বাংলা ভাষা চর্চায় লক্ষ্মীপুরের ফাহাদের সংগ্রাম

নিজস্ব প্রতিবেদক :

বাংলা আমাদের মাতৃভাষা। আন্দোলন ও আত্মত্যাগের মাধ্যমে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষার মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত করেছিলো সালাম, জব্বার, রফিকরা। এটি আজ সাহিত্য ও শিল্প সাধনার ভাষা হিসেবেও বিশ্বে নন্দিত। অথচ, এ ভাষাকে অনেকেই অবজ্ঞা করছে! বাংলাকে উপেক্ষা করে ভিনদেশী ভাষা চর্চায় সাচ্ছন্দ্য বোধ করছেন। এমন আচরণে মর্মাহত হয়ে বাংলাভাষা চর্চা ও বাংলার ঐতিহ্য সংরক্ষণ নিশ্চিতকরণে সংগ্রাম করছেন ফাহাদ বিন বেলায়েত।

লক্ষ্মীপুর পৌরসভার বাঞ্চানগর গ্রামের সাংস্কৃতিকর্মী মরহুম বেলায়েত হোসেন রিপনের ছেলে ফাহাদ। দীর্ঘদিন থেকে বাংলাভাষার ব্যবহার সর্বত্র নিশ্চিতকরণে কাজ করছেন ‘ভাষার প্রদীপ’ নামীয় একটি সংগঠনের মাধ্যমে। সম্প্রতি সঙ্গে একান্ত আলাপ হয় তরুণ এই উদ্যোক্তার সঙ্গে।

মি. ফাহাদ বলেন, ‘বাংলা ভাষার ইতিহাস বাবার থেকে খুব ছোটবেলায় শুনেছি। এরপর পাঠ্যবই ও বিভিন্ন লেখকদের বই পড়েও জেনেছেন। সে থেকেই এ ভাষার প্রতি শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা জন্মায়। কেউ বাংলাভাষায় কথা না বললে কষ্ট পেতেন। মর্মাহত হয়েছেন নিকট আত্মীয়দের ভিনদেশী ভাষা চর্চায় গর্ববোধে।’

উদ্যোগের শুরুর বিষয়ে তিনি জানান, শুদ্ধ বাংলাভাষা চর্চা ও বাংলার ঐতিহ্য রক্ষায় সচেতনতামূলক কাজ ছোটবেলায় শুরু করেন। আনুষ্ঠানিকভাবে করেছেন ২০০৫ সালে। মানুষদের বাংলাভাষা চর্চায় উদ্বুদ্ধকরণ করতে নিজ ব্যবসা প্রতিষ্ঠান দেশ টেলিকমকে কাজে লাগিয়েছেন তিনি। বাংলাভাষায় নিজ মোবাইল নম্বর বললেই পুরস্কৃত করা হতো গ্রাহকদের। এতে একদিকে অল্প সময়ে বাংলাভাষা চর্চার সুফল মিলেছে। অন্যদিকে দোকানটিও বেশ পরিচিতি লাভ করে। সর্বত্র এটি ছড়িয়ে দিতে কয়েকজন বন্ধুকে নিয়ে ‘ভাষার প্রদীপ’ নামের সংগঠনটির প্রতিষ্ঠা করেছেন ২০০৮ সালে। পরে স্কুল-কলেজ, দোকান ও পার্কে শুদ্ধ বাংলাভাষা চর্চার প্রতিযোগিতার আয়োজন করেছেন। বাংলার ঐতিহ্য মাটির বাসন-খেলনা, কলম ও শিক্ষা-উপকরণ পুরস্কার হিসাবে বিজয়ীদের দিয়েছেন।

