করোনা তথ্য গোপন করতে চেয়ে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, নাকচ করলেন প্রধানমন্ত্রী

আগামী ১৭ মার্চ জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকীর অনুষ্ঠানের পর বাংলাদেশে করোনা ভাইরাস শনাক্তের তথ্য প্রকাশ করতে চেয়েছে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের কিছু কর্মকর্তা। তবে রোববার সকালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে সাক্ষাৎকালে তারা তথ্য আপাতত কিছু দিন তথ্যটি গোপন রাখার অনুরোধ জানান। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাদের সেই প্রস্তুাব সরাসরি নাকচ করে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশনায় যা আছে সেভাবেই করোনা ভাইরাস আক্রান্তের ঘোষণা দিতে বলেন। এসময় তিনি এও বলেন, বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকীর অনুষ্ঠান পরেও করা যাবে।

রোববার (৮ মার্চ) সকালে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রী জাহিদ মালেকের নেতৃত্বে স্বাস্থ্য বিভাগের শীর্ষ কর্মকর্তারা প্রধানমন্ত্রীকে করোনাভাইরাস আক্রান্ত রোগী সম্পর্কে অবহিত করতে গেলে তিনি একথা বলেন।

ওই সময় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের কয়েকজন ও সাক্ষাৎকারীদের কেউ কেউ কয়েকটা দিন অর্থাৎ ১৭ মার্চের পর করোনাভাইরাস আক্রান্তের তথ্য গোপন করে বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকীর অনুষ্ঠানের পর তা ঘোষণা দেওয়ার প্রস্তাব দেন। তবে প্রধানমন্ত্রী সেই প্রস্তাব সরাসরি নাকচ করে দেন।

শেখ হাসিনা বলেন, ‘দেশের মানুষের কাছে তথ্য গোপন করতে পারব না। করোনাভাইরাসের সংক্রমণ প্রতিরোধে সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা চালাও। আমি তোমাদের সঙ্গে আছি।’

প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎকারীদের একজন গণমাধ্যমকে বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী সব শুনে বললেন, করোনার ঘোষণা দাও, অনুষ্ঠান পরে। আগামী ১৭ মার্চের অনুষ্ঠানের চেয়ে দেশের মানুষ প্রধানমন্ত্রীর কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ বলে সাফ জানিয়ে দিয়েছেন তিনি।’

ওই কর্মকর্তা জানান, সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) কর্মকর্তারা গত শনিবার রাতেই ল্যাবরেটরি পরীক্ষার ফলাফলে ইতালি ফেরত দুই প্রবাসীসহ মোট তিনজনের করোনাভাইরাস আক্রান্ত হওয়ার বিষয়ে নিশ্চিত হন।

এ খবর স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক, স্বাস্থ্য সচিব (সেবা বিভাগ) আসাদুল ইসলাম ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডাক্তার আবুল কালাম আজাদকে জানান, আইইডিসিআরের পরিচালক ডা. মীর জাদি সাবরিনা ফ্লোরা।

পরে স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক রোববার সকালে সাক্ষাতের সময় নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে যান। এ সময় স্বাস্থ্য সচিব, স্বাস্থ্য মহাপরিচালক ও প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত চিকিৎসক জাতীয় অধ্যাপক এবিএম আব্দুল্লাহ উপস্থিত ছিলেন।

এসময় প্রধানমন্ত্রী তাদেরকে জানান, করোনাভাইরাস নিয়ে বিশ্ব পরিস্থিতি সম্পর্কে তিনি জানেন। আইইডিসিআরে নিয়মিত প্রেস ব্রিফিং হয় সে সম্পর্কেও তিনি অবগত আছেন।

এদিকে প্রথমবারের মতো বাংলাদেশে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত তিনজনের জনের মধ্যে দুইজনই নারায়ণগঞ্জের বাসিন্দা। তারা নারায়ণগঞ্জ শহরের আল জয়নাল প্লাজার বসবাসকারী। তারা উভয়ে স্বামী-স্ত্রী। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন নারায়ণগঞ্জের সিভিল সার্জন ডা. মোহাম্মদ ইমতিয়াজ।

