অশ্রুবিন্দু চোখে বাবার কপাল মুছিয়ে দিলেন তাপসকন্যা সোহিনী

শেষযাত্রায় ‘সাহেব’। রবীন্দ্রসদনে শায়িত মরদেহ। মাথার কাছে ঠায় বসে স্ত্রী নন্দিনী এবং মেয়ে সোহিনী পাল। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গেই জনস্রোতে ভাসছে সদন চত্বর। এতকিছুর মাঝেও মেয়ে সোহিনী হঠাৎ এসে বাবার মুখ মুছিয়ে দিলেন। চশমা পড়েছিলেন। কপালে এবং চশমায় ধুলো জমেছে দেখতেই ওড়না নিয়ে সযত্নে বাবার কপাল মুছিয়ে দিলেন। চোখের কোলে তখন অশ্রুবিন্দু।

সোহিনী মার্কিন মুলুকে ছিলেন। সেখানেই যাওয়ার কথা ছিল বাবা তাপস পালের। কিন্তু সে আর হল কই! তার আগেই সব শেষ। শেষযাত্রায় বাবার পাশে থাকলেন সারাক্ষণ। রবীন্দ্রসদনে অভিনেতা তথা রাজনীতিক তাপস পালকে শেষ শ্রদ্ধা জানাতে এলে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে কথা বললেন।

এরপর অভিনেতার মরদেহ নিয়ে যাওয়া হয় কেওড়াতলা মহাশ্মশানে। সেখানেই গান স্যালুটে শ্রদ্ধা জানিয়ে চিরবিদায় জানানো হয় তাপস পালকে।

রবীন্দ্রসদনে এদিন শ্রদ্ধা জানাতে এসেছেন টলিউডের অভিনেতা-অভিনেত্রী থেকে টেকনিশিয়ান, অনেকেই উপস্থিত ছিলেন শেষযাত্রায়।

এছাড়া স্টুডিওপাড়াতেও ৫ মিনিটের জন্য নিয়ে যাওয়া হয় টলিউড ইন্ডাস্ট্রির সুপারস্টার তাপস পালের মরদেহ। সদনেই শ্রদ্ধা জানাতে এসে অভিনেত্রী পিয়া সেনগুপ্তকে দেখা গেল কান্নায় ভেঙে পড়তে। ক্যামেরার সামনে কথা বলতে পারলেন না অভিনেত্রী ঋতুপর্না সেনগুপ্ত।

কান্নাভেজা গলায় বললেন,  কী বলব আমার কিছু বলার নেই। শোনার মানুষ চলে গেল। শেষযাত্রায় সবসময়ে পাশে দেখা গেল ভরত কল, শংকর চক্রবর্তীকে।

অভিনেতাকে অন্তিম শ্রদ্ধা জানাতে রবীন্দ্র সদনে গিয়েছিলেন কলকাতার পুলিশ কমিশনার অনুজ শর্মা, মেয়র ফিরহাদ হাকিম, মন্ত্রী ও গায়ক ইন্দ্রনীল সেন, সাংসদ কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়। রবীন্দ্র সদনে অনুরাগীদের লম্বা লাইন। যে লাইন পৌঁছে গিয়েছিল সাহিত্য অ্যাকাডেমি পর্যন্ত।

প্রসঙ্গত, কলকাতার জনপ্রিয় অভিনেতা তাপস পাল আর নেই। মঙ্গলবার (১৮ ফেব্রুয়ারি) ভোরে মুম্বাইয়ের একটি বেসরকারি হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। বাংলা সিনেমা দর্শকদের অন্যরকম এক আবেগের নাম তাপস পাল।

তাপস পাল বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে হুগলী মহসিন কলেজ থেকে জীববিজ্ঞানে স্নাতক সম্পন্ন করেছেন। চিকিৎসার জন্য গত ২৮ জানুয়ারি তাকে মুম্বাইয়ে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে একটি বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন এই অভিনেতা। মুম্বাইয়ের ওই বেসরকারি হাসপাতালে ভেন্টিলেশনে রেখে চলছিল তার চিকিৎসা।

এরপর মুম্বাই থেকে তাপস পালকে আমেরিকায় নিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা করে তার পরিবার। কিন্তু চিকিৎসার আর সেই সুযোগ হলো না, তার আগেই না ফেরার দেশে পাড়ি দিলেন এই অভিনেতা।

