সেচের অভাবে দিশেহারা লক্ষ্মীপুরের তিন শতাধিক বোরো চাষি

রাকিব হোসেন আপ্র : ধানের ক্ষেত ফেটে চৌচির। সবুজ সতেজ ধানের চারা গুলো হলদে রঙ ধারণ করেছে। ক্ষেতের চারপাশে ফসল খেকো ইঁদুরের বাসা গুলো এখন দৃশ্যমান। সেচ বন্ধ থাকায় পানির অভাবে লক্ষ্মীপুর সদর উপজেলার দিঘলী ইউনিয়নে বোরো ধানের প্রায় ২০ একর জমিতে এমন দুরবস্থার সৃষ্টি হয়েছে।

এ এলাকার আরও অন্তত ৫০ একর জমিতে বোরো ধানের চাষাবাদ ব্যাহত হচ্ছে। ধানের চারা রোপনের সময় শেষ হয়ে যাচ্ছে কিন্তু পানির অভাবে এসব জমিতে এখন পর্যন্ত হালচাষ দেয়া যায়নি। খালে পর্যাপ্ত পানি থাকা সত্ত্বেও স্থানীয় প্রায় তিন শতাধিক চাষি বোরো আবাদ নিয়ে বিপাকে পড়েছেন। শীঘ্রই সেচ কার্যক্রম শুরু করতে না পারলে শত শত মণ ধান উৎপাদন থেকে বঞ্চিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

জানা গেছে, স্থানীয় পাটওয়ারী সেচ প্রকল্পের বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন থাকায় খাল থেকে ফসলি জমিতে সেচের পানি সরবরাহ করা যাচ্ছে না। ঝুঁকিপূর্ণ একটি বৈদ্যুতিক খুঁটিকে কেন্দ্র করে স্থানীয় একটি পরিবারের বাধার মুখে সংযোগটি বিচ্ছিন্ন রয়েছে। সেচ প্রকল্পের পরিচালক ও বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিএডিসি) পক্ষে গত ২০ দিন ধরে চেষ্টা করেও এ সংকট সমাধান করা সম্ভব হয়নি।

এ ব্যাপারে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধ জানিয়ে সোমবার (১৭ ফেব্রুয়ারি) বিকালে সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও উপজেলা সেচ কমিটির সভাপতির কাছে একটি লিখিত অভিযোগ করেন বিএডিসি লক্ষ্মীপুর জোনের সহকারী প্রকৌশলী (ক্ষুদ্রসেচ) মো. আব্দুর রাজ্জাক।

অভিযোগে বলা হয়, সেচ প্রকল্পটির বিদ্যুৎ সংযোগ দিতে কয়েকটি সুপারি ও নারিকেল গাছ কাটা যাবে। যেকারণে পশ্চিম দিঘলী গ্রামের হামিদের ছেলে মো. জামাল ও নুর মোহাম্মদের ছেলে মো. শফিক বিদ্যুৎ সংযোগে বাধা দিচ্ছেন।

এদিকে সেচ প্রকল্পটি বন্ধ করে দিতে স্থানীয় মাটির দালালরা উঠে পড়ে লেগেছে বলে অভিযোগ উঠেছে। কারণ সেচ বন্ধ থাকলে চাষাবাদ হবে না, তখন ফসলি জমির মাটি চলে যাবে ইটভাটায়। জমির মালিকরা ইচ্ছায়-অনিচ্ছায় মাটি বিক্রি করতে বাধ্য হবেন।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, পাটওয়ারী সেচ প্রকল্পের অধীনে প্রায় ১৩১ একর ফসলি জমি রয়েছে, যেখানে সারাবছর ধান উৎপাদন হয়। সম্প্রতি ৫০ লক্ষাধিক টাকা ব্যয়ে সেচ প্রকল্পটির উন্নয়ন করেছে বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ। এ উন্নয়ন কাজের দু’টি অংশ হলো- পাটওয়ারী ১ কিউসেক এলএলপি স্কীম-১ এবং পাটওয়ারী ২ কিউসেক এলএলপি স্কীম-২। প্রকল্পটির স্কীম-১ মান্দারী ইউনিয়নে এবং স্কীম-২ দিঘলী ইউনিয়নের অন্তর্গত। চলতি মৌসুমের শুরুতেই প্রকল্পটির প্রায় ৮০ একর জমিতে বোরো ধান চাষাবাদ হয়। কিন্তু পানির অভাবে বাকি ৫০ একর জমিতে চাষাবাদ এখনও শুরু করতে পারেন নি কৃষকরা। ‘স্কীম-২’-তে বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন থাকায় সেচ বন্ধ রয়েছে। ফলে বিপাকে পড়েছেন চাষিরা।

