গ্রেপ্তারের দুদিন আগেও পাহাড়ি তরুণী সংগ্রহে যান পাপিয়া

মাফিয়া নেত্রী শামীমা নূর পাপিয়ার বিরুদ্ধে প্রতিদিনই চাঞ্চল্যকর তথ্য বেরিয়ে আসছে। নরসিংদী জেলা যুব মহিলা লীগের সাধারণ সম্পাদক (বহিষ্কৃত) বিদেশি তরুণীদের পাশাপাশি দেশের পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে পাহাড়ি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মেয়েদেরও নিয়ে আসতেন ঢাকায়।

গ্রেপ্তারের ২ দিন আগেও পাহাড়ি তরুণী সংগ্রহ করতে সঙ্গীদের নিয়ে খাগড়াছড়ি ও রাঙামাটি ঘুরে এসেছেন পাপিয়া। বিশ্বস্ত সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে। ডিবির জিজ্ঞাসাবাদে থাকা পাপিয়া ও তার স্বামী মতি সুমনের অন্যতম সহযোগী শেখ তায়্যিবাও নতুন নতুন তথ্য দিচ্ছেন।

রাজনীতির আড়ালে অবৈধ অস্ত্র, মাদক ব্যবসা ও চাঁদাবাজিসহ বিভিন্ন অনৈতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত ছিলেন শামীমা নূর পাপিয়া ও তার স্বামী মফিজুর রহমান চৌধুরী সুমন ওরফে মতি সুমন। গ্রেপ্তারের পর তিন মামলায় পাপিয়া দম্পতি বর্তমানে ১৫ দিনের পুলিশ রিমান্ডে আছেন। তাদের দুই সঙ্গীকেও রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে।

মামলার তদন্ত তদারক কর্মকর্তা ডিবির উপকমিশনার (ডিসি-উত্তর) মশিউর রহমান জানিয়েছেন, পাপিয়া-সুমন দম্পতি ও তাদের সহযোগীদের জিজ্ঞাসাবাদ করে সত্য তথ্য বের করে আনা হবে।

জানা গেছে, ডিবিতে জিজ্ঞাসাবাদে পাপিয়া ও তার স্বামী সুমন চৌধুরী অনেক তথ্য দিচ্ছেন। তাদের কখনো আলাদাভাবে, কখনো দুজনকে মুখোমুখি করে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। রিমান্ডে তাদের দুই সহযোগী সাব্বির ও তায়্যিবাকেও জিজ্ঞাসাবাদ করে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যাচ্ছে।

পাপিয়া ও সুমন চৌধুরীর অপরাধজগৎ সম্পর্কে শেখ তায়্যিবা ডিবিকে জানিয়েছেন, অনেক সময় চাহিদামতো থাইল্যান্ড, নেপাল, ভারত, ভুটান ও রাশিয়া থেকে মেয়েদের নিয়ে আসা হতো। পার্বত্য অঞ্চল থেকেও পাহাড়ি মেয়েদের নিয়ে আসতেন পাপিয়া। সব মিলিয়ে প্রায় ১৭০০ মেয়ে ছিল পাপিয়ার সংগ্রহে।

একটি বিশ্বস্ত সূত্র জানিয়েছে, পাহাড়ি তরুণী সংগ্রহের জন্য গ্রেপ্তারের ২ দিন আগেও পাপিয়া ও তার সহযোগীরা পার্বত্য চট্টগ্রামের খাগড়াছড়ি এবং রাঙামাটির সাজেক সফর করেছেন।

