করোনায় করণীয় এবং সভ্যতায় স্মরণীয়

পৃথিবীর ১৯৫টি দেশের মধ্যে প্রায় সব কটি দেশেই ‘নভেল করোনা ভাইরাস’-এর প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে। এই দেশগুলোতে একযুগে ভাইরাস আক্রমণের বিষয়টি এখন আন্তার্জাতিক ক্রাইসিস হিসেবে পরিগণিত হচ্ছে। তবে সবচেয়ে দুঃখজনক এবং হাস্যকর বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে করোনা ইস্যুতে পৃথিবীর কোনো দেশে নিত্যপণ্যের দাম না বাড়লেও আমরা বাংলাদেশি বাঙালি হিসেবে পণ্যের দাম বাড়িয়েছি এবং মানুষকে কষ্ট দিয়ে মুনাফা লুটছি। যা সভ্য সমাজে স্মরণীয় হয়ে থাকারই কথা।

আবেগ-অভিমানের কথা না হয় পরে বলা যাবে, মূলকথা হচ্ছে, বিশ্ববাজারে নভেল করোনা ভাইরাস মোকাবিলায় আমাদের করণীয় ও অবস্থান।

২১ মার্চ টুইট বার্তার বরাদ্দ দিয়ে জাতীয় একটি দৈনিক পত্রিকায় প্রকাশিত এক রিপোর্টে বলা হয়েছে, ইরানের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র কিয়ানুশ জাহানপুর বলেন, ‘আমাদের তথ্যের ওপর ভিত্তি করে বলতে পারি, করোনা ভাইরাসে প্রতি ১০ মিনিটে ১ জনের মৃত্যু হচ্ছে এবং প্রতি ঘণ্টায় ৫০ জন করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হচ্ছে।

যুক্তরাষ্ট্রের জন হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকাশিত টালি থেকে জানা যায়, গত ডিসেম্বরে চীনের হুবেই প্রদেশের উহান শহর থেকে করোনা ভাইরাসের উৎপত্তি হয়। আর বর্তমানে প্রতি মুহূর্তে এর আক্রান্তর সংখ্যা হু হু করে বৃদ্ধি পাচ্ছে, বেড়ে চলেছে মৃত্যুর সংখ্যা।

এদিকে বাংলাদেশে ২৬ মার্চের তথ্য অনুযায়ী করোনায় আক্রান্ত ব্যক্তির সংখ্যা ৪৫ এবং মৃতের সংখ্যা ৫। অপরদিকে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন ১১ জন। করোনা আতঙ্কে বিশ্বের ১০০ কোটি শিশুর স্কুলে যাওয়া বন্ধ রয়েছে। এর মধ্যে বাংলাদেশে ৩ কোটি ৬৭ লাখ। করোনা ইস্যুতে সৃষ্ট আতঙ্ক এবং মুনাফাখোরদের অব্যাহত উল্লাসের বিষয়টি এখন সমাজের প্রান্তিক মানুষের সচেতনতায়, ‘গোদের উপর বিষফোড়া’ হয়ে দেখা দিয়েছে।

সেই শিশুকালে স্যারদের কাছে শুনেছি, পৃথিবীর কোনো সৃষ্টিই ধ্বংস হয় না, শুধু অবস্থার পরিবর্তন ঘটে। কাঠ পুড়ে ছাই হয়, ছাই মাটিতে মিশে মাটির উর্বরতা শক্তি বৃদ্ধি করে; গাছের পাতা মাটিতে পড়ে প্রথমে পচে যায় পরে শুকিয়ে যায়, এরপর মাটির ক্ষয়রোধ করে। বিজ্ঞান এমনটিই ব্যাখ্যা করে। একইভাবে নদী তার এক পাড় ভাঙে, অন্য পাড় গড়ে তোলে।

অর্থাৎ পৃথিবীর সবকিছুই পরিবর্তনশীল। একইভাবে রোগব্যাধি, জীবাণু তার অবস্থার পরিবর্তন, পরিবর্ধন করবে এটাই স্বাভাবিক। নতুন সৃষ্ট করোনা ভাইরাস কোথা থেকে, কীভাবে, কোন প্রাণী অথবা প্রকৃতির কোন জায়গা থেকে পরিবর্তন হয়ে সৃষ্টি হল, তা এখনো বিজ্ঞানীরা আবিষ্কার করতে পারেননি।

