বদলে যাচ্ছে সড়ক যোগাযোগের চিত্র

বদলে যাচ্ছে বাংলাদেশের সড়ক যোগাযোগের চিত্র। ছয় লেনের এক্সপ্রেসওয়ের যুগে প্রবেশ করছে দেশ। ছোটবড় যানের জন্য পৃথক লেন, লেন ধরে একদিকেই সব গাড়ির চলাচল, ক্রসিং এড়াতে উঠেছে ফ্লাইওভার, রয়েছে আন্ডারপাস- আধুনিক ট্রাফিক সুবিধার সঙ্গে দৃষ্টিনন্দন দেশের প্রথম এক্সপ্রেসওয়ে (ঢাকা-ভাঙ্গা) উদ্বোধন হবে আজ (বৃহস্পতিবার)।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আজ সকালে গণভবন থেকে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে নবনির্মিত এ এক্সপ্রেসওয়ে উদ্বোধন করবেন। এর মধ্য দিয়ে ঢাকার যাত্রাবাড়ী থেকে মাওয়া হয়ে ফরিদপুরের ভাঙ্গা পর্যন্ত মহাসড়কটি জনসাধারণের চলাচলের জন্য খুলে দেওয়া হবে।

পদ্মা সেতু হলে তার সর্বোচ্চ সুবিধা যাতে দেশের মানুষ পান, সেজন্য আধুনিক মহাসড়কের সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা রেখে নির্মাণ করা হয়েছে এ এক্সপ্রেসওয়ে। এর দুটি অংশ পদ্মা সেতুর মধ্য দিয়ে সংযুক্ত হবে, যা বর্তমানে নির্মাণাধীন। দেশের দীর্ঘতম পদ্মা সেতুর চার কিলোমিটার মূল সেতু নির্মাণে গত মঙ্গলবার ২৬তম স্প্যান বসানো হয়েছে। সেতুর নির্মাণ কাজ শেষ হয়ে গেলে ভাঙ্গা থেকে ঢাকা আসা-যাওয়ায় এক ঘণ্টারও কম সময় লাগবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

পদ্মার সেতুর সুবিধা নিতে এ এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণ সম্পর্কে সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেন, এটি ইউরোপের অনেক সড়ককে হার মানাবে। এটি বাংলাদেশের প্রথম এক্সপ্রেসওয়ে। দুদিকে সার্ভিস লেনসহ এ এক্সপ্রেসওয়ে ছয় লেনের। এ সড়ক নির্মাণে ১১ হাজার কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে। এখানে ৪৪টি কালভার্ট, ১৯টি আন্ডারপাস, চারটি বড় সেতু, ২৫টি ছোট সেতু, পাঁচটি ফ্লাইওভার, দুটি ইন্টার চেইন, চারটি রেলওয়ে ওভারপাস রয়েছে।

মহাসড়কটি এশিয়ান হাইওয়ে করিডোরের অন্তর্ভুক্ত। সড়ক ও জনপদ অধিদপ্তরের তত্ত্বাবধানে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ২৪ কনস্ট্রাকশন ইঞ্জিনিয়ারিং ব্রিগেড এ প্রকল্প বাস্তবায়নের দায়িত্বে রয়েছে।

স্থানীয় ও ধীরগতি সম্পন্ন যানবাহনের জন্য এক্সপ্রেসওয়ের দুই পাশে দুটি পরিষেবা লেন রাখা হয়েছে, যাতে দ্রুতগামী যানবাহনগুলো নিরবচ্ছিন্নভাবে রাস্তায় চলাচল করতে পারে। ফলে দীর্ঘপথের যাত্রীদের ভ্রমণের সময় কমে আসে। এক্সপ্রেসওয়েটি ব্যবহার করতে টোল দিতে হবে সব ধরনের যানবাহনকে। এক্সপ্রেসওয়েটি চালু হলে ঢাকা থেকে ফরিদপুরের ভাঙ্গা যেতে সময় লাগবে মাত্র ৪২ মিনিট। ঢাকা থেকে মাওয়া যেতে সময় লাগবে মাত্র ২৭ মিনিট। এক্সপ্রেসওয়েটি চালু হওয়ার খবরে দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের মাঝে আনন্দের বন্য বইছে। তারা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন।

