করোনা উপসর্গ নিয়ে বাড়ছে মৃত্যু

দেশে করোনা ভাইরাসে মৃত্যু ও আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ছে। এক, দুই করে সর্বশেষ গত রোববার পর্যন্ত এ ভাইরাসে তিনজন মারা গেছেন বলে স্বীকার করেছে সরকারের সংশ্লিষ্ট সংস্থা।

কিন্তু করোনা ভাইরাস ও ভাইরাসের লক্ষণ নিয়ে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে মৃত্যুর ঘটনায় এ সংখ্যা আরো বেশি বলে ধারণা করছে সাধারণ মানুষ।

সোমবার (২৩ মার্চ) সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) আনুষ্ঠানিক সংবাদ ব্রিফিংয়ে জানানো হয়, এ পর্যন্ত করোনা ভাইরাসে তিনজনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে ৬ জন নতুন আক্রান্তের মধ্যে একজন চিকিৎসক ও দুজন নার্স রয়েছেন। সরকারি হিসেবে মোট ৩৩ জন আক্রান্ত হয়েছেন।

এদিকে করোনা ভাইরাস ও ভাইরাসের লক্ষণ নিয়ে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে মৃত্যুর ঘটনায় এ সংখ্যা আরো বেশি বলে মনে করছে অনেক সাধারণ মানুষ। কিন্তু করোনা ভাইরাস শনাক্ত করার ব্যবস্থার সংকট থাকায় এসব মৃত্যুকে করোনা সংক্রান্ত বলে সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে সময় লাগছে।

ফলে স্থানীয় পর্যায়ের চিকিৎসক ও প্রশাসন করোনায় মৃত্যু বললেও যথাযথ পরীক্ষা-নিরীক্ষা না হওয়ায় সেসব মৃত্যুকে এখনই করোনায় মৃত্যু বলে ঘোষণা দিচ্ছে না সরকারের স্বাস্থ্য বিভাগ।

এদিকে সোমবার পর্যন্ত সরকারিভাবে তিনজনের মৃত্যুর তথ্য দেওয়া হলেও স্থানীয় পর্যায়ে করোনা ভাইরাসের লক্ষণ নিয়ে বেশ কয়েকটি মৃত্যুর তথ্য পাওয়া গেছে। এর মধ্যে কিশোরগঞ্জের ভৈরব উপজেলায় ইতালিফেরত এক বৃদ্ধ, সিলেটে যুক্তরাজ্যফেরত এক বৃদ্ধা, খুলনায় করোনা উপসর্গ নিয়ে ভারত ফেরতসহ দুজনের মৃত্যুকে প্রাথমিকভাবে করোনা বলে জানিয়েছেন স্থানীয় চিকিৎসকরা।

অন্যদিকে মৌলভীবাজারসহ বেশ কয়েকটি স্থানে বিদেশ ফেরতদের মৃত্যুতে নড়েচড়ে উঠছে স্থানীয় প্রশাসন। মৃতদের পরিবার ও তাদের এলাকায় স্থানীয়দের কোয়ারেন্টিনের ব্যবস্থা নিয়েছেন সংশ্লিষ্ট প্রশাসন।

সোমবার (২৩ মার্চ) ভৈরব উপজেলায় করোনা ভাইরাস প্রতিরোধ কমিটির সদস্য সচিব ও উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. বুলবুল আহমেদ জানান, ইতালি ফেরত ষাটোর্ধ্ব এক প্রবাসী রোববার রাত সাড়ে ১০টার দিকে শ্বাসকষ্ট নিয়ে শহরের আবেদীন হাসপাতালে যান। চিকিৎসক তাকে আইসোলেশন সেন্টারে যেতে বলেন। তার স্বজনরা তাকে সেখানে না নিয়ে ডক্টরস চেম্বার নামের একটি বেসরকারি হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখানে রাত ১১টার দিকে তার মৃত্যু হয়। পরে স্বজনরা তাকে বাড়িতে নিয়ে যায়।

উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা আরো জানান, ঢাকা থেকে নমুনা সংগ্রহের জন্য রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) প্রতিনিধিরা ভৈরবে এসেছেন। নমুনা সংগ্রহ করছেন।

এ মৃত্যুকে করোনো হিসেবে ঘোষণা দেওয়া না হলেও উপজেলা প্রশাসন মৃত ব্যক্তির চারপাশের ১০টি ঘর এবং চিকিৎসা নেওয়া দুটি বেসরকারি হাসপাতালের মানুষের চলাচল সীমিত করেছে। ঘটনার রাতে দুই হাসপাতালে যারা কর্মরত ছিলেন, তাদের হাসপাতালের ভেতরেই অবস্থান করতে বলা হয়েছে।

এদিকে সিলেটে শনিবার দিবাগত রাত সাড়ে ৩টার দিকে আইসোলেশনে থাকা যুক্তরাজ্যফেরত ষাটোর্ধ্ব আরেক নারী মৃত্যুবরণ করেছেন। সিলেট শহীদ শামসুদ্দিন আহমদ হাসপাতালে করোনাভাইরাস ‘সন্দেহে’ তিনি আইসোলেশনে ছিলেন।

