চীন ফেরত বাংলাদেশিরা জানালেন কোয়ারেন্টাইনে থাকার কাহিনী

চীন থেকে ছড়ানো করোনাভাইরাস বিশ্বজুড়ে নতুন করে ছড়িয়ে পড়ার কারণে সব দেশকে সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নেয়ার তাগিদ দিয়েছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। চীনের উহান থেকে সৃষ্ট প্রাণঘাতী এই ভাইরাস এখন বিশ্বের প্রায় ৯০টি দেশে ছড়িয়ে পড়েছে। আক্রান্ত হয়েছেন ১ লাখ মানুষ। আর এ অবস্থায় বাংলাদেশ সরকার করোনাভাইরাস প্রতিরোধে সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নেয়ার কথা জানিয়েছে।

ইতিমধ্যেই ঢাকাসহ দেশের অনেক স্থানে বিশেষ কোয়ারেন্টাইন সেন্টার তৈরি করা হয়েছে। পাশাপাশি আক্রান্ত দেশগুলো থেকে যারা বাংলাদেশ সফরে আসবেন, তাদের দুই সপ্তাহ স্বেচ্ছা কোয়ারেন্টাইনে থাকার পরামর্শ দিয়েছে রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইন্সটিটিউট (আইইডিসিআর)। এদিকে গত ১ ফেব্রুয়ারি চীনের উহান থেকে ৩১২ জন বাংলাদেশিকে সরকারি ব্যবস্থাপনায় দেশে ফিরিয়ে আনা হয়।

পরে তাদের ঢাকার আশকোনা হজ্ ক্যাম্প ও সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালের (সিএমএইচ) কোয়ারেন্টাইনে দুই সপ্তাহ রাখা হয়। উহান ফেরত লোকদের কোয়ারেন্টাইনে দুই সপ্তাহ কেমন কেটেছে?- এ নিয়ে একটি বিশেষ প্রতিবেদন করেছে বিবিসি বাংলা।

এ নিয়ে আশকোনার হজ্ ক্যাম্পে কোয়ারেন্টাইনে থাকা এক নারী ও সিএমএইচে কোয়ারেন্টিনে থাকা অপর এক নারীর বর্ণনা প্রতিবেদনে তুলে ধরেছে সংবাদমাধ্যমটি। চীনের উহান থেকে ৩১ জানুয়ারি আমরা বাংলাদেশের উদ্দেশে রওনা হই। সাধারণত আমার বাসা থেকে বিমানবন্দর যেতে আধাঘণ্টা সময় লাগে। কিন্তু সেদিন একটু পরপরই আমাদের গাড়ি থামিয়ে চেক করা হচ্ছিল। আমার উহান ছাড়ার অনুমতি আছে কিনা, সেটা দেখা হচ্ছিল।

ফলে বিমানবন্দর পর্যন্ত যেতে আমাদের প্রায় আড়াই ঘণ্টা সময় লেগে যায়। সেখানেও আমাদের আরেক দফা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হয়। এরপর আমরা বাংলাদেশের উদ্দেশে রওনা হই। আগেই আমরা জানতাম যে, দেশে ফেরার পর আমাদের কিছুদিন কোয়ারেন্টাইনে থাকতে হবে। তাই আমাদের একটা মানসিক প্রস্তুতি ছিল। তা নিয়ে আমাদের কোনো আপত্তিও ছিল না। কারণ আমরাও চাই, আমাদের কারণে কোনোভাবে রোগটি আমাদের দেশে ছড়িয়ে না পড়ে।

বিমান থেকে নামার পর আমাদের আশকোনার হজ্ ক্যাম্পে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে গিয়ে দেখি, মেঝেতে ঢালাওভাবে অনেক বিছানা রাখা হয়েছে। একেকটি কক্ষে প্রায় ৪০ জন করে থাকতে হচ্ছে। আমরা আশা করেছিলাম, আমাদের পরিবারগুলো অন্তত আলাদা রুম পাবে। কিন্তু সেটা হয়নি।

আমার সঙ্গে আমার দুই শিশু সন্তান আর স্বামী ছিলেন। আমাদের মতো এরকম আরও অনেক পরিবার ছিল। প্রথম দিনটি সবাই মিলে সেই গণরুমে একসঙ্গেই থাকা হয়। প্রথম দিনটা একটু কষ্টই লাগছিল। কিন্তু আমরা মেনে নেয়ার চেষ্টা করছিলাম যে, দেশের স্বার্থে সেটা আমাদের মেনে নিতে হবে।

