বাংলা সাহিত্যে বঙ্গবন্ধু

কোন জাতি কত উন্নত তা ওই জাতির শিল্প, সাহিত্য ও সংস্কৃতিতে প্রকাশ পায়। সমসাময়িক বিশ্বে রাজনৈতিক ব্যক্তি মহাত্মা গান্ধী, নেলসন ম্যান্ডলা, ইয়াছিন আরাফাত সহ যারা ছিলেন তাদের মধ্যে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান অন্যতম।
একজন ব্যক্তিকে  নিয়ে একটা সাহিত্য জগত হতে পারে, তা বিরল। শত সহস্র  গল্প, কবিতা, প্রবন্ধ, নিবন্ধ কোন একজন ব্যক্তিকে কেন্দ্র করে হয়েছে তার দৃষ্টান্ত পৃথিবীতে খুব কম। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাংলা সাহিত্যের সম্ভারকে আরো করেছে সমৃদ্ধশালী। স্বাধীনতার পূর্ব পর বাংলা সাহিত্য এমন কোন সাহিত্যিক জন্মগ্রহণ করেনি যে, বঙ্গবন্ধু কে নিয়ে দু’কলম লিখেনি। শুধু বাংলা সাহিত্যিক নয় চীনা, জাপানি, ইতালি,  জার্মানি,  সুইডেনী বিভিন্ন ভাষায়  বঙ্গবন্ধু কে নিয়ে  লিখেছে শত শত বই।
বঙ্গবন্ধু শুধু একজন রাজনৈতিক ব্যক্তি ছিলেন না, তার মধ্যে মানবিক, সৃজনশীল অনেক যোগ্যতা সমষ্টি ছিল যা তাকে করেছে ইতিহাসে অনন্য। তার লিখিত গ্রন্থ, বক্তৃতা, কথামালায় ফুটে উঠেছে একজন জাত সাহিত্যিকের চরিত্র। তার লিখিত “অসমাপ্ত আত্মজীবনী”, “কারাগারের রোজনামচা” দুটি বই এর পরতে পরতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে উচ্চ মার্ঘের সাহিত্যিক ছায়া।  কবিরা নাকি ভবিষ্যৎ বলতে পারে তার প্রমাণ পাওয়া যায়, “বায়ান্নোর দিনগুলো” প্রবন্ধে পাকিস্তানিদের  পরাজয় সুনিশ্চিত তিনি জেলে বসে বুঝতে পেরেছেন। তাই তিনি লিখেছেন-
                                                      “মানুষের  যখন পতন আসে,
তখন পদে পদে ভুল হতে থাকে।”
১৯৭১ সালে আমেরিকা  বিখ্যাত ম্যাগাজিন News Week  বঙ্গবন্ধু কে  the poet of politics  অর্থাৎ  রাজনৈতিক কবি ঘোষণা করেছে। ৭ই  মার্চ এর ঐতিহাসিক  ভাষণ যা এখন বিশ্ব স্মৃতি আন্তজাতিক নিবন্ধন এ স্থান পেয়েছে। ২০১৭ সালে ৩০ অক্টোবর ইউনেস্কো এই ভাষণকে ডকুমেন্টারী হেরিটেজ (বিশ্ব প্রামাণ্য ঐতিহ্য) শ্রেষ্ঠ ভাষণের তালিকাভুক্ত করেছে। যে ভাষণ গুলো গোটা দুনিয়া পরিবর্তন করে দিয়েছিল। ৭ই মার্চ ভাষণ এরমধ্যে একটি। এটি শুধু ১৮ মিনিটের একটি ভাষণ ছিল না, এটি ছিল একটি আবৃতি যোগ্য শ্রেষ্ঠ কবিতা। যার প্রতিটি শব্দ চয়ন মানব দেহে আন্দোলিত করে শিহরণ জাগায়।
আধুনিক বিশ্বে কোন রাষ্ট্র  নায়কের নামে এতো সাহিত্য  কোথাও রচিত হয়নি। প্রায় ১৩ শত অধিক  সাহিত্য  বঙ্গবন্ধুর নামে রচিত হয়েছে। ১৯৭১ সালে কবি অন্নদাশংকর রায় লিখেছেন-
“যতদিন রবে পদ্মা যমুনা গৌরি মেঘনা বহমান,
ততদিন রবে তোমার কীর্তি শেখ মুজিবুর রহমান।”