তবে নভেল করোনা ভাইরাস দ্বারা সৃষ্ট রোগটির নাম ‘কোভিড-১৯’ অর্থাৎ ‘কো’ এর পূর্ণরূপ ‘করোনা’, ‘ভি’ এর পূর্ণরূপ ‘ভাইরাস’ এবং ‘ডি’ এর পূর্ণরূপ ‘ডিজিস’ এবং ১৯ দ্বারা বোঝানো হয়েছে রোগটি ধরা পড়েছে ২০১৯ খ্রিষ্টাব্দে। রোগ আবিষ্কার করায় বৈজ্ঞানিক সমাজকে মানব মহলের আন্তরিক ধন্যবাদ প্রদানে কোনো কার্পণ্য নেই।

শৈশবকালের  মহান, আদর্শ ও প্রাজ্ঞ শিক্ষকদের কাছে জেনেছি, ‘ভাইরাস’ নাকি মানুষ কিংবা পশুপাখির দেহে প্রবেশের মাধ্যমে যেমন দেহের সচলকোষকে ধ্বংস করে মৃত্যু নিশ্চিত করে, তেমনি প্রাণ ও প্রাণীর মধ্যে প্রতিষেধক হিসেবে অবস্থান করে। প্রতিরোধ বা প্রতিষেধক ভাইরাসের বড় বৈশিষ্ট্য হলো পশুপাখির দেহে যে প্রতিষেধক ভাইরাস অবস্থান করে তাকে আমরা ‘অ্যানিম্যাল ভাইরাস’ বলে থাকি, আবার মনুষ্য দেহে যে ভাইরাস থাকে তাদের বৈজ্ঞানিক পরিভাষা ‘হিউম্যান ভাইরাস।’

ভাইরাস একটি জীবাণু, এই ভাইরাস যে বহন করে বা যার মাধ্যমে ছড়ায় তাকে আমরা ‘ব্যাক্টর’ বা ছত্রাক বলে থাকি। আমার এই বক্তব্য বা সংজ্ঞার কোনো বিজ্ঞানভিত্তিক ব্যাখ্যা আছে কিনা জানি না; তবে আমার শৈশবের শিক্ষক, যারা প্রকৃতিগত শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে আমাদের জ্ঞানদান করেছেন, তাদের এই ব্যাখ্যা আমার কাছে যৌক্তিক এবং বিজ্ঞানভিত্তিক বলে মনে হয়েছে।

বর্তমান সময়ের সঙ্গে অতীত স্মরণ করলে আমরা সবাই নির্দ্বিধায় বলতে পারি, একসময় এই উপমহাদেশে বা মহাদেশের প্রকৃতির জলে-স্থলে, পাহাড়-জঙ্গলে, বন-বাদাড়ে বহুজাতিক গাছগাছড়া যেমন ছিল, তেমনি পশুপাখির কলকাকলিতে মুখর হয়ে উঠত ওই সময়কার ভূস্বর্গ। পশুপাখির অভয়ারণ্য, সবুজ-শ্যামলের গাছগাছড়া, লতাগুল্ম,  জলজ ও স্থলজ কীটপতঙ্গ, পরিবেশসম্মত ব্যবহার্য নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যাদি আজ কোথায়? মানবসমাজের নির্দয় আচরণেই পৃথিবীর অস্বাভাবিক পরিবর্তন ঘটে চলছে।

একসময় রোগবালাই বলে জেনেছি, ‘কলেরা-ডায়রিয়া’, ‘গুটিবসন্ত’, ‘যক্ষ্মা’ সর্বোপরি শুনেছি ‘প্লেগ’ রোগ। যে রোগটি ইঁদুরের মাধ্যমে ছড়িয়েছে। এ যুগে ওই সব রোগের প্রতিষেধক ও চিকিৎসা এখন হাতের কাছে।  বর্তমান বিশ্বে এমন দেশ রয়েছে যারা সাপ, কুকুর, বাদুড়, বানর, বিড়াল, হনুমান, শামুক, ঝিনুকসহ সব রকম কীটপতঙ্গ ভক্ষণ করছে। আর যারা এগুলো ভক্ষণ করছে না, তারা এ ধরনের জীববৈচিত্র্য অবাধে মেরে ফেলছে এবং এগুলো যেখানে-সেখানে ফেলে দিচ্ছে।