পরেরদিকে কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনার পর আমাদের পরিবারগুলোকে একটি কক্ষ দেয়া হল। সেটাও বড় একটি কক্ষ। আর ব্যাচেলররা ছিলেন আরেকটি কক্ষে। আমাদের চারজনের জন্য মেঝেতে ম্যাট্রেস দেয়া ছিল। সেগুলো আমরা এক করে নিলাম। সেগুলোকে ঘিরে আমরা সবগুলো পরিবার আলাদা আলাদাভাবে চাদর ঝুলিয়ে নেয়, ফলে পরিবারের জন্য একটু প্রাইভেসি তৈরি করা হল। জনপ্রতি একটা করে মেঝেতে বিছানো তোষক, চাদর, বালিশ, কম্বল, মশারি দেয়া হয়েছিল।

তবে হজ্ ক্যাম্পের গণটয়লেটগুলোই আমাদের সবাইকে ব্যবহার করতে হতো। সেখানে ছেলে-মেয়ে-শিশু বলে আলাদা কোনো ব্যাপার নেই। তবে খাবার খুব ভালো ছিল। সকালে রুটি, ডিম, কলা দেয়া হতো। এগারোটার দিকে কলা, লেক্সাস বিস্কিট, সিঙ্গারা, পুরি ইত্যাদি নাশতা দিত। দুপুরে দিত মাছ, ডাল, ভাত। কখনও কখনও সবজি থাকত। বিকালে দিত ড্রাই কেক,কলা। প্রতিদিন রাতের খাবারে থাকত মুরগির মাংস, ডাল, ভাত। আমাদের রুমের সামনে একটি টেবিলে জনপ্রতি প্যাকেট করা খাবার রেখে যাওয়া হতো। যার যার পরিবারের খাবার সবাই নিয়ে আসত।

পানির জন্য মিনারেল ওয়াটারের বোতল দেয়া হতো। তবে আমার ছোট ছেলেটার খাবার খেতে একটু কষ্ট হতো। ওরা চীনের খাবারে অভ্যস্ত ছিল, বাংলাদেশের খাবার ঠিকমতো খেতে পারছিল না। টয়লেটেও সমস্যা হতো। প্রচুর মশা ছিল। সেই মশা মারার জন্য যখন ওষুধ দিত, সেটাও তাদের জন্য সমস্যা তৈরি করত। তবে বাচ্চাদের সঙ্গীর অভাব ছিল না।

একটি কক্ষে অনেক বাচ্চা একসঙ্গে থাকায় তারা বেশ হৈচৈ করে সময় কাটাত। উহানে থাকার কারণে তারা অনেকে একে অপরকে চিনতও। তবে আমাদের কোনো জিনিসের দরকার হলে, টাকা দিয়ে সেটা বাইরে থেকে কিনে আনানো যেত। বেলা ১১টার মধ্যে টাকা জমা দেয়া হলে, সেটা বাইরে থেকে কিনে এনে দেয়া হতো। আমরাও টুকটাক জিনিসপত্র কিনে আনিয়েছিলাম।

কিন্তু আমি ও আমার স্বামী মানসিকভাবে একেবারেই ভালো ছিলাম না। বাচ্চাদের নিয়ে চিন্তা করতে হতো, মশার কামড়- পরিবেশটাও ততটা ভালো লাগত না। এককথায় বলা যায়, মানসিকভাবে খারাপই ছিলাম। ১৪ দিন যখন শেষ হল, তখন মনে হল সবাই যেন একটা রিলিফ পেলাম। ১৫ ফেব্রুয়ারি রাত ১১টার দিকে সেখান থেকে বেরিয়ে এসে সরাসরি গ্রামের বাড়িতে চলে যাই।

এরপর কয়েকবার ঢাকা থেকে ফোন করে আমাদের খোঁজ-খবর নেয়া হয়েছে। কোনো অসুস্থতা আছে কিনা, কোনো সমস্যা হচ্ছে কিনা জানতে চাওয়া হয়েছে। উহানেও আমরা অনেকটা কোয়ারেন্টাইনের মধ্যে ছিলাম। কারণ সেখানে সবাইকে যার যার বাসায় থাকতে বলা হয়েছিল। কেউ বাইরে বের হতাম না। মাঝে মাঝে স্বাস্থ্যকর্মীরা এসে পরীক্ষা করে যেতেন, কারো জ্বরজারি হয়েছে কি না। সবাই সুস্থ আছে কি না। পহেলা ফেব্রুয়ারি আমরা বাংলাদেশে আসার পরই আমাদের সরাসরি আশকোনার হজ্ ক্যাম্পে নিয়ে যাওয়া হয়।