অভিনয় জীবন : ছোটবেলা থেকেই অভিনয়ের প্রতি ঝোঁক ছিল তার। ২২ বছর বয়সে মুক্তি পায় তার প্রথম ছবি ‘দাদার কীর্তি’। ১৯৮০ সালে ‘দাদার কীর্তি’ সিনেমাতে অভিনয় করেই বাঙালির মন জয় করে নেন এই তরুণ অভিনেতা। এই ছবিতে তার নায়িকা ছিলেন মহুয়া রায় চৌধুরী।

কেদার চরিত্রে অভিনয় করে কোটি হূদয়ে প্রেমের আলো ছড়িয়ে দিয়েছিলেন তিনি। ‘দাদার কীর্তি’র পর ‘ভালোবাসা ভালোবাসা’ নামের আরকটি ছবিতে দেবশ্রীর বিপরীতে অভিনয় করে সাড়া ফেলে দেন তিনি।

পরের ছবিটিও সুপারহিট হয়। ১৯৮১ সালে ‘সাহেব’ ছবিতে দুর্দান্ত অভিনয়ের জন্য ফিল্মফেয়ার পুরস্কার পান তাপস পাল।

এরপর দীর্ঘ সময় বাংলা সিনেমায় রাজত্ব করেছেন এই অভিনেতা। একে একে উপহার দিয়েছেন অনেক সুপারহিট সিনেমা। সুরের ভুবনে, মায়া মমতা, সমাপ্তি, চোখের আলো, অন্তরঙ্গ, সাহেব, পর্বতপ্রিয়, দিপার প্রেম, মেজ বউ, পথভোলা, আশীর্বাদ, পরশমণি, সুরের আকাশ, শুধু ভালোবাসাসহ তার সিনেমার তালিকাটা বেশ দীর্ঘ। সেই সময় তার বেশিরভাগ সিনেমার নায়িকা ছিলেন দেবশ্রী রায়। শেষের দিকে দেবের কয়েকটি সিনেমাতেও দেখা যায় তাকে।

কলকাতা তো বটেই, ভারতীয় চলচ্চিত্রের ইতিহাসেও এক উল্লেখযোগ্য নাম তাপস পাল। অভিনয় করেছেন বলিউডের সিনেমাতেও। মাধুরী দীক্ষিতের প্রথম ছবিতে নায়ক ছিলেন তাপস। ১৯৮৪-তে মাধুরীর বিপরীতে ‘অবোধ’ ছবিতে অভিনয় করেন তিনি। ওই ছবিতে তাপস পাল মাধুরীর স্বামীর চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন। ছবিটিতে মাধুরীর চরিত্রের নাম ছিল গৌরী আর তাপস পালের নাম ছিল শঙ্কর।

শেষ সময় কেটেছে অবহেলায় : সুপারহিট এই অভিনেতার শেষ জীবন কেটেছে অবহেলা, অনাদরে এবং নানা বিতর্কের দায় মাথায় নিয়ে। অনেকেই বলছেন, সবার কাছ থেকে মুখ লুকিয়ে রাখার এ জীবন নিয়ে হাঁপিয়ে উঠেছিলেন বাংলার তুমুল জনপ্রিয় এই অভিনেতা।

যে তাপস পাল ছিলেন কলকাতার সিনেমার মধ্যমণিদের অন্যতম একজন, কেন তার জীবনে নেমে এলো নিঃসঙ্গতা? সেই প্রশ্নের জবাবে বারবার উঠে আসছে তার রাজনীতিতে যোগ দেওয়ার বিষয়টি। ভালোই ছিলেন তিনি অভিনয় নিয়ে। হঠাৎ মমতা ব্যানার্জির ডাকে ২০০৯ সালে রাজনীতিতে আসেন তাপস পাল। তৃণমূল কংগ্রেসের টিকিটে নির্বাচিতও হন তিনি কৃষ্ণনগর থেকে। এরপর অভিনেতা তাপস পাল হারিয়ে গেলেন বলা চলে।