কবি নির্মলেন্দু গুণের প্রায় সাহিত্য বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে। ঐতিহাসিক “হুলিয়া” কবিতায় তিনি বঙ্গবন্ধুর নাম নিয়েছেন। “আমি আজকে কারো রক্ত চাইতে আসিনি” কবিতায় লিখেছেন-
“একটি গোলাপ ফুল গতকাল আমাকে বলেছে,
আমি যেন কবিতায় শেখ মুজিবের কথা বলি।”
তার আরেক ঐতিহাসিক “স্বাধীনতা শব্দটি কিভাবে আমাদের হলো” কবিতায় তিনি বঙ্গবন্ধুকে রবিন্দ্রনার্থের সাথে তুলনা করেছেন। ড. মুহাম্মদ এনামুল হক সর্বপ্রথম বঙ্গবন্ধুকে সর্বযুগের সর্বশ্রেষ্ঠ  বাঙ্গালী অভিধা দিয়েছেন।
কবি মহাদেব সাহা লিখেছেন- “শেখ মুজিব আমার নতুন কবিতা”।
কবি আল মাহমুদ লিখেছেন-
“তিনি যখন বললেন ‘ভাইসব’/গাছেরা সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে গেল/ কবিরা বুলেট আর কলমের পার্থক্য ভুলে দাঁড়িয়ে গেল এক লাইনে।”
বাংলা সাহিত্যে, গল্পে, কবিতায়, উপন্যাসে বঙ্গবন্ধু নিয়েছে নিরব বিজয়ের স্থান। সাহিত্যের সেরা ৫০ টি গল্পের মধ্যে কবি আবুল ফজল এর -“মৃতের আত্মহত্যা”, “নিহত মুখ”। সৈয়দ শামছুল হক এর- “নিয়ামতকে নিয়ে গল্প নয়”। এমদাদুল হক মিলনের- “রাজার চিঠি”, “মানুষ কাঁদছে”। হুমায়ূন আজাদের- “যাদুকরের মৃত্যু”। এইসব বিখ্যাত গল্প বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে লেখা। এছাড়া “দেয়াল”, “দুধের গেলাশে নীল মাছি”, “জনক জননীর গল্প”, “ভয় নেই”, “রাজ দন্ড”, “শেষ দেখা” ইত্যাদি গল্প, কবিতা শেখ মুজিবকে নিয়ে লেখা।
বঙ্গবন্ধুর সাথে সাহিত্য এবং বাংলা সাহিত্যিকদের গভীর সম্পর্ক ছিলো। স্বাধীনতার উত্তর বাংলা একাডেমীর প্রথম বাংলা সাহিত্য সম্মেলনে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন “সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে যে দুর্নীতির শাখা-প্রশাখা বিস্তার করেছে, লিখুনির মাধ্যমে তার মুখোশ খুলে দিতে হবে”। শেখ মুজিব তার কথায়, লিখুনিতে, ভাষণে, রবিন্দ্রনাথ, নজরুল এর অনেক কবিতার কথা উদাহরণ দিতেন।
কবি শরৎচন্দ্রের “আধারের রূপ” প্রবন্ধটির কথা এসেছে কারাগারের রোজনামচায়। কবি শহিদুল্লাহ কায়সারের “সংশপ্তক” উপন্যাসের কথা এসেছে বঙ্গবন্ধুর লিখুনিতে।  সেখানে তিনি শহিদুল্লাহ কায়সারকে বন্ধু বলে সম্মোধন করেছেন। বঙ্গবন্ধুর সাথে দেখা হয়েছিলো শিল্পী আব্বাসউদ্দিন, তুর্কি কবি নাজিম হিকমাত, রুশ লেখক অ্যাসিভের সাথে। বাংলা চলচিত্রে, নাটকে, গানে, ডাকটিকেট, ম্যুরাল, ভাস্কর্যে, শিল্পীর ক্যানভাসে বঙ্গবন্ধু চির অম্লান।
পরিশেষে বলতে হয়, ‘বঙ্গবন্ধু হলো একটা বহতা নদীর মতো, যত যাবে তার সৌন্দর্য্য তত বিকশিত হতে থাকবে সাহিত্যে।’
লেখক- মো. আব্দুল বাতেন
প্রভাষক, গৃদকালিন্দিয়া হাজেরা হাসমত বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ,
ফরিদগন্জ, চাঁদপুর।
Print Friendly, PDF & Email