এ ছাড়া সবুজ বৃক্ষরাজি নির্বিচারে কেটে ফেলছে, ফলে অ্যানিম্যাল ভাইরাস বাতাসে মিশে যাচ্ছে, বাতাসে যুক্ত হচ্ছে অপরিকল্পিত কালো ধোঁয়া। পৃথিবীর পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গেই জীবাণুর পরিবর্তন, রোগব্যাধি সৃষ্টি অস্বাভাবিক কোনো ঘটনা নয়। আমরা জানি, পৃথিবীর সব সৃষ্টিই একে অন্যের পরিপূরক। বিগত এক বছরের ব্যবধানে পৃথিবীর সভ্যতায় রোগের ধরন যেমন পরিবর্তিত হয়েছে, তেমনি রোগ প্রতিরোধ ও প্রতিষেধক এবং চিকিৎসা ক্ষেত্রের পরম উন্নতি ঘটেছে। সম্প্রতিকালের করোনা ভাইরাস অর্থাৎ নতুন সৃষ্ট ভাইরাসটি কারা সৃষ্টি করেছে?

উত্তর সোজাসাপ্টা এই ভাইরাস মনুষ্য দ্বারা সৃষ্ট এবং কোভিড-১৯ রোগটির জন্য পুরোপুরি দায়ী আজকের সভ্য পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ মানবকুল। জলবায়ুর আবহাওয়া অনুযায়ী পৃথিবীর ১৯৫টি দেশের জীববৈচিত্র্য ভিন্ন ভিন্ন। সব প্রাণের ভেতরে থাকা প্রতিরোধ বা প্রতিষেধক ভাইরাস আজ সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়ে নতুন ভাইরাস সৃষ্টি হয়েছে কি না, তা গবেষণালব্ধ আবিষ্কারের বিষয়। জীববৈচিত্র্য ধ্বংস, প্রকৃতির ওপর মনুষ্য সমাজের অস্বাভাবিক ও নির্মম আচরণেই এই নভেল করোনা ভাইরাস সৃষ্টি হয়েছে, এতে কোনো সন্দেহ থাকার কথা নয়।

নভেল করোনা ভাইরাসটি যদি কোন একটি দেশের অভ্যন্তরীণ সমস্যাই হবে, তবে তার ভিন্নতা খোঁজা কঠিন হতো। যখন এই বিষয়টি আন্তর্জাতিকভাবে সমানহারে বা মাত্রায় প্রচার হচ্ছে এবং দেখা দিচ্ছে, তখন নিশ্চিত বলা যায় নভেল করোনা ভাইরাস পরিবর্তনশীল পৃথিবীর জন্য অস্বাভাবিক কোনো বিষয় নয়। এটি স্বাভাবিক এবং ক্ষণস্থায়ী যা মোকাবিলায় সতর্ক এবং বিশ্ব নেতৃত্বের ঐক্যবদ্ধ সিদ্ধান্ত প্রয়োজন।

জীববৈচিত্র্য রক্ষা, মৃত পশুপাখি, কীটপতঙ্গ, ইঁদুর, বাদুড় মারা যাওয়ার পর তা মাটিতে পুঁতে রাখা এবং উচ্চ অ্যান্টিবায়োটিক খাবারদাবার বর্জন করা। এই মুহূর্তে পৃথিবীর সব যোগাযোগ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রেখে ভাইরাস মোকাবিলায় যা হচ্ছে তা বিশ্ব সভ্যতায়, সেই বানরের পিচ্ছিল বাঁশ আরোহণেরও নামান্তর।

