নিমিষেই পুরুষশূন্য পরিবারটি, স্ত্রী-দুই পুত্রবধুর পরনে সাদা শাড়ি

খাগড়াছড়ি :

মায়ের কোলে জড়োসড়ো হয়ে আছে আহাম্মদ আলীর পাঁচ মাস বয়সী শিশুকন্যা আনিছা ও আকবর আলীর শিশুকন্যা মায়া। একদিন আগেও এই বাড়ির পরিবেশ ছিল অন্যরকম। উচ্ছ্বাসে ভরা ছিল পরিবারটি। এক দিনের ব্যবধানে বাড়ির নারীদের পরনে রঙিন শাড়ির পরিবর্তে সাদা শাড়ি।

প্রাণোচ্ছল বাড়িটিতে এখন অসহনীয় নীরবতার ফাঁকে ফাঁকে কেবলই কান্নার আওয়াজ। সবার চোখে জল, চেহারায় রাজ্যের হতাশা। এক নিমিষেই পুরুষশূন্য হয়ে পড়ল পরিবারটি। গতকাল মঙ্গলবার (৩ মার্চ) বিজিবির গুলিতে নিহত মুছা মিয়া এবং তার দুই ছেলে আকবর আলী এবং আহাম্মদ আলীর লাশ বাড়িতে পৌঁছালে এক হৃদয় বিদারক দৃশ্যের অবতারণা হয়।

মাথার উপর ছায়ার মতো বাবা আর দুই ভাইকে হারিয়ে বিলাপ করছে মুছা মিয়ার চার মেয়ে মোরশেদা বেগম, আলেয়া বেগম, জুলেখা বেগম ও নিফুলা বেগম। তাদের আহাজারিতে ভারী হয়ে উঠে পুরো বাড়ি। পরিবারে যে কি সর্বনাশ হয়ে গেছে তা হয়তো বুঝে উঠতে পারছে না আকবর আলীর পাঁচ বছরের মেয়ে আমেনা আক্তার; নির্বাক চোখে তাকি আছে সে।

অন্যদিকে, স্বামী আর দুই সন্তানকে হারিয়ে পাগলপ্রায় রঞ্জু বেগম সাংবাদিক পরিচয় জানতেই স্বামী আর সন্তান হত্যাকারীদের ফাঁসি দাবি করলেন। বললেন বিজিবি সামনে থেকে গুলি করে তার স্বামী আর দুই ছেলেকে হত্যা করেছে। তিনি বলেন, স্বামী-ছেলের মৃত্যুর খবর শোনার আগে আমি কেন মরে গেলাম না।

তিনি বলেন, আমি এখন কি নিয়ে বাঁচবো। আমার দুই অসহায় বউমার (ছেলে বউ) কি হবে। যে বয়সে লাল শাড়ি পরে আনন্দ করার কথা সে বয়সে কোন অপরাধে ওদেরকে সাদা শাড়ি পরতে হলো? কি হবে আমার নাবালক নাতনীদের? আমার ভাঙা ঘরে কে আলো জ্বালাবে?’ কথাগুলো বলতে গিয়ে বারবারই মূর্ছা যাচ্ছিলেন রঞ্জু বেগম। এসময় সেখানে উপস্থিত স্বজনরাও কান্নায় ভেঙে পড়েন।

তারা বলেন, পরিবারের তিন সদস্য মুছা মিয়া, আকবর আলী ও আহমদ আলী‘র মৃত্যুর পর এ ঘরে আলো জ্বালানোর মতো আর কেউ রইলো না। বাবা ও দুই ছেলের মৃত্যু কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছে না স্বজনরা। বাবা সাহাব মিয়া ও দুই ছেলের বউ শাশুড়ির পরনে কোন অপরাধে লাল শাড়ির বদলে সাদা শাড়ি উঠবে…? তারা এ জঘন্য হত্যাকাণ্ডের সুষ্ঠু বিচার দাবি করেন।

এদিকে, মঙ্গলবার বাগানের গাছ কাটাকে কেন্দ্র করে মাটিরাঙ্গার গাজিনগরে বিজিবি ও গ্রামবাসীর মধ্যে সংঘর্ষে ঘটনা ঘটে। এসময় বিজিবি সদস্যরা গুলি করলে ঘটনাস্থলেই মারা যান মুছা মিয়া ও তার ছেলে মো. আকবর আলী। এসময় গুলিবিদ্ধ অবস্থায় বিজিবি সদস্য শাওন, মুছা মিয়ার ছেলে আহাম্মদ আলী, মফিজ মিয়া এবং মো. হানিফ মিয়াকে মাটিরাঙ্গা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে গেলে সেখানেই মারা যান বিজিবি সদস্য শাওন ও আহাম্মদ আলী।

আশঙ্কাজনক অবস্থায় চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেয়ার পথে মারা যান আকবর আলী এবং মো. মফিজ মিয়া। নিহত ৫ জনের দাফন সম্পন্ন হয়েছে। বুধবার (০৪ মার্চ) সকালে অ্যাম্বুলেন্সে করে ৪ জন গ্রামবাসীর মরদেহ মাটিরাঙা উপজেলার গাজিনগরে নেয়া হয়। সেখানে ভিড় করেন এলাকার শত শত নারী পুরুষ। পরে স্থানীয় বিদ্যালয় মাঠে জানাজা শেষে পারিবারিক কবর স্থানে তাদের দাফন করা হয়।

মঙ্গলবারে ঘটানায় গতরাতেই, নিহত বিজিবি সদস্য শাওনকে তার গ্রামের বাড়ি বরগুনার বেতাগী উপজেলার দক্ষিণ বাসন্ডা গ্রামে নিয়ে যাওয়া হয়। গতকাল খাগড়াছড়িতে শাওনের প্রথম জানাজা নামাজ দেওয়া হয়।

নিজ গ্রামে লাশ পৌঁছানোর পরে খুলনা থেকে আগত ২১ ব্যাটালিয়ন বিজিবি সদস্যদের উপস্থিতিতে সকাল সাড়ে এগারোটায় দ্বিতীয় জানাজা নামাজ শেষে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় তাকে পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয়। ঘটনা তদন্তে একটি কমিটি গঠন করেছে জেলা প্রশাসন।

Print Friendly, PDF & Email