এরই ধারাবাহিকতায় ‘মায়ের ভাষায় মাকে লিখি’ ব্যতিক্রমর্ধী চিঠি লেখার আয়োজন করেন ২০১৪ সালে। এতে শিক্ষার্থীরা মায়ের ভাষায় ছোট ছোট শব্দে আবেগ, অনুভূতি, প্রত্যাশা-প্রাপ্তি, সুখ-দুঃখের কথা প্রকাশ করছেন। যাত্রা শুরুর পর থেকেই ৫০ টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের চার হাজারেরও অধিক শিক্ষার্থী মাকে চিঠি লিখেছে। চিঠিগুলো সংরক্ষণ করে ভবিষ্যতে বই প্রকাশ ও গুরুত্বপূর্ণগুলো মায়েদের কাছে পৌঁছে দিবেন। ইতিমধ্যে ৭০টি চিঠি পৌঁছিয়েছেন। এছাড়াও পর্যায়ক্রমে সারাদেশের স্কুল-কলেজগুলোতে এ কার্যক্রম পরিচালনা করার ইচ্ছা রয়েছে তার। সেক্ষেত্রে কোন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের সহযোগিতা ফেলে দ্রুত কাজটি করবেন। অন্যথায় চলমান গতিতে পরিচালনা করবেন। ফাহাদের ভাষার প্রদীপ সংগঠনটিতে বর্তমানে ২৫ জন সদস্য রয়েছে। গত কয়েকমাস পূর্বে চীনের একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে চিঠি লেখার এ প্রতিযোগিতা করেছেন বাংলাদেশী একজন শিক্ষার্থীর মাধ্যমে। ফাহাদ সংগঠনটির মাধ্যমে পথশিশুদের সহযোগিতা ও রক্তদান কর্মসূচি পালন করে আসছেন।

তিনি আরো বলেন, পৃথিবীতে আমরা একমাত্র জাতি, যারা মায়ের ভাষা রক্ষার জন্য ১৯৫২’র ভাষা আন্দোলনে রক্ত ঝরিয়েছি। বিশ্বে ভাষাবাসীর দিক থেকে বাংলার অবস্থান আজ চতুর্থ। এছাড়াও পৃথিবীর নানা দেশে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা হিসাবে গভীর শ্রদ্ধাবোধ ও ভাবগম্ভীর্যের মাধ্যমে দিবসটি পালন করছে। এরপরেও আমাদের ভাষার সঠিক ব্যবহার করি না, আমাদের ভাষাকে পিছিয়ে রাখি। মর্ম বুঝতে পারিনি এই ভাষার। তবে তার বিশ্বাস, একদিন এদশের মানুষ শুদ্ধ বাংলাভাষা চর্চা করবে, রক্ষা করবে নিজ ঐতিহ্য। তাছাড়া সকল ভাষার উপরে বাংলাকে প্রাধান্য ও শ্রদ্ধা করবে।

ভাষার প্রদীপের প্রধান সমন্বয়ক ফাহাদ বিন বেলায়েত বলেন, ফেব্রুয়ারি মাসে আমদের বাংলাভাষার প্রতি শ্রদ্ধাবোধ বেড়ে যায়। গুরুত্বে সঙ্গে পালন করি একুশে ফেব্রুয়ারি দিনটিকে। কিন্তু অন্য সময় আধুনিকতার অযুহাতে বিদেশীভাষা নিয়ে পড়ে থাকি। এতে বতর্মান প্রজন্ম ভুলতে বসেছে বাংলাভাষা ও আন্দোলনের ইতিহাস। ভেস্তে যাচ্ছে ভাষা চর্চা ও ঐতিহ্য সংরক্ষণে সরকারের নানা উদ্যোগ। তাই তিনি অপ্রয়োজনে ভিনদেশীভাষা ও সংস্কৃতি ব্যবহার না করার আহ্বান জানান সকলের প্রতি।

সাংস্কৃতিব্যক্তিত্ব ও লেখক আবদুল মান্নান আকন্দ বলেন, সংস্কৃতি বিমুখ তরুণ প্রজন্মের মাঝে বাংলা ও বাঙালী সংস্কৃতির প্রতি দায়বদ্ধতা বাড়াতে ভাষার প্রদীপের এ সৃজনশীল আয়োজন নিঃসন্দেহে প্রশংসার দাবী রাখে। আগামী প্রজন্মের মাঝে, মা-মাতৃভূমির প্রতি শ্রদ্ধা অটুট রাখতে এ এক অনবদ্য শৈল্পিক আয়োজন। এ আয়োজন ধারাবাহিকতা বজায় রাখলে সংগঠনটি নিজ লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারবে বলে মনে করেন তিনি।

Print Friendly, PDF & Email