সিলেটের সিভিল সার্জন ডা. প্রেমানন্দ মণ্ডল জানান, রোববার ঢাকা থেকে আইইডিসিআরের প্রতিনিধিরা সিলেটে এসে তার রক্তের নমুনা সংগ্রহ করার কথা ছিল। তবে এর আগেই যুক্তরাজ্যফেরত ওই নারী মারা যান।

হাসপাতালে তার চিকিৎসায় নিয়োজিতদের সূত্রে জানা গেছে, নগরীর শামীমাবাদ এলাকার বাসিন্দা ওই নারী গত ৪ মার্চ লন্ডন থেকে দেশে ফেরেন। ১০ দিন ধরে জ্বর, সর্দি, কাশি ও শাসকষ্টে ভুগছিলেন তিনি।

এদিকে গত ১৯ মার্চ জ্বর, গলাব্যথা, কাশি, শ্বাসকষ্ট নিয়ে খুলনায় দুজনের মৃত্যু হয়েছে। তাদের মধ্যে একজন সম্প্রতি ভারত থেকে দেশে ফিরেছিলেন।

খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক এ টি এম মঞ্জুর মোর্শেদ বলেন, মৃত ওই দুজনের শরীরে করোনাভাইরাসের উপসর্গ ছিল। তাদের মধ্যে একজন ভারত থেকে এসেছেন। কিন্তু করোনা পরীক্ষার কোনো ব্যবস্থা না থাকায় তাদের করোনা হয়েছিল কি না, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি। তিনি বলেন, ঢাকার বাইরে কোথাও করোনা ভাইরাস পরীক্ষার ব্যবস্থা নেই। এ কারণে চিকিৎসকেরাও আতঙ্কে।

ওই রোগীর সঙ্গে থাকা বড় বোন অভিযোগ করেন, পাঁচ দিন ধরে জ্বর ও সর্দি-কাশিতে ভুগছিলেন তার ভাই। এসব শুনে একবার জরুরি বিভাগ থেকে বহির্বিভাগ তারপর আবার জরুরি বিভাগে পাঠানো হলেও তাকে কোনো চিকিৎসক দেখেননি।

ওই দুই ব্যক্তি করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন সন্দেহ করে তাদের স্বজনদের কোয়ারেন্টিনে থাকার পরামর্শ দিয়েছেন চিকিৎসকরা।

মাস দুয়েক আগে যুক্তরাজ্য থেকে মৌলভীবাজারে আসা এক প্রবাসী নারী রোববার মৃত্যুবরণ করার পর আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। করোনা সন্দেহে গতকাল সোমবার বিকেলে প্রশাসনের পক্ষ থেকে তার বাড়িসহ এলাকার পাঁচটি বাড়িকে কোয়ারেন্টিন করা হয়েছে।

এদিকে সোমবার দুপুর দুটার দিকে পৌর শহরে ওই নারীর বাড়িতে সিভিল সার্জন তওহীদ আহমদসহ পুলিশের সদস্যরা যান। সিভিল সার্জন কার্যালয় থেকে সন্দেহ করা হচ্ছে ওই নারীর শরীরে করোনা ভাইরাস সংক্রমণ হয়ে থাকতে পারে। এই সন্দেহে ওই এলাকার পাঁচটি বাড়িকে হোম কোয়ারেন্টিন করে দেয়ালে স্টিকার লাগিয়ে দেওয়া হয়।

তবে এসব মৃত্যুর ঘটনায় স্থানীয় চিকিসকরা এসব মৃত্যু করোনা সংক্রান্ত হিসেবে চিহ্নিত করলেও সরকারিভাবে ঘোষিত মৃত্যুর তথ্য এদের হিসেব করা হয়নি।

এ বিষয়ে আইইডিসিআরের মুখপাত্র অধ্যাপক মীরজাদী সাব্রিনা ফ্লোরা বলেছেন, আইইডিসিআরের পরীক্ষা-নিরীক্ষায় যাদের করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যু নিশ্চিত হওয়া গেছে শুধু তাদের হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। এ ছাড়া যাদের করোনা সন্দেহ করা হচ্ছে তাদের সাংক্রমণের বিষয়টি নিশ্চিত হতে নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে। তাদের করোনা নিশ্চিত হলে জানানো হবে।

এর আগে রাজধানীতে করোনায় আক্রান্ত হয়ে পরপর তিনজনের মৃত্যু হয়েছে। শনিবার ও রোববার পরপর দুদিনে মিরপুরের একই এলাকার দুজনের মৃত্যুর ঘটনায় যেমন নড়েচড়ে বসেছে প্রশাসন তেমনি আতঙ্কে প্রহর কাটাচ্ছে এসব এলাকার মানুষ।