভিড-১৯-এর ভয়াবহতাকে বুঝতে ট্রাম্পের দ্বিধাদ্বন্দ্বের কারণে অনেক রক্ষণশীল মানুষ এই সংকটকে এড়িয়ে গিয়েছে। উল্টো এটাই জোর দিয়ে বলা হয়েছে, ভাইরাস নিয়ে আতঙ্ক সৃষ্টি করছে ডেমোক্র্যাটরা, যেন ট্রাম্পের প্রেসিডেন্সির পতন ঘটানো যায়। এরপর অবশ্য ট্রাম্প নিজেই নিজেকে একজন যুদ্ধকালীন প্রেসিডেন্ট হিসেবে ঘোষণা করেন। সে সঙ্গে ঘোষণা দেন যে ইস্টারের মধ্য দিয়ে দেশকে তিনি আবার উন্মুক্ত করে দিতে চান। তিনি নিজেই জানান যে কোনো এপিডেমিওলজিক্যাল ভিত্তির ওপর নির্ভর করে এ সিদ্ধান্ত নেয়া হয়নি। তিনি করবেন, কারণ সময়টা মানুষ ভর্তি গির্জা দেখার জন্য খুব ‘সুন্দর’ হবে।

তবে শেষ পর্যন্ত মহামারীর পরিস্থিতিতে স্বৈরতন্ত্র অথবা গণতন্ত্র কোনটা বেশি ভালো, সেটি নিয়ে সত্যিকার অর্থে কোনো সিদ্ধান্তে আসা সম্ভব নয়। দক্ষিণ কোরিয়া ও জার্মানির মতো গণতান্ত্রিক দেশগুলো সংকট মোকাবেলায় এখন পর্যন্ত তুলনামূলকভাবে সাফল্য দেখিয়েছে। দিন শেষে তাই সরকারের ধরন কেমন তা খুব একটা গুরুত্বপূর্ণ নয়। বরং নাগরিকরা তাদের নেতাদের বিশ্বাস করে কিনা, তার ওপর নির্ভর করছে। পাশাপাশি এই নেতারা উপযুক্ত ও কার্যকর রাষ্ট্রের দিকে এগিয়ে যেতে রাজি আছেন কিনা, তার ওপরও নির্ভর করছে অনেক কিছু। দি আটলান্টিক থেকে সংক্ষিপ্ত ভাষান্তর

Print Friendly, PDF & Email