তবে তার চেয়েও বড় ক্ষতিটা হলো ২০১৪ সালে। জনগণের কাছে দারুণ জনপ্রিয়তার গর্ব ও ক্ষমতার নেশা তাকে গ্রাস করেছিল হয়তো। নইলে অত বড়মাপের শিল্পী কেন বক্তৃতা দিতে গিয়ে নিজেকে বিতর্কিত করে ফেলবেন! ২০১৪ সালে কেন্দ্রীয় সরকারের নির্বাচনের কিছুদিন আগে একটি নির্বাচনী প্রচার সভায় বক্তৃতা দিতে গিয়ে তাপস পাল বলেছিলেন, ‘গুন্ডা পাঠিয়ে বিরোধী দলের মেয়েদের ধর্ষণ করাবেন।’ এই বাক্য তার মুখ থেকে হজম করতে পারেননি কেউ। তার কট্টর ভক্তরাও ছিঃ ছিঃ করে উঠলেন। এই বিতর্ক ছড়িয়ে পড়লে প্রকাশ্যে ক্ষমা চান তিনি। মূলত সেই থেকেই তাপস পালের একলা হয়ে যাওয়ার শুরু। চারদিক থেকে সবাই সরে দাঁড়াতে লাগল।

আর ২০১৬ সালের শেষদিকে তাপস পালের জীবনে শেষ ঝড়টা বয়ে গেল রোজ ভ্যালি নামে একটি চিট ফান্ডের সঙ্গে যুক্ত থাকার অভিযোগে গ্রেপ্তার হওয়ার পর। দীর্ঘদিন ভুবনেশ্বরের জেলে বন্দি ছিলেন তিনি। সেখান থেকে বেরনোর পর অসুস্থ হয়ে পড়েন। আর স্বাভাবিক হতে পারলেন না। চলে গেলেন ৬১ বছর বয়সে।

শেষ জীবনটা অনেক কষ্টে কাটল তার। জেল, অপমান, লাঞ্ছনা এরপর অসুস্থ হয়ে পড়া। ক্যারিয়ারের শুরু থেকেই সুপারহিট, তবু অনাদরে কাটল তাপস পালের শেষ জীবন- এই বিষয়টি সত্যি বেদনার তার ভক্ত-অনুরাগীদের জন্য। আর কোনোদিন ফিরে আসবেন না তিনি। শুধুই থাকবেন তার সিনেমায় স্মৃতি হয়ে।

টালিউডে শোকের ছায়া : তাপস পালের মৃত্যুতে থমকে গেছে টালিউড। হঠাৎ সিনেজগতের এত বড় একজন তারকার ঝরেপড়া মেনে নিতে পারছেন না কেউ। তার মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করেছেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ও।

বর্ষীয়ান অভিনেতার মৃত্যুর পর শোকবার্তা প্রকাশ করা হয় মুখ্যমন্ত্রীর টুইটার হ্যান্ডেলে। তাপস পালের মৃত্যুতে তিনি শোকাহত। বাংলা সিনেমার একজন উজ্জ্বল নক্ষত্র তথা তৃণমূল কংগ্রেসের সাবেক সংসদ সদস্য এবং বিধায়কের মৃত্যুতে তার পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানান মুখ্যমন্ত্রী।

তাপস পালের মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় টুইটারে লিখেছেন, ‘তাপস পালের মৃত্যুর কথা শুনে আমি দুঃখিত ও হতবাক। তিনি বাংলা চলচ্চিত্রের একজন সুপারস্টার ছিলেন ও তৃণমূল পরিবারের সদস্য ছিলেন। তাপস দ্বি-মেয়াদি এমপি এবং বিধায়ক হিসেবে জনগণের সেবা করেছিলেন। আমরা তাকে খুব মিস করব। তার স্ত্রী নন্দিনী, কন্যা সোহিনী এবং তার অনেক ভক্তের প্রতি আমার সমবেদনা।’

তাপসের মৃত্যুর খবরে কান্নায় ভেঙে পড়েন অভিনেত্রী দেবশ্রী রায়। তিনি বলেন, আমি ভাবতে পারছি না উনি নেই। অকালে চলে গেলেন। আমাদের পরিবারের সদস্যের মতো ছিলেন। আমরা একসঙ্গে কম সিনেমা করেছি? তাপস দা বাঙালি দর্শকের কাছে এমন একজন নায়ক যার ফুটপ্রিন্ট ততদিন থাকবে, যতদিন বাংলা ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি থাকবে।

দেবশ্রীর সঙ্গে দাদার কীর্তি ছাড়াও সমাপ্তি, চোখের আলোয়, পর্বতপ্রিয়, আগমন, সুরের আকাশেসহ আরো কয়েকটি ছবিতে অভিনয় করেছিলেন তাপস পাল।