গতকাল বুধবার ঢাকার পোস্তগোলা থেকে মাওয়াঘাট পর্যন্ত এক্সপ্রেসওয়ের যাত্রাবাড়ী-মাওয়া অংশ পরিদর্শন করে দেখা যায়, আনুষ্ঠানিক উদ্বোধনের আগে নিরবচ্ছিন্ন দ্রুত গতির রাস্তায় শেষ মুহূর্তের ছোঁয়া দিচ্ছিলেন শ্রমিকরা। সড়কের দুই পাশে সবুজায়নের জন্য বৃক্ষরোপণ করা হচ্ছে। লাগানো হচ্ছে নানা পতাকা। ৫৫ কিলোমিটার দীর্ঘ এ এক্সপ্রেসওয়ের প্রথম অংশ ঢাকা থেকে মাওয়া পর্যন্ত ৩৫ কিলোমিটার, আর পদ্মা সেতুর ওই পাড়ে পানছার থেকে ভাঙ্গা পর্যন্ত ২০ কিলোমিটার দীর্ঘ। এ এক্সপ্রেসওয়ের মাধ্যমে খুলনা ও বরিশাল বিভাগের বাসিন্দাদের রাজধানী ঢাকায় যাতায়াত সুগম হবে।

বরিশাল বিভাগের ছয় জেলা, খুলনা বিভাগের ১০টি জেলা এবং ঢাকা বিভাগের ছয় জেলাসহ দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ২২টি জেলার মানুষ সরাসরি এ এক্সপ্রেসওয়েতে উপকৃত হবেন। প্রকল্পটি আগামী ২০ জুনে শেষ হওয়ার কথা থাকলেও তিন মাস আগেই তা শেষ হয়েছে বলে সড়ক পরিবহন মন্ত্রী জানান। এক্সপ্রেসওয়ের পাঁচটি ফ্লাইওভারের মধ্যে একটি ২ দশমিক ৩ কিলোমিটার কদমতলী-বাবুবাজার লিংক রোড ফ্লাইওভার।

অন্য চারটি ফ্লাইওভার করা হয়েছে আবদুল্লাহপুর, শ্রীনগর, পুলিয়াবাজার ও মালিগ্রামে। এক্সপ্রেসওয়ের জুরাইন, কুচিয়ামোড়া, শ্রীনগর ও আতাদিতে চারটি রেলওয়ে ওভার ব্রিজ এবং চারটি বড় সেতু রয়েছে।

উল্লেখ্য, রাজধানী ঢাকার যাত্রাবাড়ী মেয়র হানিফ ফ্লাইওভার থেকে ভাঙ্গা পর্যন্ত ৫৫ কিলোমিটার এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণের কাজ শুরু হয়েছিল ২০১৬ সালের জুলাই মাসে। ২০১৯ সালের জুনের মধ্যে কাজ শেষ হওয়ার কথা ছিল। পদ্মার ওপার থেকে ভাঙ্গা পর্যন্ত ২০ কিলোমিটার সড়কের নির্মাণকাজ আগেই শেষ হয়ে গিয়েছিল। বাকি ছিল ঢাকার যাত্রাবাড়ী থেকে মাওয়া পর্যন্ত ৩৫ কিলোমিটার অংশের কাজ।

প্রকল্পে প্রথমে ব্যয় ধরা হয়েছিল ৬ হাজার ২৫২ কোটি ২৮ লাখ টাকা। পরে সংশোধিত ডিপিপিতে ব্যয় বেড়ে দাঁড়ায় ৬ হাজার ৮৯২ কোটি ২৮ লাখ টাকা। এর বাইরে মূল প্রকল্পে অন্তর্ভুক্ত হয়নি এমন কিছু কাজের জন্য ২০১৮ সালের জুনে চার হাজার ১১১ কোটি টাকার আরেকটি পৃথক ডিপিপি অনুমোদন করে সরকার। এ ডিপিপি অনুযায়ী কাজের মেয়াদ ধরা হয় ২০২০ সালের জুন পর্যন্ত। দুটি ডিপিপি মিলিয়ে ঢাকা-ভাঙ্গা এক্সপ্রেসওয়েতে মোট ব্যয় ১১ হাজার ৩ কোটি টাকা।

Print Friendly, PDF & Email