গোয়েন্দাদের জিজ্ঞাসাবাদে সুমন জানিয়েছেন, পাপিয়া গুলি করে মারার ভয় দেখিয়ে সুমনকে বিয়ে করেছিলেন। বিয়ের পর একপর্যায়ে পাপিয়া তার নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যান। স্বামী হলেও তার চাওয়া-পাওয়ার মূল্য তিনি কমই দিতেন। পাপিয়ার ইচ্ছা অনুযায়ী সবকিছু চলত। পাপিয়ার রাজনৈতিক ও সামাজিক কর্মসূচি তিনি নিয়মিত ফেসবুকে প্রচার করতেন। এক প্রকার পাপিয়ার হাতের পুতুল ছিলেন সুমন।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, নরসিংদী শহর ছাত্রলীগের সাবেক আহ্বায়ক সুমন ছিলেন পাপিয়ার বন্ধু। কলেজ জীবনে একপর্যায়ে বন্ধু থেকে সুমনের প্রেমিকা হন পাপিয়া। কিন্তু পাপিয়া বিয়ে করতে চাইলে কোনোভাবেই রাজি হচ্ছিলেন না সুমন। একপর্যায়ে সুমনকে গুলি করে মেরে ফেলার হুমকি দিয়েছিলেন যুবলীগের এই নেত্রী। পরে বাধ্য হয়ে পাপিয়াকে বিয়ে করেন সুমন।

নরসিংদীর আলোচিত চরিত্র সুমনের হাত ধরেই পাপিয়ার প্রথম উত্থান। কিন্তু  একপর্যায়ে প্রভাব-প্রতিপত্তি আর ক্ষমতায় স্বামীকেও ছাড়িয়ে যান পাপিয়া। নিজেই গড়ে তোলেন কেএমসি (খাজা মঈনুদ্দীন চিশতি) নামে বিশাল বাহিনী।

ডিবির একটি সূত্র জানিয়েছে, রিমান্ডে থাকা সুমন নিজেও এসব তথ্য স্বীকার করেছেন গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশের কাছে।

কলেজ জীবনে ছাত্রী হোস্টেলেও ছিল পাপিয়ার ‘পাপের আস্তানা’। নরসিংদী সরকারি কলেজে লেখাপড়া করার সময় সেখানকার ছাত্রী হোস্টেলেও ‘পাপের আস্তানা’ গড়ে তুলেছিলেন পাপিয়া।

স্থানীয় সূত্র জানায়, ২০০৬ সালের দিকে নরসিংদী সরকারি কলেজে প্রথম ছাত্রী হোস্টেল উদ্বোধন হয়। ওই সময় হোস্টেলের একটি কক্ষ নিজেদের আস্তানা বানিয়েছিলেন পাপিয়া। সেখানে অনেক বহিরাগত ছাত্রীর যাতায়াত ছিল। কোনো কোনো ছাত্রীকে প্রলোভন ও চাপ দিয়ে ওই সময় খারাপ পথে নিয়েছিলেন তিনি। তখনো স্থানীয় অনেকে পাপিয়ার এসব কর্মকাণ্ডের ব্যাপারে অবগত ছিলেন। বিভিন্ন প্রলোভন দেখিয়ে স্থানীয় অনেক রাজনৈতিক নেতা পাপিয়াকে তাদের কাজে ব্যবহার করতে শুরু করেন। সেখান থেকেই শুরু হয় পাপিয়ার বেপরোয়া জীবন।

প্রসঙ্গত, ২২ ফেব্রুয়ারি হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর হয়ে থাইল্যান্ডে পাড়ি জমানোর সময় পাপিয়া ও স্বামীসহ চারজনকে আটক করে র্যাব-১। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদ শেষে র্যাব সদস্যরা ফার্মগেটের ইন্দিরা রোডে পাপিয়া-সুমন দম্পতির বিলাসবহুল ফ্ল্যাটে অভিযান চালিয়ে ৫৮ লাখ ৪১ হাজার টাকা, পাঁচ বোতল বিদেশি মদ, পাঁচটি পাসপোর্ট, তিনটি চেক বই, বিদেশি মুদ্রা ও বিভিন্ন ব্যাংকের ১০টি এটিএম কার্ড উদ্ধার করেন। এ সময় অবৈধ একটি বিদেশি পিস্তল এবং দুটি ম্যাগাজিনে ২০ রাউন্ড গুলিও উদ্ধার করে র্যাব।

এরপর অভিজাত পাঁচতারকা হোটেল ওয়েস্টিনের বিলাসবহুল প্রেসিডেন্সিয়াল স্যুট এবং ফার্মগেটের ইন্দিরা রোডে তার পৃথক দুটি রংমহলের সন্ধান পাওয়া যায়।

Print Friendly, PDF & Email