ওষুধের লাগামহীন মূল্য বৃদ্ধিতে দিশেহারা লক্ষ্মীপুরের মানুষ

রায়পুর (লক্ষ্মীপুর) প্রতিনিধি :

ওষুধ, জীবনকে বাঁচাতে, জীবনকে সাজাতে। একটি ওষুধ কোম্পানীর এই বিজ্ঞাপনটি যথার্থ। তবে ওষুধের লাগামহীন মূল্য বৃদ্ধিতে দিশেহারা হয়ে পড়েছে ভূক্তভোগীরা। জীবন বাঁচাতে ওষুধের কোন বিকল্প নেই এটা আমরা সবাই জানি। তবে সম্প্রতি ওষুধের লাগামহীন মূল্য বৃদ্ধিতে দিশেহারা হয়ে পড়েছে স্বল্প আয়ের মানুষ। ডাল-ভাত যাই জুটুক তাই দিয়েই খেয়ে মানুষ তার ক্ষুধা নিবারণ করে থাকে। কিন্তু অসুস্থ হলে ওষুধ খেতেই হবে। তাতে দাম যাই হোক না কেন। ধার দেনা করে বা যেভাবেই হোক ওষুধ কিনতে প্রাণপণ চেষ্টা করে থাকে অসুস্থ ব্যক্তির পরিবার।

গত এক বছর ধরে লক্ষ্মীপুর জেলায় ওষুধের এমন অস্বাভাবিক মূল্য বৃদ্ধিতে স্বল্প আয়ের মানুষ যেন দিশেহারা হয়ে পড়েছে। বিশেষ করে যে পরিবারে গ্যাষ্ট্রিক, ডায়াবেটিকস্ আর ব্লাডপ্রেসারের রোগী আছে সেই পরিবার খুব অনুভব করতে পারছে কি হারে দাম বেড়েছে ওষুধের। বাংলাদেশের প্রায় সকল ওষুধ কোম্পানীর ওষুধের দাম অতিমাত্রাই বৃদ্ধি পেয়েছে।

ওষুধের গায়ের দাম অনুযায়ীই দাম ধরা হচ্ছে বিক্রেতাদের কাছে। আগে ৮% থেকে ১০% কমিশন দিয়ে ওষুধ বিক্রি করা হতো। কিন্তু বর্তমানে ওষুধের ব্যবসায়ীরা গায়ের দাম যা লেখা আছে তা কড়ায় গন্ডায় আদায় করে নিচ্ছে। এতে একদিকে বেশী লাভবান হচ্ছে ব্যবসায়ীরা অন্যদিকে ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে রোগী ও ওষুধ ক্রেতারা।

রায়পুর উপজেলায় লক্ষ্মীপুর জেলার শাখা কেমিস্টস্ এন্ড ড্রাগিস্টস্ সমিতির বেঁধে দেওয়া নিয়মে ওষুধ বিক্রি করতে ফার্মেসিগুলোকে বাধ্য করা হচ্ছে। এ নিয়ে মানুষের মধ্যে বিরাজ করছে অসন্তোষ। জানা যায়, ৭ মার্চ হতে রায়পুরের বিভিন্ন ফার্মেসিতে আগের ৮ বা ১০ শতাংশ কমিশনে ওষুধ বিক্রি বন্ধ করে দেন বিক্রেতারা। পরে তারা কোম্পানির এমআরপি রেটে বিক্রি শুরু করে। এতে অনেকটা নাভিশ্বাস ওঠেছে দরিদ্র ক্রেতাদের। ফলে বেশী লাভবান হচ্ছে ব্যবসায়ীরা অন্যদিকে ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে রোগী ও ওষুধ ক্রেতারা।

