লক্ষ্মীপুরে জেলেপল্লীতে কর্ম নেই : সচেতনতাও নেই!

মো: রাকিব হোসেন রনি :

মার্চ-এপ্রিল দু’মাস অভয়াশ্রম মৌসুমে মেঘনা নদীতে সবধরনের মৎস্য আহরণ বন্ধ রেখেছে সরকার। অপরদিকে করোনা ভাইরাস রোধে স্থলভাগেও দোকানপাটসহ সকল কার্যক্রম বন্ধ। জলজ ও স্থলভাগ বন্ধ থাকায় কর্মহীন হয়ে পড়েছে লক্ষ্মীপুর মজুচৌধুরীর হাট নদীর পাড়ের ভাসমান জেলে সম্প্রদায়। নিষেধাজ্ঞার প্রায় ১ মাসেও বিজিএফ খাদ্য সহায়তা পায়নি তারা। এছাড়াও দুর্যোগ মুহুর্তে সরকারের বিশেষ বরাদ্ধের সহায়তাও এখনো পৌঁছেনি দৌড়গোড়ে। দিনমজুর এ জেলে পল্লীতে এখন শুধুই হাহাকার। করোনা প্রতিরোধে চারদিকে সচেতনতা বাড়লেও গুরুত্ব নেই ওই পল্লীতে। এতে করোনা সংক্রামণ ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকিতে রয়েছে এ অঞ্চল।

ভাসমান জেলে শাহ আলম (৩০)। নদীতে মাছ শিকার করেই ভাসমান নৌকায় পরিবারের বরণ-পোষণ চলে তার। নদীতে মৎস্য শিকার বন্ধ থাকায় কর্মহীন হয়ে পড়েছে সে। স্থলভাগে বিভিন্ন স্থানে দিনমজুরের কাজ করে চলতো পরিবারের ব্যয়। হঠাৎ করোনা ভাইরাস রোধে প্রশাসনের পক্ষ থেকে দোকানপাটসহ সবধরনের কার্যক্রম স্থগিত করায় অসহায়ত্ব সময় পার করছেন চার সন্তানের এ জনক। করোন প্রতিরোধে তার নৌকায় পরিষ্কার পরিচ্ছন্নাতা বা সচেতনতার কোন ছোয়া নেই। অভাবের চেয়ে করোনা ভাইরাস রোধে সচেতনতা অর্থহীন।
শুধু শাহ আলম নয়, নদীর পাড়ের ভাসমান জেলেপল্লীর শতাধিক পরিবার এখন খাদ্য ও কর্মহীন হয়ে পড়েছে। এ অবসর মূহুর্তে নৌকায়-নৌকায় আড্ডা ও সমাগম থাকায় ভাইরাস ছড়ানোর ঝুঁকিও রয়েছে তারা।
জানতে চাইলে ভাসমান জেলে শাহ আলম বলেন, বাজারে একদোকানে বাকীতে চাল, ডাল ও আলু নিয়ে স্ত্রী-সন্তানের মুখে জুটিয়েছি। কিন্তু সব বন্ধ থাকলে দোকানীরা বাকীও দিবে না। করোনা ভাইরাস রোধে সচেতনতার বিষয়ে জেনেছি। কিন্তু খাবারই জোটে না, হাতপা ধোয়ার সাবান, মাস্ক পাবো কই।

একই কথা বলেন ৫ সন্তানের জননী শাহেদা বেগম, তিনি বলেন, বাকীতে বাজার থেকে ১ বস্তা চাল এনেছি। আজ আলু ভর্তা ও ডাল দিয়ে সবার খাবার চলবে। কিন্তু বাকীদিন কিভাবে চলবে। জনপ্রতিনিধি বা সরকারের কেউই তাদের সচেতনতার জন্য পরিচ্ছন্নতার উপকরণ দেয়নি। এসব সচেতনতা বড়লোকের জন্য আমাদের জন্য নয়। মৃত্যু আসলে তো মরেই যেতে হবে।
জানা যায়, মার্চ-এপ্রিল দু’মাস ইলিশের প্রজনন মৌসুম হওয়ায় লক্ষ্মীপুর রামগতি আলেকজান্ডার ষাটনল থেকে চাঁদপুর পর্যন্ত ১০০ কিলোমিটার মেঘনা নদীতে সবধরনের মাছ ধরার উপর নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। এসময় লক্ষ্মীপুর সদর উপজেলার চর রমনি মোহন ইউনিয়নের মজুচৌধীরহাট ভাসমান জেলেরা মৎস্য শিকার থেকে বিরত থেকে স্থলভাগে দিনমজুরের কাজ করে এবং ঋণ করে সংসার চালায়। সরকারের পক্ষ থেকে তাদের (৪০ কেজি চাল) খাদ্য সহায়তা করা হয়। কিন্তু নিষেধাজ্ঞার প্রায় ১ মাসেও সরকারের খাদ্য সহায়তা পাইনি তারা। এদিকে মরনঘাতি করোনা ভাইরাস রোধে স্থলভাগসহ সবধরনের কার্যক্রম স্থগিত করায় সম্পূর্ণ ভাবে কর্মহীন হয়ে পড়েছে এসব জেলে।

স্থানীয় দু’জন ব্যক্তি জানান, ভাসমান জেলেরা খুবই দরিদ্র। সবসময় তাদের নৌকায় সমাগম করে বসবাস করতে হয়। সচেতন করার দায়িত্ব ইউনিয়ন পরিষদের জনপ্রতিনিধিদের। চেয়ারম্যান নিজই এলাকায় থাকেন না। থাকেন শহুরের বিলাস বহুল বাড়িতে। করোনা প্রতিরোধে নামমাত্র জীবানু নাশত মেডিসিন ছিটিয়ে ছবি তুলে তিনি চলে যান। জেলেপল্লীর খবর রাখার সময় কই তার।

এ ব্যাপারে সদর উপজেলার চর নমনি মোহন ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আবু ইউসুফ ছৈয়াল বলেন, জেলের বিজিএফ চাল এখনো খাদ্য গুদাম থেকে আনা হয়নি। জনসমাগম সৃষ্টি হবে তাই বিতরণ বন্ধ রাখা হয়েছে। তবে জেলে পল্লীতে জনসচেতনতার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি কোন সদত্তর দিতে পারেনি।

লক্ষ্মীপুর সদর উপজেলা পরিষদের নির্বাহী কর্মকর্তা শফিকুর রিদোয়ান আরমান শাকিল জানান, রেড ক্রিসেন্টকে সাথে নিয়ে করোনা রোধে জীবানু নাশক মেডিসিন ছিটানো হচ্ছে। করোনা রোধে অসহায়দের সরকারের বিশেষ বরাদ্ধ এসেছে। সদর উপজেলার ইউনিয়নগুলোর জন্য ২১ টন চাল ২ লাখ ১০ হাজার টাকা বরাদ্ধ দেওয়া হয়েছে। এছাড়াও পৌরসভার জন্য ৩ হাজার কেজি চাল ও ৩০ হাজার টাকা বরাদ্ধ দেওয়া হয়েছে। খুবদ্রুত সহায়তা অসহায়দেও মাঝে বিতরণ করা হবে।

Print Friendly, PDF & Email