স্থানীয় চাষী মো. মনছুর বলেন, পুরাতন পানি থাকায় আমি মৌসুমের শুরুতেই প্রায় ২ একর জমিতে বোরো ধান চাষাবাদ করি। কিন্তু বর্তমানে পানির অভাবে আমার সবগুলো ধান ক্ষেত ফেটে চৌচির হয়ে গেছে। শিগগিরই সেচের পানি না পেলে আমি শেষ হয়ে যাবো।

চাষী মো. শামছুদ্দিন জানান, বোরো ধান চাষাবাদের শেষ সময় এখন। কদিন বাদেই শুরু হবে কালবৈশাখী ঝড়। অথচ এখন পর্যন্ত জমিতে হালচাষ করতে পারেনি। চাষাবাদ করতে না পারলে আমরা বাঁচবো কিভাবে?

পাটওয়ারী সেচ প্রকল্পের পরিচালক নুরুল হুদা বাহার পাটওয়ারী বলেন, সেচ প্রকল্পের বিদ্যুৎ সংযোগে একটি ঝুঁকিপূর্ণ খুঁটি নিয়ে স্থানীয় একটি চক্র জটিলতা সৃষ্টি করেছে। তারা চায়, সেচ প্রকল্পটি বন্ধ হয়ে যাক। যাতে সহজেই ফসলি জমির মাটি লুটে নেয়া যায়। আমি কৃষকদের সঙ্গে নিয়ে স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যানের কাছে গিয়েও কোনো সহযোগিতা পাইনি। এখন লক্ষ্মীপুর পল্লী বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষ অতিদ্রুত ঝুঁকিপূর্ণ বৈদ্যুতিক খুঁটিটি পরিবর্তন করে নতুন খুঁটিতে সংযোগ স্থাপন না করলে এ বছর চাষাবাদ ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

এদিকে অভিযুক্ত মো. শফিক বলেন, আমার বসতঘর সংলগ্ন কাঠের বৈদ্যুতিক খুঁটিটি খুবই জরাজীর্ণ ও ঝুঁকিপূর্ণ। এখানে ইতোমধ্যে দুইবার অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। ঝুঁকিপূর্ণ এই খুঁটিটি পরিবর্তন করে নতুন খুঁটিতে সংযোগ স্থাপন করলে আমাদের কোনো আপত্তি থাকবে না। এতে গাছ কাটা গেলেও আমরা বাধা দিবো না।

লক্ষ্মীপুর পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির সহকারী জেনারেল ম্যানেজার (প্রকৌশলী) এস এম রুহুল আমিন শীর্ষ সংবাদকে বলেন, ঝুঁকিপূর্ণ বৈদ্যুতিক খুঁটিটির সংযোগ গুলো নতুন খুঁটিতে স্থানান্তর করতে গত সোমবার ঘটনাস্থলে আমরা গিয়েছিলাম। কিন্তু স্থানীয় মো. জামাল নামে এক ব্যক্তির বাধার কারণে সংযোগটি স্থাপন করা যায়নি।

লক্ষ্মীপুর সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শফিকুর রিদোয়ান আরমান শাকিল শীর্ষ সংবাদকে বলেন, বিএডিসির অভিযোগের ভিত্তিতে সংশ্লিষ্টদের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। আশা করি, শীঘ্রই সমস্যাটির সমাধান হবে।

শীর্ষ সংবাদ/আপ্র

Print Friendly, PDF & Email