আমরা স্বাভাবিক জ্ঞানে জানি, ভাইরাসের কোনো কোষ নেই, এই কোষহীন জীবাণু মানবদেহে প্রবেশ করে ওই দেহের কোষকে নির্জীব করে ফেলে, ফলে আক্রান্ত ব্যক্তি ধীরে ধীরে মৃত্যুর মুখে পতিত হয়। তেমনি ‘অ্যানিম্যাল ভাইরাস’ হিউম্যান বডিতে প্রবেশ করে না বলে জেনেছিলাম। এবার জানলাম ‘করোনা ভাইরাস’ শুধু হিউম্যান বডিতে আক্রমণ করে। এই ভাইরাসটি তৈলাক্ত, নভেল করোনা ভাইরাস বাতাসে ছড়ানোর কোনো সুযোগ নেই; জীবাণুটি পাত্র, বস্তু বা ভূমির উপরিভাগে অবস্থান করার সক্ষমতা রাখে, তবে ৬৭ ডিগ্রি তাপমাত্রায় তা শুকিয়ে যায়।

এ অবস্থায় কোনো পাত্র বা স্থানে হাত রাখলে এই জীবাণু হাতের মাধ্যমে শরীরে মুখ, নাক এবং চোখের মাধ্যমে প্রবেশ করতে পারে। ফলে ব্যবহার্য থালা-বাসন এবং যেখানে-সেখানে হাত লাগানোর পর হাত ক্ষার জাতীয় পদার্থ (সাবান) দ্বারা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখাই এই জীবাণু প্রতিরোধের বড় মাধ্যম।

বাস, ট্রাক, স্কুল, কলেজ বন্ধ, শহর-বন্দর লকডাউন বা সাটডাউন এগুলো নতুন সৃষ্ট নভেল করোনা ভাইরাসের মতোই পৃথিবীর মনুষ্যসৃষ্ট মহাআতঙ্ক বলেই মনে হচ্ছে, যা আন্তর্জাতিক আইনে কী হতে পারে জানা নেই, তবে দেশের প্যানাল কোড-৫০৫/খ ধারা অনুযায়ী অপরাধের শামিল। অপরদিকে সংক্রামক রোগপ্রতিরোধ, নিয়ন্ত্রণ ও নির্মূল আইন-২০১৮ অনুযায়ী ভাইরাস আক্রান্ত ব্যক্তি কোয়ারেন্টাইন কিংবা আইসোলেশন চিকিৎসায় অবহেলা করলে তাকে এবং তার পরিবারকে জেল ও জরিমানা করার বিধান রয়েছে।

প্রায় ৬০০ কোটি মানুষের এই পৃথিবীতে ২৬ মার্চ পর্যন্ত ৫ লাখের বেশি মানুষ করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত। মারা গেছে ২২ হাজারের বেশি মানুষ এবং মৃত্যুঝুঁকিতে রয়েছে আরও ১৮ হাজারের বেশি মানুষ।

তবে এই রোগের আতঙ্কে সারা পৃথিবীর সব মানুষ যেভাবে মানসিকভাবে আক্রান্ত হয়েছে, তা মহামারীর নামান্তর বলেই মনে হচ্ছে। ভারতে কারাগারে কয়েদিদের সঙ্গে কারারক্ষীদের সংঘর্ষ হয়েছে, বাংলাদেশে করোনার পক্ষ-বিপক্ষের মধ্যে সংঘর্ষে একজন খুন হয়েছে। এ কিসের লক্ষণ! ভাইরাস সৃষ্টি হলো চীনের হুবেই প্রদেশের উহানে, তা গেঁড়ে বসল ইতালিতে!
নভেল করোনা ভাইরাস প্রতিরোধে একশ্রেণির মানুষ পৃথিবীর মনুষ্যকুল রক্ষায় যখন উদ্বিগ্ন, এই অবস্থায় ইস্যুটিকে কেন্দ্র করে ফায়দালোটা, ষড়যন্ত্র, বিশ্বের সক্ষমতা যাচাইয়ের যোগ-বিয়োগ হবার আন্তর্জাতিক মারপ্যাঁচ চলছে বলে বিবিসির এক প্রতিবেদনে ইঙ্গিত করেছে। করোনা ভাইরাস প্রতিরোধে এবং পরিস্থিতি স্থিতিশীলকরণে বিশ্বমানবতার ঐক্যবদ্ধ জেগে ওঠা এখন সময়ের দাবি।

লেখক : শিক্ষক ও নাট্যকার

Print Friendly, PDF & Email