কিন্তু সেখানে যাওয়ার পর ঢালাও বিছানা- পরিবেশ দেশে সত্যিই আমাদের মন খারাপ হল। কোয়ারেন্টাইন মানেতো প্রত্যেককে আলাদা করে রাখার কথা। কিন্তু এখানে গণরুমের মতো একেকটি কক্ষে একসঙ্গে অনেকের থাকার ব্যবস্থা করা হয়েছে। একজনের রোগ থাকলে সেটা তো অন্যদের মধ্যেও ছড়িয়ে পড়বে। খাবার-দাবার, আয়োজন ভালো। কিন্তু পরিবার নিয়ে এতবড় গণরুমে, এত মানুষের মধ্যে মেঝেতে বিছানো তোষকে করে ঘুমানো- সব মিলিয়ে পরিবেশটা আমার খারাপ লাগছিল। সেখানে একরাত থাকার পর, আমরা আপত্তি জানাই।

এরপর আমাদেরসহ আরও কয়েকটি পরিবারকে সিএমএইচে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে হাসপাতালের একটি কক্ষে আমাকে ও আমার দুই সন্তানকে থাকতে দেয়া হয়। এখানকার পরিবেশ সত্যিই ভালো ছিল। ছোট কক্ষটিতে দুইটি খাট, ছোট্ট একটা টেবিল ছিল। দুইটি খাট একত্র করে আমি ও আমার দুই সন্তান পরের দুই সপ্তাহ সেখানে থাকি।

তবে টয়লেট বাইরে ছিল। পাশের আরেকটা কক্ষে আমাদের মতোই আরেকটা পরিবার থাকত। আমার বড় মেয়েটির বয়স ১০ বছর। ও খানিকটা অস্থির হয়ে পড়েছিল। কারণ এরকম একটি কক্ষে এভাবে আটকা থাকা কারোই ভালো লাগছিল না। রুমে কোনো টিভি না থাকলেও ওয়াইফাই সুবিধা ছিল।

এ ছাড়া টেলিফোনে আমার স্বামীর সঙ্গে (তিনি বাংলাদেশেই ছিলেন), আত্মীয়-স্বজনের সঙ্গে নিয়মিত কথা হতো। তবে প্রথম সাতদিন আমরা রুমের বাইরেই বের হইনি। তাদেরও হয়তো একটা ধারণা ছিল যে, আমরা সবাই হয়তো আক্রান্ত। সপ্তাহখানেক পর আমার মেয়েটা করিডরে স্কেটিং করত। তারা পাঁচবেলা খাবার দিত। সকালে থাকত পাউরুটি, বাটার, জেলি, জুস, ডিম ইত্যাদি। এগারোটার দিকে এক কাপ করে দুধ, কোনোদিন সেমাই, কমলা দিত। দুপুরে মাংস, ডাল, ভাত থাকত। বিকালে দেয়া হতো বিস্কিট-চা। রাতে একবাটি করে সবজি, মাছ অথবা মাংস দিত।

অনেক সময় কলিজা থাকত। সেই সঙ্গে থাকত ভাত আর ডাল। কেউ কোনো ত্রুটি করেনি। কিন্তু আমার মানসিক অনেক চাপ গেছে। ওই সময়ে আসলে দরকার ছিল কেউ আমার বাচ্চাদের দেখবে, আমার একটু রেস্ট হবে। কিন্তু সেটা হয়নি। সব সময় সবার সঙ্গে কথা হতো, কিন্তু বাইরে আসার যে আকুতি, সেটা কমেনি। যে দিন আসার কথা, সে দিন আবার আমাদের আশকোনায় নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে একটা অনুষ্ঠান করে আমাদের একটা মেডিকেল সার্টিফিকেট দেয়া হয়, কিছু উপহার দেয়া হয়।

বলা হয়েছিল, পরের দশদিনও আমাদের নজরদারিতে রাখা হবে। তবে পরে আর আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়নি। তবে ওনাদের ফোন নাম্বার দিয়ে দিয়েছিলেন। যাতে আমাদের কারো দরকার হলে তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারি। তবে আমি যে কয়েকদিন ছিলাম, আমি চেষ্টা করেছি সেখানে থাকার। কারণ এটা আমার দেশের জন্য, আত্মীয়-স্বজনের জন্য সবার স্বার্থেই ভালো। আমার কষ্ট হলেও সেখান থেকে বেরিয়ে আসার কথা মনে হয়নি।

Print Friendly, PDF & Email