আমাদের দেশের প্রেক্ষাপট অন্য অনেক দেশের থেকে একটু ভিন্ন

করোনা এখন বৈশ্বিক আতঙ্কের নাম। ইতিমধ্যে ১৯৯টি দেশ এ ভাইরাসে আক্রান্ত। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা অনেক পূর্বেই একে বিশ্ব মহামারী হিসাবে ঘোষণা দিয়েছে।

ডিসেম্বরের শেষের দিকে এটি চীনে ব্যাপক আকারে ছড়িয়ে পড়ে। প্রথমে একে নিয়ে খুব একটা উদ্বিগ্ন হতে দেখা যায়নি অনেক দেশকে। যখন চীনে মৃত্যুর মিছিল দীর্ঘ হতে থাকলো তখন সমগ্র বিশ্ব নড়েচড়ে বসলো।

চীন বিশ্ব অর্থনীতির অন্যতম মূল কারিগর। সমগ্র বিশ্বের সঙ্গেই তার যোগাযোগ। তাই রোগ ছড়িয়ে পড়া কঠিন বিষয় ছিল না। হলও তাই।

আমাদের দেশ প্রথম থেকেই গভীর মনোযোগ দিয়ে সার্বিক পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করছিল। কি কি প্রস্তুতি নেওয়া যায় তার পরিকল্পনায় বেশ কয়েকটি সরকারি প্রতিষ্ঠান জড়িত ছিল। আমাদের দেশের প্রেক্ষাপট অন্য অনেক দেশের থেকে একটু ভিন্ন।

আমাদের দেশের অনেক মানুষ দেশের বাইরে নানা পেশায় জড়িত। তাদের পাঠানো অর্থ আমাদের দেশের অর্থনীতির অন্যতম খুঁটি। বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে খারাপ হতে থাকলে পৃথিবীর নানা প্রান্তর থেকে তাদের আগমন শুরু হয়। কোনও দেশের নাগরিককে জোর পূর্বক দেশে প্রত্যাবর্তন করতে না দেওয়াটা আইন পরিপন্থী।

তবে প্রথম দিকে চীন থেকে শতাধিক মানুষকে নিয়ে আসার পর স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় চীনে অবস্থিত বাকিদের নিরাপত্তা ও সামগ্রিক অবস্থা বিশ্লেষণ করে তাদের সেখানেই অবস্থানের পরামর্শ দিয়েছিল। যাইহোক, যেভাবেই হোক বাকিদের ক্ষেত্রে সেটা নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি।

একেবারে নতুন ধরনের বলে এই ভাইরাসে নাম প্রথমে দেওয়া হয়েছিল নভেল করোনাভাইরাস। কোনও ধরনের গবেষণা না থাকায় এর ব্যাপারে বিস্তারিত কিছু জানা যাচ্ছে না। তবে প্রাথমিক অবস্থায় ধারণা করা হয়েছিল শীত প্রধান দেশে এর প্রাদুর্ভাব বেশি। তবে সেটি মিথ্যা প্রমাণিত হয় যখন ইরানে এটি মহামারী আকার ধারণ করে।

ইরানের সঙ্গে আমেরিকার সম্পর্ক ভালো না থাকায় চীন তাদের বেশ ঘনিষ্ঠ। এটাই কাল হয়েছে তাদের জন্য। তারা বিমান যোগাযোগ বন্ধ করেনি সম্পর্ক অবনতির আশঙ্কায়।

এমনকি ইরান সরকারের উচ্চ মহল এও দাবি করেছিল তাদের দেশে করোনা সুবিধা করতে পারবে না। তাদের বিজ্ঞানীদের বারবার সাবধানতাকে অবজ্ঞা করে তারা চীনা নাগরিকদের যাতায়াত সমগ্র দেশে বন্ধ করেনি। তাই ১৯ ফেব্রুয়ারির পূর্বে যেখানে তাদের দেশে করোনা আক্রান্তের কোনও নজির তারা দেখায়নি সেখানে সেই দিন একই সঙ্গে দুজনের মৃত্যুর কারণি হিসাবে তারা প্রকাশ করে করোনা।

সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতার হাতে চুম্বন করে তারা ভক্তি প্রকাশ করে, সেটা তারা বন্ধ করেছিল ঠিকই নিরাপত্তার কথা চিন্তা করে কিন্তু দেশের নাগরিকদের সেই নিরাপত্তা তারা নিশ্চিত করেনি। মানুষ যাতে বেশি ভয় না পায় এর জন্য পরীক্ষার ব্যবস্থা করেছিল ঢিলেভাবে। কারণ তাদের দেশে খুব সাম্প্রতিক সময়ে কিছু রাজনৈতিক অস্থিরতা হয়েছিল সেদিকে খেয়াল রেখে। ফলাফল তাদের দেশ এখন করোনার অন্যতম মৃত্যুর স্থান। ছড়িয়েছে সমগ্র দেশে, এমনকি মূল শহর থেকে ১৬৫ কিমি দূরের জনগোষ্ঠীতেও।

চীনের সঙ্গে খুব কম সময়ের মাঝে দক্ষিণ কোরিয়াতেও করোনা শুরু হয়েছিল কিন্তু তারা এখন বিশ্বের বুকে উদাহরণ।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এখন অনেক দেশকে তাদের অনুকরণ করতে বলছে সফলতার জন্য সঙ্গে মৃত্যুর সংখ্যা কমানোর জন্য। কী করেছিল তারা?