তাপসের সঙ্গে একসঙ্গে বহু সিনেমায় কাজ করেছেন কলকাতার আরেক জনপ্রিয় অভিনেতা রঞ্জিত মল্লিক। রঞ্জিত মল্লিক বলছেন, খবরটা শুনে খুব খারাপ লাগছে। আমরা অনেক ছবিতে একসঙ্গে কাজ করেছি। সব ছবিই জনপ্রিয়। তার মধ্যে গুরুদক্ষিণার মতো সিনেমাও রয়েছে। খবরটা শুনে মন খারাপ হয়ে গেল। দীর্ঘদিন ধরে একসঙ্গে কাজ করেছি তো। আর কী বলব বলুন? আত্মার শান্তি কামনা করি।

তাপস পালের প্রয়াণে শোক প্রকাশ করেছেন জনপ্রিয় অভিনেতা ও সংসদ সদস্য দেব অধিকারী। পশ্চিমবঙ্গের সংবাদমাধ্যমকে তিনি বলেন, টালিগঞ্জ থেকে লোকসভা, সবখানে এই মানুষটার সহায়তা পেয়েছি। ‘চ্যালেঞ্জ ২’ এবং ‘মন মানে না’ সিনেমায় উনার সঙ্গে কাজ করার সৌভাগ্য হয়েছিল আমার। তাপস পাল এমনই একজন অভিনেতা, যিনি বুদ্ধদেব দাশগুপ্তের সিনেমাতেও কাজ করেছেন, আবার মূল ধারার বাণিজ্যিক সিনেমায়ও দাপিয়ে বেড়িয়েছেন। তাপস পালের অভিনয় দেখেই আমি বড় হয়েছে।

‘পাসওয়ার্ড’খ্যাত এই তারকা আরো বলেন, অভিনয় জগতের বাইরে একজন অসম্ভব ভালো মানুষ ছিলেন। প্রচুর মানুষের জন্য কাজ করেছেন তিনি। অনেক মানুষকেই গোপনে সাহায্য করতে দেখেছি তাকে। তবে উনার শেষটা খুব খারাপ হলো। এত ভালো মানুষ, এরকম পরিণতি কেন হবে? হঠাৎ করেই কেন চলে যাবেন? এটা তো যাওয়ার বয়স নয়। ভালো মানুষরা তাড়াতাড়ি চলে যান।

‘উত্তরা’ ও ‘মন্দ মেয়ের উপাখ্যান’ সিনেমায় প্রখ্যাত নির্মাতা বুদ্ধদেব দাশগুপ্তের সঙ্গে কাজ করেছিলেন তাপস। তাকে নিয়ে পরিচালক বলেন, ‘তাপস পালের মতো প্রতিভাধর অভিনেতা টালিগঞ্জে কার্যত ছিল না। রাজনৈতিক মতামতের বাইরে সকলে অভিনেতা তাপসের গুণমুগ্ধ। তার সমতুল্য অভিনেতা বর্তমান টালিগঞ্জে নেই।’

প্রিয় সহকর্মীর প্রয়াণে মর্মাহত অভিনেতা চিরঞ্জিত চক্রবর্তী। তিনি বলেন, এক ভাইকে হারালাম। পরপর ভালো অনেক সিনেমা করেছে ও। ‘দাদার কীর্তি’ ও ‘সাহেব’র মতো সিনেমাগুলো ভোলা যায় না। কিন্তু শেষের দিকেও হারিয়ে গেল। রাজনৈতিক একটা বক্তব্যের জন্য আড়ালে চলে গেল। তার মৃত্যুর সংবাদ পেলাম। কিন্তু দেহ চলে গেলেও ওর আত্মা থেকে যাবে। খুব খারাপ লাগছে আমার।

পরিচালক হরনাথ চক্রবর্তীর বন্ধু ছিলেন তাপস। তিনি বলেন, কখনো মনে হয়নি ও অভিনেতা, আমি পরিচালক। আমাদের মধ্যে পারিবারিক সম্পর্ক ছিল। আমাদের একসঙ্গে ওঠাবসা ছিল। ‘গুরুদক্ষিণা’ থেকে শুরু করে সংঘর্ষ, অনেক সিনেমা করেছি ওর সঙ্গে। সে নেই, আর ভাবতেই পারছি না।

Print Friendly, PDF & Email