পদ্মা সেতুতে দৃশ্যমান হচ্ছে রেল সংযোগ সড়ক

পদ্মা সেতুর মোট ৬ দশমিক ১৫ কিলোমিটারের প্রায় চার কিলোমিটার যখন দৃশ্যমান, তখন এই প্রকল্পের পরিপূরক হয়ে দৃশ্যমান হতে শুরু করেছে সরকারের অপর মেগা প্রকল্প ‘পদ্মা সেতুতে রেল সংযোগ’ (পিবিআরএলপি)। পদ্মা সেতুতে এ পর্যন্ত বসানো হয়েছে ২৫টি স্প্যান।

বাকি স্প্যানগুলো বসানোর পর এই সেতুতে যাতে রেল যোগাযোগ শুরু করা যায় সেজন্য অপর রেল সংযোগ প্রকল্পের কাজও এগিয়ে চলেছে। জমি অধিগ্রহণ, মাটি সংস্কার ও পিলার নির্মাণের আনুষাঙ্গিক কাজ শেষে বুধবার (৪ মার্চ) বসানো হয়েছে রেল সংযোগের প্রথম স্প্যান। মুন্সিগঞ্জের সিরাজদিখান উপজেলার পলাশপুর এলাকায় এ প্রকল্পের জন্য নির্মিত ৩৮৩ এবং ৩৮৪ নম্বর পিলারের (পিয়ার) ওপর বসানো হয়েছে প্রথম স্প্যানটি।

সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, এই এলাকার জমি নিচু বলে যে কোনও ধরনের সমস্যা এড়াতে এখানকার ২৩ কিলোমিটার রেললাইন হবে এক্সপ্রেসওয়ে। এই রেলপথে বেশ কয়েকটি ব্রিজ রয়েছে। রেল চলাচলের জন্য প্রয়োজন হবে এসব ব্রিজ ভেঙে নতুন করে রেল চলার উপযোগী করে ব্রিজ তৈরি করা। তবে তা ব্যয় সাপেক্ষ। ফলে ব্যয় কমাতে এই পথটুকেই শুধু এক্সপ্রেসওয়ে করা হচ্ছে। এর জন্যই তৈরি হচ্ছে পিলারগুলো।

সরেজমিন দেখা গেছে, এক্সপ্রেসওয়ে এলাকায় অনেক পিলার (পিয়ার) নির্মাণের কাজ শেষ, বাকিগুলোর কাজ চলছে। আর এগুলোতে বসানোর উপযোগী করে তৈরি করা স্প্যানগুলো পাশে সারি করে সাজানো।

এই প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, ঢাকা থেকে যশোর পর্যন্ত মোট ১৭৩ কিলোমিটার দীর্ঘ পথে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জোন হচ্ছে মাওয়া থেকে ভাঙ্গা অংশ। পদ্মা সেতু যেদিন যানবাহন চলাচলের জন্য খুলে দেওয়া হবে, সেইদিনই পদ্মা সেতুতে রেল চলাচলও শুরু হবে–সরকারের এমন পরিকল্পনা বাস্তবায়নে রেল সংযোগটির একটি অংশও সেদিনই খুলে দেওয়া হবে। সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, ওইদিনই মাওয়া- ভাঙ্গা অংশে রেলও চলবে। পরবর্তীতে পর্যায়ক্রমে বাকি অংশগুলোর কাজ শেষে খুলে দেওয়া হবে। ২০২৪ সালে পুরোপুরি শেষ হবে পদ্মা সেতুতে রেলসংযোগ প্রকল্পের কাজ। সেভাবেই প্রকল্প বাস্তবায়নের অগ্রগতি হচ্ছে।

বুধবার পদ্মা সেতুতে রেল সংযোগ প্রকল্পের (পিবিআরএলপি) মুন্সিগঞ্জের সিরাজদিখান উপজেলার পলাশপুর এলাকা পরিদর্শনে গিয়ে দেখা গেছে, ঢাকার কেরানীগঞ্জের পানগাঁও থেকে মাওয়া যাওয়ার পথে পলাশপুর এলাকায় নির্মিত ৩৮৩ এবং ৩৮৪ নম্বর পিয়ারের ওপর বসানো হয়েছে এ প্রকল্পের প্রথম স্প্যান।

প্রকল্প পরিচালক প্রকৌশলী গোলাম ফখরুদ্দিন এ চৌধুরী এ বিষয়ে সাংবাদিকদের বলেন, এটি (স্প্যানটি) বসানো ছিল খুবই চ্যালেঞ্জিং। এটি যখন বসানোর কাজ সম্পন্ন হয়েছে, এখন বাকি স্প্যানগুলো বসানো অনেকটাই সহজ হবে।

জানতে চাইলে বাংলাদেশ রেলওয়ের পদ্মা ব্রিজ রেল লিংক প্রজেক্ট (পিবিআরএলপি) প্রকল্প পরিচালক প্রকৌশলী গোলাম ফখরুদ্দিন এ চৌধুরী জানান, একদিকে পিলার বসানোর কাজ চলছে। অপরদিকে পদ্মা সেতুর জাজিরা অংশে এবং ব্রিজের ওপরে রেললাইন বসানোর কাজ চলছে। একদিনের জন্যও প্রকল্পের কাজ থেমে নাই। ২০২৪ সালের জুনে প্রকল্পের কাজ শেষ করার লক্ষ্য নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছি। করোনার প্রভাবে কাজের গতি কিছুটা কমেছে। চীনা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের কর্মীরা চীনে গিয়ে আটকা পড়েছে। তারা ঠিকসময়ে আসতে না পারায় সমস্যা হচ্ছে। তবে তারা যাতে আসতে পারে সেজন্য চীন সরকারের কাছে চিঠি দেওয়া হয়েছে।