রোববার (৮ মার্চ) জাতীয় রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) পরিচালক মীরজাদী সেব্রিনা ফ্লোরা জানান, বাংলাদেশে তিনজন করোনাভাইরাসে আক্রান্ত রোগী হিসেবে চিহ্নিত হয়েছেন। কোভিড-১৯ আক্রান্ত এই তিন ব্যক্তির মধ্যে দুইজন ইতালি থেকে দেশে ফিরেছেন। এদের মধ্যে দুজন পুরুষ, অপরজন নারী।

আইইডিসিআর-এর নিয়মিত ব্রিফিংয়ে এমন তথ্য জানানোর পরপরই শোনা যায় আক্রান্ত তিনজন নারায়ণগঞ্জের বাসিন্দা। তবে নারায়ণগঞ্জের সিভিল সার্জন ডা. মোহাম্মদ ইমতিয়াজ জানিয়েছেন, আক্রান্ত দুইজন নারায়ণগঞ্জের বাসিন্দা। তাদের একজন পুরুষ এবং তার স্ত্রী।

ডা. ইমতিয়াজ বলেন, ‘বাংলাদেশে যে তিনজন আক্রান্ত হয়েছেন তাদের মধ্যে দুইজন নারায়ণগঞ্জের বাসিন্দা। তারা ঢাকার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আছেন।’ নারায়ণগঞ্জের লোকজনদের আতঙ্কিত না হবার পরামর্শ দিয়েছেন তিনি। সরকারিভাবে যেসব নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে সেসব নির্দেশনা মেনে চলারও কথা বলেন ডা. মোহাম্মদ ইমতিয়াজ।

তবে একটি সূত্র জানিয়েছে, আক্রান্ত দম্পতি নারায়ণগঞ্জ শহরের থানা পুকুরপাড় এলাকায় আল জয়নাল প্লাজায় থাকেন।

এদিকে আইইডিসিআর সূত্রে জানা গেছে, নারায়ণগঞ্জের এক বাসিন্দা ইতালি থেকে করোনা (কোভিড-১৯) আক্রান্ত হয়ে দেশে ফিরেছেন। বাসায় ফেরার পর তার সংস্পর্শে তার স্ত্রীও এই ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন। তাদের বয়স ২০ থেকে ৩৫-এর মধ্যে বলে জানা গেছে।

আইইডিসিআরে পরিচালক মীরজাদী সেব্রিনা ফ্লোরা করোনাভাইরাস নিয়ে প্রতিষ্ঠানটির নিয়মিত ব্রিফিংয়ে জানান, জ্বর ও কাশি নিয়ে এই তিন ব্যক্তি (নারায়ণগঞ্জের দুজনসহ) গতকাল আইইডিসিআরের হটলাইনে যোগাযোগ করেন। এরপর গত ২৪ ঘণ্টায় তাদের নমুনা পরীক্ষা করা হয়। পরীক্ষায় তারা পজিটিভ প্রমাণিত হন। তবে তিনজনই ভালো আছেন। তারা হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আছেন। তিনজনেরই বিশেষ কোনও চিকিৎসার প্রয়োজন নেই। করোনার চিকিৎসা হচ্ছে সিম্পটোমেটিক অর্থাৎ লক্ষণ উপসর্গভিত্তিক। তারা সেই চিকিৎসাই পাচ্ছেন, তাদের অন্য কোনও সাপোর্টিভ চিকিৎসার প্রয়োজন হয়নি। তবে তারা আইসোলেশনেই থাকবেন। যতদিন পর্যন্ত পরপর দুটো নমুনাতে তারা নেগেটিভ প্রমাণ না হচ্ছেন ততদিন পর্যন্ত তারা আইসোলেশনেই থাকবেন।

নারায়ণগঞ্জ সিভিল সার্জন অফিস সূত্র জানিয়েছেন, ইতিমধ্যে নারায়ণগঞ্জে শহরের পুরান কোর্ট এলাকায় নির্মিত আদালত ভবনে করোনা ভাইরাসের জন্য ৩০ শয্যা বিশিষ্ট কোয়ারেন্টাইন খোলা হয়েছে। সরকারিভাবে এটি গত শনিবার স্থাপন করা হয়।

Print Friendly, PDF & Email