যুব মহিলা লীগে নতুন নেতৃত্বের খোঁজ চলছে

নরসিংদী জেলা যুব মহিলা লীগ থেকে সদ্য বহিষ্কৃত ও বিতর্কিত নেত্রী শামীমা নূর পাপিয়া-কাণ্ডের সমালোচনা থেকে বেরুতে চায় যুব মহিলা লীগ। আওয়ামী লীগের সহযোগী এই সংগঠনে নতুন ও স্বচ্ছ ভাবমূর্তির নেতৃত্বের খোঁজ চলছে।

আগামী এপ্রিল মাসে অনুষ্ঠেয় জাতীয় সম্মেলনের মধ্য দিয়ে ঢেলে সাজানো হবে সংগঠনটি। বর্তমান সভাপতি, সাধারণ সম্পাদকসহ কেন্দ্রীয় পর্যায়ের শীর্ষ পদে থাকা বেশির ভাগই তখন বাদ পড়তে পারেন বলে জানায় সংগঠনটির নীতিনির্ধারক সূত্র।

দলীয় সূত্র বলছে, ১১ মার্চ যুব মহিলা লীগের বর্তমান কমিটির মেয়াদ শেষ হচ্ছে। দলের কোনো সহযোগী সংগঠনের কমিটির মেয়াদ শেষ হওয়ার পর সংগঠনকে চাঙা রাখা ও নতুন নেতৃত্ব জায়গা করে দেওয়ার লক্ষ্যে জাতীয় সম্মেলনে সময়ক্ষেপণ না করার নীতিগত সিদ্ধান্তও আছে দলে। যথাসময়ে তাই সংগঠনটির জাতীয় সম্মেলনের আয়োজনের প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে।

চলতি মাস থেকে জাতির জনক ও সর্বকালের শ্রেষ্ঠ বাঙালি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবর্ষ উদ্যাপনের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধনের ব্যস্ততা থাকায় এপ্রিলে যুব মহিলা লীগের সম্মেলনের প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে।

২০১৭ সালের ১১ মার্চ সর্বশেষ অনুষ্ঠিত সম্মেলনের মধ্য দিয়ে নাজমা আক্তার যুব মহিলা লীগের সভাপতি ও অপু উকিল সাধারণ সম্পাদক হিসেবে পুনর্নির্বাচিত হন। মেয়াদের একেবারে শেষ সময়ে এসে শামীমা নূর পাপিয়ার ‘অপকর্ম’ নিয়ে দেশজুড়ে সমালোচনা শুরু হয়েছে। তাকে সংগঠন থেকে আজীবনের জন্য বহিষ্কার করা হলেও প্রশ্ন উঠেছে সংগঠনটির শীর্ষ নেতাদের ভূমিকা নিয়ে।

গত বছর দলে শুদ্ধি অভিযান শুরু হলেও পাপিয়ার মতো বিতর্কিত নেত্রী কীভাবে অপকর্ম চালিয়ে যাচ্ছিলেন, কেন্দ্রীয় পর্যায় থেকে কে বা কারা তাকে প্রশ্রয় দিচ্ছিলেন, এমন প্রশ্নও দলে উঠেছে। তার নানা কাহিনীতে আওয়ামী লীগের কয়েক শীর্ষ নেতার মধ্যে অস্বস্তি কাজ করছে।

সম্প্রতি আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে তার সরকারি বাসভবন গণভবনে যুব মহিলা লীগের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক সাক্ষাৎ করতে গেলে পাপিয়া প্রসঙ্গে আলোচনাকালে শেখ হাসিনা ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন। যুব মহিলা লীগ পরিচালনায় তারা দুজন ব্যর্থ বলেও মন্তব্য করেন প্রধানমন্ত্রী।

এ সময় তিনি সংগঠনটির সর্বস্তরে যাচাই-বাছাই করে আরো কত পাপিয়া আছে, তা খুঁজে বের করে দল থেকে বহিষ্কার করতে নির্দেশ দেন। গত ২৪ ফেব্রুয়ারি শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত আওয়ামী লীগের মনোনয়ন বোর্ডের সভায় যুব মহিলা লীগের বর্তমান কমিটি ভেঙে দিয়ে যত দ্রুত সম্ভব নতুন কমিটি গঠন করার জন্য প্রধানমন্ত্রীকে পরামর্শ দেন দলের জ্যেষ্ঠ নেতারা।

আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের মতে, পাপিয়াকে গ্রেপ্তার ও বহিষ্কারের মধ্য দিয়ে দলের ঝিমিয়ে পড়া ‘চলমান শুদ্ধি অভিযান’ আরো জোরালো হয়ে ওঠার পাশাপাশি দুর্নীতির বিরুদ্ধে সরকারের অভিযানও কঠোর হচ্ছে। নরসিংদীর এই নেত্রীকে গ্রেপ্তারের পর ঢাকার গেন্ডারিয়া থানা আওয়ামী লীগের সাবেক সহসভাপতি ও যুগ্ম সাধারণ সম্পাদকের বাসায় অভিযান চালায় র‌্যাব।

দলীয় পদ ব্যবহার করে বিতর্কিত কর্মকাণ্ড করলে ‘দলে কারো ঠাঁই হয় না এবং সরকারও তাকে ছাড় দেয় না’—তাদের গ্রেপ্তার ও বহিষ্কারের মধ্যে দিয়ে তা প্রমাণিত হচ্ছে।

তাই শুদ্ধি অভিযান চলাকালীন কেমন হতে পারে যুব মহিলা লীগের নতুন কমিটি, কারা আসছেন নেতৃত্বে, বিতর্কিত নেতৃত্বের গন্তব্য কোথায়—আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় পর্যায় থেকে শুরু করে তৃণমূলের নেতাদের কাছেও একই প্রশ্ন ও নানা কৌতূহল। সংগঠনটির নতুন নেতৃত্বের বিষয়ে কেন্দ্রীয় পর্যায়ের অনেক নেতার অন্যবারের মতো এবার স্পষ্ট কিছু জানা নেই। যুব মহিলা লীগের সম্মেলনের বিষয়গুলো আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা দেখভাল করছেন। গোটা সংগঠনটিকে ঢেলে সাজাতে চান প্রধানমন্ত্রী।

সূত্রমতে, সংগঠনটিকে ঘিরে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় পর্যায়ের কয়েক নেতার যে বলয় গড়ে উঠেছে, সেই বলয় ভাঙতে চান তিনি। প্রধানমন্ত্রী চাচ্ছেন নিজেই যুব মহিলা লীগের কমিটির বিষয়টি দেখবেন।

ইতোমধ্যে তিনি সংগঠনটির কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব নির্বাচনের বিষয়ে খোঁজখবর নিয়েছেন দলের শীর্ষ নেতা ও গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের মাধ্যমে। তাদের মধ্য থেকেই নতুন নেতৃত্ব আসতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।

গত বছরের শেষ দিকে অনুষ্ঠিত ক্ষমতাসীন দলের অন্য সহযোগী সংগঠন যুবলীগ, কৃষক লীগ, শ্রমিক লীগ ও স্বেচ্ছাসেবক লীগের সম্মেলনের মধ্য দিয়ে নতুন ও তুলনামূলক বিতর্কমুক্ত নেতৃত্ব পাওয়ার মতো যুব মহিলা লীগের সম্মেলনের মধ্য দিয়ে স্বচ্ছ ভাবমূর্তির নেতৃত্ব পাবে বলে প্রত্যাশা সংগঠনটির সব পর্যায়ের বর্তমান ও সাবেক নেতাকর্মীদের। যে কারো দুর্নীতির বিরুদ্ধে প্রধানমন্ত্রীর অবস্থান ‘শূন্য সহনশীল’ (জিরো টলারেন্স) হওয়ায় নতুন ও জনপ্রিয় নেতৃত্বের বিষয়ে আশাবাদী তারা।
দলীয়প্রধান শেখ হাসিনার কঠোর নির্দেশে গত ১৮ সেপ্টেম্বর থেকে দুর্নীতি ও ক্যাসিনোবিরোধী অভিযান শুরু হলে নতুন পরিবেশের মুখোমুখি করে দলের সহযোগী কয়েকটি সংগঠনকে। একই পরিবেশের মুখোমুখি আগামী সম্মেলনে যুব মহিলা লীগ হবে বলেও মনে করেন তারা।

আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক, সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের সম্প্রতি বলেন, ‘যুব মহিলা লীগের কমিটির মেয়াদ শেষ হচ্ছে মার্চ মাসে। মেয়াদ শেষ হলে সম্মেলন হবে। সম্মেলনের কাজ চলমান।’

দলের সভাপতিমণ্ডলীর অন্যতম সদস্য কাজী জাফর উল্যাহ বলেন, ‘এখন আর সময়ক্ষেপণের কোনো সুযোগ নেই। মার্চে সংগঠনটির মেয়াদ শেষ হচ্ছে, এপ্রিলেই জাতীয় সম্মেলন অনুষ্ঠিত হবে। এখানে বিলম্ব করার কোনো সুযোগ নেই।’

Print Friendly, PDF & Email