প্রকল্প পরিচালক আরও জানান, ৩৯ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে এই প্রকল্পে স্টেশন থাকছে ১৪টি। ১০০টি ব্রডগেজ কোচ সংযুক্ত করা হবে। ২০০ একর জমি অধিগ্রহণের করতে হবে। ইতোমধ্যেই ১৭ জেলায় এ  কাজ শেষ হয়েছে। বাকি পাঁচ জেলার জমি অধিগ্রহণের কাজ কিছুটা বাকি আছে। এই প্রকল্পের খুবই গুরুত্বপূর্ণ জোন হলো মুন্সীগঞ্জের মাওয়া থেকে ফরিদপুরের ভাঙ্গা পর্যন্ত। পদ্মা সেতুর ওপর দিয়ে ঢাকা থেকে যশোর সরাসরি রেলপথ হবে ১৭৩ কিলোমিটার,  এর মধ্যে ২৩ কিলোমিটার এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে। মাওয়া থেকে ভাঙ্গা অংশের কাজ হয়েছে ৫০ শতাংশ। সার্বিক কাজ হয়েছে ২৩ শতাংশ।

গোলাম ফখরুদ্দিন এ চৌধুরী বলেছেন, করোনা ভাইরাসের কারণে কাজের গতি কমলেও এখানে কর্মরত কর্মকর্তা ও শ্রমিকরা অতিরিক্ত কাজ করছেন। ফলে আমরা নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই এই প্রকল্প শেষ করতে পারবো বলে আশা রাখি।

প্রকল্প প্রস্তাবনায় জানা গেছে, পদ্মা সেতুতে রেল সংযোগ প্রকল্পে ঢাকা থেকে যশোর পর্যন্ত মোট ১৭৩ কিলোমিটার রেলপথ নির্মিত হবে। এ প্রকল্পকে ৫টি অংশে ভাগ করা হয়েছে। প্রথম অংশে ঢাকার কমলাপুর থেকে গেন্ডারিয়া স্টেশন পর্যন্ত ৩ কিলোমিটার ডুয়েলগেজ (ডিজি) রেলপথ নির্মিত হবে।

দ্বিতীয় অংশে গেন্ডারিয়া থেকে মাওয়া পর্যন্ত ৩৬ দশমিক ৬৩ কিলোমিটার ব্রডগেজ রেলপথ এবং ৪টি স্টেশন নির্মাণ করা হবে। তৃতীয় অংশে মাওয়া থেকে ভাঙ্গা জংশন পর্যন্ত ৪২ দশমিক ১৯৫ কিলোমিটার ব্রডগেজ রেলপথ এবং ৫টি স্টেশন নির্মাণ করা হবে।

চতুর্থ অংশে ফরিদপুরের ভাঙ্গা থেকে যশোর পর্যন্ত ৮৬ কিলোমিটার ব্রডগেজ রেলপথ ও ১০টি স্টেশন নির্মাণ করা হবে। পঞ্চম অংশে ১০০টি ব্রডগেজ ৪টি এসি স্লিপার ও ১৬টি এসি চেয়ার কোচ সংগ্রহ করা হবে।

পদ্মা সেতু হয়ে ঢাকা থেকে যশোর পর্যন্ত ১৭৩ কিলোমিটার রেলপথ নির্মাণ প্রকল্প বাস্তবায়নে ব্যয় ধরা হয়েছে ৩৯ হাজার ২৫৮ কোটি ১৩ লাখ টাকা।  ২০১৮ সালের এপ্রিলে ব্যয় আরও ৪ হাজার ২৬৯ কোটি ২৭ লাখ টাকা বাড়িয়ে ২০২৪ সালে জুন পর্যন্ত প্রকল্পের মেয়াদ বাড়ানো হয়।

সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, পদ্মা রেল সংযোগ প্রকল্পের কাজের গতি ঠিক রাখতে কেরানীগঞ্জের পানগাঁও, সিরাজদিখানের কুচিয়ামুরা, শ্রীনগর, মাওয়া, জাজিরা ও ভাঙ্গাসহ প্রকল্পের বিভিন্ন এলাকায় প্রকল্পের সাইট অফিস করা হয়েছে। এর মধ্যে প্রকল্পের সবচেয়ে বেশি অগ্রগতি হয়েছে ফরিদপুরের ভাঙ্গা থেকে মাওয়া পর্যন্ত।

উল্লেখ্য, জিটুজি ভিত্তিতে প্রকল্পটি বাস্তবায়নে ২০১৫ সালে ২৮ জানুয়ারি চায়না রেলওয়ে গ্রুপের সঙ্গে একটি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) সই হয়। ২০১৫ সালের ১৭ ডিসেম্বর ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কমার্শিয়াল চুক্তি সম্পন্ন হয়। বাংলাদেশ সেনাবাহিনী প্রকল্পের কন্সট্রাকশন সুপারভিশন কনসালট্যান্ট হিসেবে (সিএসসি) কাজের সহায়তা ও তত্ত্বাবধান করছে।

Print Friendly, PDF & Email