রোহিঙ্গা সংকট সমাধান হবে তো

গত ২৩ জানুয়ারি নেদারল্যান্ডসের দ্য হেগে আন্তর্জাতিক বিচার আদালত (আইসিজে) মিয়ানমারকে গণহত্যায় দোষী সাব্যস্ত করে চারটি আদেশ দিয়েছেন। সেগুলো হলো- রাখাইনে রোহিঙ্গাদের সুরক্ষা দিতে হবে, গণহত্যার আলামত নষ্ট করা যাবে না, দোষী সেনাদের বিচারের আওতায় আনতে হবে এবং চার মাসের মধ্যে আদেশের অগ্রগতি জানাতে হবে। আবার গত মাসে আমেরিকা কর্তৃক ইরানের জেনারেল সোলায়মানিকে হত্যার পর আবার উত্তাল হয়ে পড়েছে মধ্যপ্রাচ্য। তার সঙ্গে তাল মিলিয়ে বিশ্বে আরেক সংকট তৈরি হচ্ছে পার্শ্ববর্তী ভারত কর্তৃক জাতীয় নাগরিক তালিকা (এনআরসি) বাস্তবায়নের মধ্যে লক্ষ লক্ষ লোক নাগরিকত্বহীন (দেশহীন) হবে। এই মানুষগুলো যাবে কোথায়? বাংলাদেশে ঠেলে দেবে না তো! এমনি বিষফোড়া ১২ লক্ষ রোহিঙ্গা বাংলাদেশের ঘাড়ের ওপর চেপে বসেছে। এসব সংকটের সমাধান কোন পথে?

১৯৭৮ পরবর্তী সময়ে ক্রমান্বয়ে মিয়ানমার থেকে রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আসা শুরু করে। মূলত মিয়ানমার শাসক শ্রেণির নির্যাতনে তারা আসতে শুরু করে। সর্বশেষ মিয়ানমার সেনাবাহিনী ২৫ আগস্ট ২০১৭ সালে গণহত্যা শুরু করলে রোহিঙ্গারা বাংলাদেশে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়। রোহিঙ্গা আগমনের পর থেকে তাদের মিয়ানমারে ফেরত পাঠাতে বাংলাদেশ অব্যাহতভাবে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। গত বছরের নভেম্বরে ফেরত পাঠানোর জন্য প্রথমবারের মতো উদ্যোগ গ্রহণ করলেও সে প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়। প্রত্যাবাসনের দ্বিতীয় প্রচেষ্টাও ব্যর্থ হলো। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর চীন সফরের পর রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের ব্যাপারে চীনের সর্বশেষ ভূমিকা নিয়ে আমাদের কূটনৈতিক মহল বেশ উচ্ছ্বসিত হয়েছিলেন।

তবে রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব প্রদান, নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ ও অবাধ চলাচলের পথকে সুগম করা না হলে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী কিছুতেই মিয়ানমার ফিরে যাবে না। রোহিঙ্গাদের মোট পাঁচটি দাবির মধ্যে অন্তত এ তিনটি দাবি যদি নিশ্চিত করা যায়, তাহলে হয়তো বাদবাকি দাবিগুলো এমনিতেই পূরণ হয়ে যেত। ফলে রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধান সম্ভবপর ছিল। প্রত্যাবাসন চেষ্টা ব্যর্থ হওয়ার পর বাংলাদেশকে দোষারোপ করার আরো একটি সুযোগ মিয়ানমার পেয়ে গেল। এ পরিপ্রেক্ষিতে চীনকে ব্যবহার করে মিয়ানমার আবারো একটি কূটনৈতিক ফাঁদে বাংলাদেশকে ফেলেছে কি না ভেবে দেখতে হবে।

আন্তর্জাতিক চাপে দরকষাকষিতে মিয়ানমার এ অপকর্মটি করে নিজেদের জন্য একটা সুবিধাজনক অবস্থান তৈরি করে নিয়েছে। রোহিঙ্গাদের ফিরে যেতে নিরুৎসাহিত করার জন্য উদ্বাস্তু শিবিরে ব্যাপক লিফলেট বিতরণের খবর বেরিয়েছে সংবাদমাধ্যমগুলোতে। ধারণা করা হচ্ছে, উদ্বাস্তু শিবিরগুলোতে কর্মরত বেশকিছু এনজিও এ অপতৎপরতায় জড়িত। রোহিঙ্গাদের যাতে নিরুৎসাহিত করা না হয়, সে জন্য সরকারের পক্ষ থেকে যথারীতি হুঁশিয়ারিও উচ্চারণ করা হয়েছে।

মানবিক কারণে রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিলেও জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক মহলের সাহায্য ছাড়া উদ্বাস্তু শিবির চালানো বাংলাদেশের একার পক্ষে সম্ভব নয়। আন্তর্জাতিক মহলও তাদের দায়িত্বের অংশ হিসেবেই এ সাহায্য করছে। পাশাপাশি এ কথাও সত্য, রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানের সময় যত দীর্ঘায়িত হবে আন্তর্জাতিক মহলের মনোযোগ ততই ফিকে হয়ে আসবে। বাস্তবেও তাই হয়েছে। ফলে বৈদেশিক সাহায্যের পরিমাণও আগের তুলনায় কমে এসেছে। সরকারি এক হিসাবে জানানো হয়েছে, রোহিঙ্গা সংকট মোকাবেলায় বাংলাদেশ সরকার এরই মধ্যে নিজস্ব তহবিল থেকে প্রায় আড়াই হাজার কোটি টাকা খরচ করেছে। বাংলাদেশের পক্ষে এ বিরাট অঙ্কের অর্থ জোগান দেওয়া কষ্টকর, তা সবাইকে উপলব্ধি করতে হবে।

আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে এ কথা মনে রাখতে হবে, রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিয়ে বাংলাদেশ বহুমাত্রিক ঝুঁকিতে আছে। দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক চাপসহ সামাজিক ও রাজনৈতিক ঝুঁকি, স্বাস্থ্য ও পরিবেশ বিপর্যয়, সর্বোপরি বর্তমানে নিরাপত্তাজনিত মারাত্মক ঝুঁকির মধ্যে আছে। এমতাবস্থায় আন্তর্জাতিক মহলকে সঙ্গে নিয়ে বাংলাদেশকে রোহিঙ্গাবিষয়ক উদ্ভূত সমস্যার সমাধানে পৌঁছাতে হবে। এক্ষেত্রে চীন ও ভারতের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। তাই এ দুটি দেশকে সঙ্গে নিয়েই বাংলাদেশকে এগুতে হবে।

ইমাম হোসেন

লেখক : গণমাধ্যমকর্মী

Print Friendly, PDF & Email