‘খাদ্যসংকটই বড় ভীতি’

বিশ্বজুড়ে দুর্যোগ। থমকে আছে দুনিয়া। প্রাণঘাতী রোগ করোনা ভাইরাস আছে, তার প্রতিষেধক নেই। হু-হু করে বাড়ছে আক্রান্তের সংখ্যা। দীর্ঘ হচ্ছে লাশের সারি। পিতার সামনে সন্তানের মৃত্যু, লাশ ধরাছোঁয়াতেও মানা। তাই নিরাপদ থাকতে বেছে নেওয়া হচ্ছে সঙ্গরোধ। দেশে চলছে অঘোষিত লকডাউন। অতি প্রয়োজন ছাড়া সব মানুষকে ঘরে থাকার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

ছুটি চলছে সব ধরনের কর্মস্থলে। ধনী-গরিব সবাই হাত গুটিয়ে। জীবিকা নির্বাহের পথ বন্ধ। উল্টো চাহিদাপত্র দীর্ঘ হচ্ছে। বিশেষ করে খেটে খাওয়া মানুষের বড় অসময় এখন। যার সংখ্যা আড়াই কোটি। রাষ্ট্র তার দায়িত্ব পালন করছে। অর্থনীতির চাকা চালু রাখতে দিচ্ছে প্রণোদনা। সেবা প্রদানে গ্রহণ করছে নানা উদ্যোগ। সরকারের একার পক্ষে ভয়াবহ মহামারী মোকাবিলা সম্ভব নয়, তাই সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার আহ্বান জানানো হয়েছে।

এদিকে অতীতের মতো চলমান সংকটে ‘মানুষ মানুষের জন্য’ ব্রত নিয়ে যেমনটি একে অপরের পাশে দাঁড়াতে দেখা গেছে। এখন অসহায়দের পাশে তেমন মিলছে না অন্যদের দেখা।

বিশ্বব্যাংকের ‘পভার্টি অ্যান্ড শেয়ার প্রসপারিটি বা দারিদ্র্য ও সমৃদ্ধির অংশীদার-২০১৮’ শীর্ষক প্রতিবেদন অনুযায়ী গত বছরের শুরুতে বাংলাদেশে হতদরিদ্রের সংখ্যা ছিল ২ কোটি ৪১ লাখ। আর নিম্নমধ্যম আয়ের দেশ বিবেচনায় এই সংখ্যা ৮ কোটি ৬২ লাখ। দেশে জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেকই কোনো না কোনোভাবে সংকটাপন্ন। ইতোমধ্যে ত্রাণমুখী হয়ে পড়েছে তারা।
দেশে যখনই কোনো দুঃসময় আসে তখন মুনাফাখোর ব্যবসায়ী তাদের পণ্যের দরদাম বাড়িয়ে দেয়। মজুদ করে সংকট সৃষ্টি করে। ফলে বাজার থেকে উধাও হয় প্রয়োজনীয় পণ্যসামগ্রী। জীবন বাঁচানোর ওষুধসামগ্রীও মিলছে না।

চিকিৎসকরাই অনিরাপদে, সাধারণ সর্দি-জ্বরেও হাসপাতালে ভর্তি নিচ্ছে না, করোনা ভাইরাস পরীক্ষার সরঞ্জামাদি অপ্রতুল। আগে দাতাগোষ্ঠীরা শুরুতেই সাহায্যের হাত বাড়াত। এখন মিলছে শুধু প্রতিশ্রুতি। দানের অর্থ বা সামগ্রী হাতে মিলবে কবে তাও জানা নেই।

রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ড. এমাজউদ্দীন আহমদ তার পর্যবেক্ষণ মতে বলেন, এবারের দুর্যোগটা অনেক সময়ের চেয়ে ভিন্ন। বিশ্বযুদ্ধে যে ভয়াবহ পরিস্থিতি ছিল তার চেয়ে আরো ভয়াবহ রূপ নিতে পারে। করোনা ভাইরাসে ভীতির চেয়ে আমাদের বড় ভীতি খাদ্য সংকট। তাই শুধু সরকারই নয়, দেশের শেয়ারহোল্ডারদের নিয়ে এখনই দুর্যোগ মোকাবিলায় টাস্কফোর্স গঠনের পরামর্শ দিয়েছেন তিনি।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, কিছু স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন মাঠে আছে। তবে আন্দোলন, সংগ্রাম, নির্বাচন, সরকার গঠনসহ দেশ পরিচালনায় যাদের শক্তিশালী নেটওয়ার্ক সেই রাজনৈতিক দলগুলো এখনো রিহার্সেল দিচ্ছে এমন দুর্যোগে। নির্বাচন কমিশনের দেওয়া তথ্যমতে, দেশে রাজনৈতিক দলের সংখ্যা ১২০টির বেশি। তবে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির নেতৃত্বাধীন জোট রাজনীতির ছায়াতলেই প্রায় সবাই। নিবন্ধিত দলের সংখ্যা ৪১টি। প্রস্তুতি পর্বই শেষ করতে পারেনি অনেকে। তবে হাতেগোনা ২/১টি দলের অঙ্গ সংগঠন মাঠে কাজ করছে স্থানভেদে। অন্যরা হতদরিদ্রদের পাশে না থাকায় সাধারণ মানুষের ক্ষোভ বাড়ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাদের ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ ঘটাচ্ছেন।

