আদরের রশ্মিকে কোলে নিয়ে একসাথেই পরপারে বাবা-মেয়ে

রাজশাহী: রাজশাহীর পদ্মা নদীতে নৌকাডুবির ঘটনায় বাবা শামীম (৪০) ও তার মেয়ে রশ্মি খাতুনের (১০) মরদেহ একসঙ্গে ভেসে উঠেছে। শনিবার (০৭ মার্চ) বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে দুর্ঘটনাস্থলের অদূরে তাদের মরদেহ পাওয়া যায়। পদ্মার জলরাশিতে ডুবে গেলেও আদরের মেয়েকে ছাড়েননি বাবা শামীম। শেষ পর্যন্ত কন্যাকে আঁকড়ে ধরে ছিলেন বাবা।

 

উদ্ধারকারী জেলেদের জালে আটকা পড়ে শামীম ও তার মেয়ে রোশনি। উদ্ধারের সময় দেখা যায়- মেয়েকে আঁকড়ে ধরে ছিলেন শামীম। বাবার বিশ্বস্ত হাত ফসকে যায়নি ৭ বছর বয়সী মেয়েও। জীবন প্রদীপ নিভে গেলেও বাবা-মেয়ের বন্ধন যেন অটুটু।

 

হয়তো পদ্মার স্বচ্ছ জলরাশিতে হাবুডুবু খেতে খেতে বাবার কোলে বিশ্বস্ততা খুঁজে ফিরেছে ছোট্ট শিশুটি। কিন্তু পদ্মার স্রোত ও বিস্তীর্ণ জলরাশির সঙ্গে যুদ্ধে জয়ী হয়ে মেয়েকে নিয়ে জীবিত ফিরতে পারেননি শামীম।

 

নিহত শামীম নববধূ সুইটি খাতুন পূর্ণির ফুফাতো ভাই। সেই সম্পর্কে ছোট্ট রোশনি নববধূর ভাতিজি। নৌকাডুবির ঘটনায় শনিবার (৭ মার্চ) বিকেল সাড়ে ৫টা পর্যন্ত মোট ৬ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে।

 

তারা হলেন- কনের ফুপু মনি বেগম (৪২), দুলাভাই রতন আলী (৩২), কনের চাচাতো বোন মরিয়ম (৮), কনের ফুফাতো ভাই শামীম (৩১), শামীমের মেয়ে রোশনি (৭) ও এখলাস হোসেন (২২) নামে এক যুবক। তবে নববধূ সুইটিসহ এখনও তিনজন নিখোঁজ রয়েছে। তাদের জীবিত উদ্ধারের সম্ভাবনা খুবই কম বলছেন উদ্ধারকারীরা।

 

এ ঘটনায় প্রাণে বেঁচেছেন রতন আলীর স্ত্রী পূর্ণিমার বড় বোন বৃষ্টি খাতুন (২২)। সকাল থেকে নিখোঁজদের সন্ধানে উদ্ধার অভিযান চালাচ্ছে ফায়ার সার্ভিস, নৌপুলিশ ও বিজিবির যৌথ দল। দুপুরে অভিযানে অংশ নেয় বিআইডব্লিউটিএর ডুবুরি দল। তাদের সঙ্গে স্থানীয় জেলেরাও উদ্ধার অভিযানে অংশ নেন।

 

এদিকে সকাল থেকে পদ্মাপাড়ে অপেক্ষা করছেন বর রুমনসহ স্বজনরা। একে একে ভেসে উঠছে মরদেহ, পড়ছে কান্নার রোল। স্বজনদের আহাজারিতে ভারী চারপাশ। বিপুলসংখ্যক উৎসুক জনতা ভিড় জমিয়েছেন পদ্মাপাড়ে।

 

অনুসন্ধান ও উদ্ধার সমন্বয় কেন্দ্রের ফোকাল পয়েন্ট সালাহউদ্দিন আল ওয়াদুদ বলেন, সকাল থেকে যৌথ উদ্ধার অভিযান চলছে। দুপুরে দুর্ঘটনাকবলিত নৌকা দুটির অবস্থান নিশ্চিত হওয়া গেছে। উজান ও ভাটিতেও উদ্ধার তৎপরতা চলছে।

 

তিনি বলেন, নৌকা দুটিতে ৪১ জন আরোহী ছিলেন। জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে ৩২ জনকে। মরদেহ উদ্ধার হয়েছে ছয়জনের। এখনও নিখোঁজ কনেসহ তিনজন। নিখোঁজের স্বজনরা তাদের নাম-পরিচয় জমা দিয়েছেন।

 

নৌকাডুবির পর বালু তোল ড্রেজার নৌকা বর আসাদুজ্জামান রুমনকে উদ্ধার করে। পরে সেখান থেকে তাকে রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ (রামেক) হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। রুমন পদ্মার চরের ওপারের থাকা পবা উপজেলার চরখিদিরপুরের গ্রামের ইনছার আলীর ছেলে।

 

গতকাল রাতেই উদ্ধার হওয়া বর রুমন বলেন, নদীর ওপার থেকে আসার সময় পথিমধ্যে হঠাৎ ইঞ্জিন বন্ধ হয়ে যায়। এতে আতঙ্কিত হয়ে ওই নৌকায় থাকা ছেলে-মেয়ে কান্নাকাটি শুরু করে। তখন তার ভাই নৌকা থেকে লাফ দেয়। লাফ দিলে নৌকা হেলে যায়। ফলে পানি এসে নৌকা ডুবে যায়।

 

রুমন বলেন, একটি বালু তোলার ড্রেজার নৌকা এসে আমাদের উদ্ধার করে। আমার স্ত্রী আমার সঙ্গে ছিল। কিন্তু সে তার বোনের সঙ্গে নৌকার পেছনের দিকে ছিল। আমি আমার বন্ধু শামীমের সঙ্গে ছিলাম। তাকে এখনো খুঁজে পাওয়া যায়নি।

 

তিনি আরও বলেন, আমার সঙ্গে কেউ ছিল না তখন। যারা মেয়ে (কনে) আনতে যায়, ওই ক’জনই ওপারে মেয়েকে আনতে গিয়েছিল। আমরাও ডুবে গিয়েছিলাম। যে নৌকাটি আমাকে উদ্ধার করেছিল, সেটি আরও তিনজনকে উদ্ধার করে। নৌকায় থাকা লোকজন বলেছিল, আমরা তোমাদের বাঁচাই, এখানে আরও চারটি নৌকা আছে। নৌকাগুলো সেখানে খোঁজাখুজি করছিল। পরে সেখান থেকে আমাদের হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়।

 

স্থানীয় সূত্র জানায়, বৃহস্পতিবার (০৫ মার্চ) পদ্মার ওপারের পবা উপজেলার চরখিদিরপুর এলাকার ইনসার আলীর ছেলে আসাদুজ্জামান রুমনের সঙ্গে একই উপজেলার ডাঙেরহাট এলাকার শাহীন আলীর মেয়ে সুইটি খাতুন পূর্ণিমার বিয়ে হয়।

 

শুক্রবার (০৬ মার্চ) বরের বাড়ি থেকে বর-কনেকে নিয়ে আসছিল কনেপক্ষ। সন্ধ্যা ৭টার দিকে রাজশাহী নগরীর শ্রীরামপুর ডিসির বাংলো এলাকায় পদ্মা নদীতে ডুবে যায় নৌকাগুলো।

Print Friendly, PDF & Email