ভালো থেকো অধিনায়ক

অস্থির হয়ে ধরে আসে তার গলা। চোখ বেয়ে পানিটা পড়তে পড়তেও যেন খুঁজে পায় না গন্তব্য। মনের বিষাদ স্পষ্ট হয়ে ওঠে চোখের কোণায়। মাশরাফী কাঁদতে চান খুব করে, পারেন না। হৃদয়ের রক্তক্ষরণ লুকিয়ে রাখতে চান শক্ত বুকের পাটার নিচে, তাও সম্ভব হয় না।

 

মাশরাফী ব্যর্থ হন সবকিছুতে। তবে তিনি যখন থামছেন, বলছেন আমি আর থাকছি না বাংলাদেশের অধিনায়ক। তখন এই মহানায়কের প্রস্থান হচ্ছে সাফল্যের মুকুট মাথায় তুলে। যা সগর্বে তিনি উঁচিয়ে রাখতে পারেন চুলগুলোর ওপরে। তার কান্নার ভারাক্রন্ততা পৌঁছে গেছে বাংলার পথে প্রান্তরে, নিশ্চিত হতে পারেন সেটাও।

 

আরও একটি জিনিস মাশরাফী জেনে রাখতে পারেন-এদেশের কোটি হৃদয় কখনও ভুলতে পারবে না তার নেতৃত্বগুণ। যেমন তার সতীর্থরা পারবেন না প্রিয় ‘মাশরাফী ভা ‘কে মিস না করে থাকতে। কখনও খুব অস্বস্তির পরিবেশে একটা ভরসার হাত খুঁজতে গিয়ে পাবেন না তার দেখা।

 

১০ বছর বয়সে বাড়ির ছাদ থেকে পড়ে গিয়েও যে ছেলেটার কিচ্ছু হয়নি। সে ছেলে হাসিমুখে ছুরি-কাঁচির নিচে বসেছেন অসংখ্যবার। নেতা হয়েছেন পুরো দেশটার। যার বিদায় বেলায়ও মুখ চওড়া করে হাসি দেয়ার চেষ্টা করে যান, পারেন না। বিষাদের রেখা ডানা মেলে। তাতে পুড়ে ছারখার হয় তার ভক্ত-সমর্থক কিংবা সতীর্থদের সবকিছু।

 

তিনি কী তা জানেন না? হয়তো জানেন। মাশরাফী আসলে জানেন অনেক কিছু। জাদুর কাঠির মতো বদলে দেন সব। ২০১৪ সালে যখন মুশফিকুর রহিমের হাত থেকে নেতৃত্বের ব্যাটন উঠেছিল হাতে, সে বছর তখনও একটিও জয় পায়নি বাংলাদেশ।

 

এরপর মাশরাফী এলেন দৃশ্যপটে। জেতালেন পাঁচ ম্যাচের ওয়ানডে সিরিজ, জিম্বাবুয়ের বিপক্ষেই। আগেও বেশ কয়েকবার হয়েছিলেন অধিনায়ক। বিধাতা সহায় হননি তাতে। ইনজুরি থাবায় বরাবরই হয়ে পড়েছেন অসহায়, নেতৃত্বের ভার কাঁধে তুলে মাঠ ছেড়েছেন সতীর্থদের কাঁধে হাত রেখে।

 

এক পর্যায় সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন এই দায়িত্ব আর নেবেনই না। বাবা গোলাম মোর্ত্তজার অভয় দিয়েছেন। এরপর গড়েছেন ইতিহাস। টুকরো টুকরো সুখস্মৃতির স্তুপ। তিনি হেসেছেন, তার দল কখনও কখনও কাঁদিয়েছে, তিনিও হয়তো। তবে সে ব্যথা আড়াল করেছেন বারবার। চেয়েছেন একা সইতে।

 

দূরে রেখেছেন সবাইকে। সব দোষ নিয়েছেন মাথা পেতে। আবার আশা দেখিয়েছেন, দলকে জিতিয়েছেন, ঘুচিয়েছেন অধিনায়ক শিরোপা না জেতার আক্ষেপ। বল হাতেও থেকেছেন সবার সামনে।

 

এই একটা ম্যাচ আগেই তো। সিলেটে, জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে। মাতাভারের উইকেটটা যখন নিলেন, অধিনায়ক হিসেবে শততম উইকেট পূর্ণ হলো তার। এই কীর্তি শতাধিক বছরের ক্রিকেট ইতিহাসেই আছে চারজনার। ইমরান খান, ওয়াসিম আকরাম, শন পোলক ও জেসন হোল্ডারের মতো নামগুলো উজ্জ্বলতা ছড়াচ্ছে যে ছোট্ট লিস্টটায়।

 

২০১৪ সালে অধিনায়ক হলেন যখন থেকে, বোলার হিসেবেও সেখানে স্বমহিমায় নিজের উচ্চতা জানান দিয়েছেন রঙিন পোশাকের অধিনায়ক। নেতৃত্বগুণের চাপে আড়াল হয়ে যাওয়া বোলার মাশরাফীও যে আলো জড়িয়েছেন পরিসংখ্যানই তার জানান দিচ্ছে। মুস্তাফিজুর রহমানের ১০৮ উইকেটের পর দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ৯৫ ব্যাটসম্যানকে সাজঘরে ফিরিয়েছেন তিনি।

 

চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফির সেমিফাইনাল, বিশ্বকাপে ইংল্যান্ডকে হারিয়ে প্রথমবার কোয়ার্টার ফাইনাল খেলা কিংবা দ্বিপাক্ষিক সিরিজে হারিয়ে দেয়া দক্ষিণ আফ্রিকা, ভারত, পাকিস্তানকে এসবে লেখা থাকবে অধিনায়ক মাশরাফীর পরিসংখ্যানে।

 

লেখা থাকবে না জয়ের মন্ত্র জপে দেয়ার, সতীর্থদের সব সমস্যায় পরম মমতায় নিজের সবটা ঠেলে দেয়া। মাশরাফীর ‘হার না মানা মানসিকতা’ পুরো দলে ছড়িয়ে পড়ার কথাও লেখা থাকবে না রেকর্ডবুকে। যে মানুষটা এতদিন ধরে বাংলাদেশের মানুষকে হাসিয়েছেন, নেতৃত্বের ব্যাটনটা অন্যদের হাতে দিলেও তার হাসিটাই তো প্রত্যাশা সবার। প্রার্থনা, অধিনায়কের ভালো থাকার। ভালো থেকো অধিনায়ক।

Print Friendly, PDF & Email