রাজনৈতিক দলগুলোর দিকে অঙ্গুলি তুলে তারা বলছেন, ভোটের সময় ভোটারদের কদর করে, আন্দোলনের সময় কর্মীদের কদর করে। কিন্তু খারাপ সময়ে সাধারণ মানুষ তো দূরের কথা, নিজ দলের নেতাকর্মীদের খবর রাখছেন না দায়িত্বপ্রাপ্ত এসব নেতা।

সাবেক ও বর্তমান মন্ত্রী, এমপি, দলের শীর্ষ নেতাদের নিজ নিজ নির্বাচনী এলাকায় অবস্থানের দাবি করেছেন অনেকেই। সদ্য অনুষ্ঠিত ঢাকার দুই সিটি এবং শূন্য আসনে নবনির্বাচিত ও পরাজিত প্রার্থীদের হদিস পাচ্ছে না বলেও লিখেছেন অনেকেই।

আওয়ামী লীগ দলীয় সূত্রের তথ্যমতে, দলটির সভানেত্রী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তার দলের শীর্ষ নেতাদের মাঠে নামার নির্দেশ দিয়েছেন। শুধু ভোটের জন্য নয়, দুর্দিনে যেন তারা মানুষের ঘরে যায় তেমনটি বলা হয়েছে কেন্দ্রীয় পর্যায় থেকে। মাঠে নেই এমন নেতাদের তালিকাও চেয়েছেন তিনি।

এর আগে দলের তরফ থেকে করোনা প্রতিরোধে সচেতনতা বৃদ্ধি এবং দুস্থদের পাশে থাকতে কমিটি গঠন করেছে আওয়ামী লীগ। দলটির ২-৩টি অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের পক্ষ থেকে মাস্ক, সাবান, হ্যান্ড স্যানিটাইজারসহ কিছু পণ্য নির্দিষ্ট কিছু স্থানে বিতরণ করা হয়েছে।

২৭ মার্চ ১৪ দলের পক্ষে দেওয়া এক যৌথ বিবৃতিতে করোনা ভাইরাসের কারণে সৃষ্ট পরিস্থিতিতে শ্রমজীবী, গরিব ও দুঃখী মানুষের পাশে সাধ্য অনুযায়ী নেতা-কর্মীদের দাঁড়ানোর আহ্বান জানানো হয়েছে।

বিবৃতিতে বলা হয়, পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকার যথাসাধ্য চেষ্টা করছে। কিন্তু সরকারের একার পক্ষে সবকিছু করা সম্ভব না। তাই আসুন দৈনিক উপার্জনের ওপর নির্ভরশীল দরিদ্র মানুষদের পাশে দাঁড়াই।

এদিকে এখনো কোনো কমিটিই করতে পারেনি বিএনপি। দলের সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমান ও দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর দলীয় নেতাকর্মীদের পরস্পরের পাশে থাকার আহ্বান জানিয়েছেন। সাধারণ মানুষের পাশে থাকার জন্য প্রস্তুতি রাখতে বলেছেন।

এ দলটির ২-১টি অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠন রাজধানীতে মাস্ক, হ্যান্ড স্যানিটাইজার, সাবানসহ কিছু পণ্য বিতরণ করেছে। সাথে ছিল ফটোসেশনের ব্যবস্থাও।

জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান জি এম কাদের আহ্বান জানিয়েছেন তার দলের প্রতিষ্ঠাতা এইচ এম এরশাদ ৮৮-এর বন্যায় যেমনটি মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন তেমনি দাঁড়াব আমরা।। তবে তা আছে কথামালাতেই। জামায়াত বরাবরের মতো খোঁজ রাখছে শুধু নিজ দলের নেতাকর্মীদের। বড় দলগুলোর চিত্র এমন হলে অন্যদের অবস্থা জানতে বিশেষজ্ঞ হতে হয় না। তবে বাম রাজনৈতিক দলগুলো মানুষের কাছ থেকে অর্থ সংগ্রহে নেমেছে।

Print Friendly, PDF & Email