১) দুর্যোগ শুরুর পূর্বেই ব্যবস্থা গ্রহণ- তাদের নীতিনির্ধারকরা প্রথমেই অনুমান করতে পেরেছিল কী হতে পারে? সেই মোতাবেক তারা তাদের সব মেডিকেল কোম্পানিকে ডেকে নির্দেশ দান করে করোনা টেস্ট করার কিট বের করার জন্য। কিট তৈরি করতে তাদের সময় লেগেছিল সাপ্তাহ খানেক, এরমাঝে রোগীর সংখ্যা বৃদ্ধি পেলেও কিট বাজারে আসার পর তারা গন পরীক্ষার মাধ্যমে সেটার নাগাল টেনে ধরে। তারা বর্তমানে দিনে ১ লাখ কিট উৎপাদনে সক্ষম এবং ১৭টি দেশের সঙ্গে তারা আলাপ করছে রফতানি করার জন্য যেহেতু তাদের কিট সফল কার্যকরী হিসাবে প্রমাণিত।

তাদের বিজ্ঞানীদের মতে, করোনাভাইরাসের ইনকিউবেশান পিরিয়ড ৫ দিন (রোগ ছড়ানোর সময়), এরপর ঠাণ্ডা ভাব থাকলেও সেই সময়েও একজন আরেকজনকে আক্রান্ত করতে পারে। এই এক সপ্তাহের মাঝে তাকে চিহ্নিত করা গেলে রোগ ছড়ানোটা খুব সহজেই আটকে রাখা যায়। তাই তাদের ভাইস হেলথ মিনিস্টার কিম গ্যাং লিপ লকডাউন, আইসোলেশান কে অপ্রয়োজনীয় হিসাবেই বলেছেন। সত্যিই তারা লকডাউন করা ছাড়াই সফলভাবে একে সামলাতে পেরেছে। কারণ লকডাউন দেশের অর্থনীতির ওপর বিশাল আঘাত যেকোনো দেশের প্রেক্ষাপটেই।

২) দ্রুত পরীক্ষা করা এবং সবার করা-

তারা তাদের দেশের সব জায়গায় টেস্ট করার জন্য মোবাইল ভ্যান নামিয়েছিল যার মাধ্যমে তারা দিনে ৩ লাখের কাছাকাছি টেস্ট করেছিল যা যুক্তরাষ্ট্রের হিসাবের চেয়ে ৪০ গুণ বেশি।

প্রতি জনের জন্য কিছু প্রশ্ন তৈরি করেছিল, তাপমাত্রা মাপার সঙ্গে সঙ্গে নাকের থেকে সোওয়াব নিয়েছিল যা সব মিলিয়ে ১০মিনিতে সম্পন্ন করার মত ছিল। রেজাল্ট তারা সরবারহ করতো ১ ঘণ্টার ভিতর। এতেই দেশের জনগন উৎসাহিত হয় টেস্ট করার বিষয়ে।

৩) ঝুঁকিপূর্ণ ব্যক্তি চিহ্নিতকরণ ও তাদের পৃথকীকরণ-

MESR এর ঝুঁকির পর থেকে তারা বেশ কিছু কাজ করেছিল যার মধ্যে রয়েছে তাদের মোবাইল কোম্পানিগুলোকে এই সংক্রান্ত কাজে নিবেদিত করার জন্য আধুনিক করা। টেস্ট রেজাল্ট তারা মোবাইল কোম্পানির মাধ্যমে জানিয়ে দিয়েছিল, আশাপাশের ব্যক্তিরাও জানতে পারতো কত দূরে একজন জীবাণুবাহী রয়েছেন, কোন পথ নির্বাচন করা সঠিক হবে ইত্যাদি। প্রতি মিনিটে মিনিটে ম্যাসেজ দিয়ে তারা জনগণকে জানিয়ে দিয়েছিল কি করণীয়।

তথ্য প্রযুক্তির ব্যবহারে সিঙ্গাপুর বেশ সফল, তারা ঝুঁকিপূর্ণ বাহক খোঁজে বের করার কাজে মোবাইল অ্যাপস তৈরি করেছে। সেই অ্যাপস Bluetooth এর মাধ্যমে কোনও ব্যক্তি যদি কোনও করোনা বাহকের নির্দিষ্ট দূরত্বে আসে তাহলে তা রেকর্ড করে রাখতে পারে। সেই অনুযায়ী কেন্দ্রীয় সরকার তাকে সহজেই খোঁজে বের করে পারে পরবর্তীতে।

৪) জনগণকে সার্বিক অবস্থা জানান দেওয়া-

সব তথ্য সময় মত জানতে পারাতে জনগণ স্বঃতস্ফূর্তভাবে অংশগ্রহন করে মহামারী মোকাবেলায়। তথ্য না জানা থাকলে সিদ্ধান্ত নেওয়া যে কারও জন্যই কঠিন সেই যেই রাষ্ট্রের নাগরিক হোক না কেন।

দক্ষিণ কোরিয়া মডেল কি অনুকরণ করার মত?

কিছুটা ব্যায়বহুল ও প্রযুক্তি নির্ভর বিধায় অনেক দেশ সন্ধিহান এভাবে প্রয়োগ করা সম্ভব কিনা। তবে তাদের চেয়ে সমৃদ্ধশালী পাঁচটি দেশের অবস্থা বর্তমানে বেশ নাজুক এতো রিসোর্স থাকার পরও। সময় ফুরাবার পূর্বেই আমাদেরও চিন্তা করতে হবে আমরা কোন পথে হাঁটবো? লকডাউন করে দেশের অর্থনীতির চাকা স্থিমিত করা নাকি প্রজুক্তির মাধ্যমে সমাধানের রাস্তা বের করা।

লেখক: ডা. আশরাফুল হক

ব্লাড ট্রান্সফিউশন বিশেষজ্ঞ

সহকারী অধ্যাপক, শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইন্সটিটিউট, ঢাকা

Print Friendly, PDF & Email