অনেক ব্যবসায়ী বলেন আমরা গরীব রোগীদের কথা চিন্তা করে ক্ষেত্র বিশেষ ৮% থেকে ১০% কমিশন ছাড় দিতাম। কিন্তু বর্তমানে লক্ষ্মীপুর জেলার শাখা কেমিস্টস্ এন্ড ড্রাগিস্টস্ সমিতির বেঁধে দেওয়া নিয়মের কারণে ইচ্ছা থাকা স্বত্ত্বেও কোন কমিশন দিতে পারছিনা। নির্ধারিত মূল্য থেকে কিছু অংশ ছাড় দেওয়াটা মানবিক বিষয়। অনেক ব্যবসা-ই ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, আমরা যদি নির্ধারিত মূল্যের অতিরিক্ত না নেই এবং আমাদের লাভের অংশ থেকে যদি কিছু কমিশন ছাড় দেই তবে সমিতির কি ক্ষতি তা আমাদের বোধগম্য নয়।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, দোকানদাররা বাংলাদেশ কেমিস্টস্ এন্ড ড্রাগিস্টস্ সমিতির লক্ষ্মীপুর জেলা শাখার সভাপতি উত্তম কুমার দেবনাথের স্বাক্ষরিত নির্দেশিত সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে ক্রেতাদের কাছে ওষুধের গায়ের রেট অনুযায়ী দাম আদায় করে নিচ্ছে। ক্রেতারা অভিযোগ করেন, ওষুধের দোকানে ওষুধ ক্রয় করতে গেলে ওষুধের দাম সরকারী নির্ধারিত দামে বিক্রি করা হচ্ছে বলে জানান। বেশি কথা বললে টাঙানো সাইনবোর্ডে “সরকার নির্ধারিত মূল্যে ওষুধ বিক্রি করুন” এই লেখার দিকে ইঙ্গিত করেন। এ নিয়ে ক্রেতা-বিক্রেতাদের মধ্যে অনেক সময় বাকবিতন্ডাও শুরু হচ্ছে। রায়পুর বাজারে ওষুধ কিনতে আসা দেনায়েতপুরের বাসিন্দা হোসেন ভূঁইয়া বলেন, আমার ও আমার স্ত্রীর প্রতিমাসে ১০/১২ হাজার টাকার ওষুধ কিনতে হয়। সমিতির সভাপতি বাশার মিয়ার আগে রায়পুর বাজারের মেইন রোডে ওষুধের দোকান ছিল। এখন তিনি শহরের এক কোনায় নিজ বাড়ির নিচে কোনরকম সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে নামমাত্র একটি ওষুধের দোকান দিয়ে বসেন। এখন তার দোকানে পূর্বের ন্যায় ওষুধও নেই, ক্রেতাও নেই। তাই তিনি হিংসার বশঃবর্তী হয়ে ক্রেতারা যেন কমিশন না পায় সে ব্যাপারে উঠে-পড়ে লেগেছে। ক্রেতাদের ভাষ্য, ব্যবসায়ীরা যদি বিক্রয় মূল্যের অতিরিক্ত মূল্য না নিয়ে তাদের লভাংশ থেকে ৫%-১০% কমিশন ছেড়ে দেয় তাতেতো সাধারণ জনগণই উপকৃত হবেন, সমিতির এতে ক্ষতি কি?

এ বিষয়ে বাংলাদেশ কেমিস্টস্ এন্ড ড্রাগিস্টস্ সমিতির রায়পুর শাখার সভাপতি আবুল বাশার মীর জানান, এটি আমাদের সমিতির কেন্দ্র (ঢাকা) থেকে নির্দেশনা। গায়ের রেট অনুযায়ী ওষুধ বিক্রি করতে হবে ব্যবসায়ীদের। ওষুধের গায়ের মূল্যের বেশী বা কম মূল্যে ওষুধ বিক্রি করতে পারবেনা। কেউ কোন কমিশন দিতে পারবেনা, দিলে ওই ব্যবসায়ীকে ১ম বার ৫’শ টাকা, ২য় বার ১হাজার টাকা ও ৩য় বার ২হাজার টাকা জরিমানা দিতে হবে। জরিমানা নেওয়ার কোন আইনী বিধান তাদের আছে কিনা বা এ বিষয়ে তাদের কোন ম্যাজিষ্ট্রেসী ক্ষমতা আছে কিনা জানতে চাইলে তিনি এ বিষয়ে কোন সদউত্তোর না দিতে পেরে বিষয়টি বাংলাদেশ কেমিস্টস্ এন্ড ড্রাগিস্টস্ সমিতির সিদ্ধান্ত বলে সন্ব্য করেন।

লক্ষ্মীপুরের ড্রাগ সুপারেন্টেন্ড ফজলুল হক বলেন, কমিশন ছাড়ের বিষয়টি ওষুধ ব্যবসায়ীদের সমিতির বিষয়।

এদিকে ওষুধের এমন দাম বৃদ্ধির ব্যাপারে কোম্পানীদেরকে পুনরায় বিবেচনা করে, আগের মূল্য নির্ধারন করা ও কমিশন প্রথা চালু রাখার আহবান জানান ভুক্তভুগীরা। এ বিষয়ে রায়পুরের সর্বশ্রেণীর মানুষ আগের মূল্য নির্ধারণে ও কমিশন প্রথা বজায় রাখার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন।

Print Friendly, PDF & Email